স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে ২০২৬ সালে উত্তরণ ঘটবে বাংলাদেশের। উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে সুবিধার পাশাপাশি বেশকিছু চ্যালেঞ্জও মোকাবেলা করতে হবে। এর অন্যতম হলো পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে শুল্ক সুবিধা পেতে স্থানীয় মূল্য সংযোজন হতে হবে কমপক্ষে ৫০ শতাংশ। বর্তমানে মূল্য সংযোজন ৩০ শতাংশ হলেই এ সুবিধা পাওয়া যায়। অন্যদিকে রফতানিতে প্রণোদনা হিসেবে রফতানিকারকদের বিভিন্ন হারে নগদ সহায়তা দেয় সরকার। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর নগদ সহায়তা দেয়ারও সুযোগ থাকবে না। এসব বিবেচনায় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তুতিকালে পোশাক শিল্পের সক্ষমতা বাড়াতে ২০ শতাংশ স্থানীয় মূল্য সংযোজনেই নগদ সহায়তাসহ ১২ ধরনের সুবিধা চেয়ে সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রীর কাছে চিঠি দিয়েছে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। তাদের প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করে দেখছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত দুই বছর বৈশ্বিক মহামারীর কারণে বেশ খারাপ অবস্থার মুখে পড়েছিল খাতটি। তবে গত কিছুদিন ধরে বিশ্বব্যাপী করোনা থেকে কিছু হলেও মুক্ত হওয়ায় এ মুহূর্তে পোশাক খাত তাদের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার সাহস পাচ্ছে। এদিকে এলডিসি থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তুতি নেয়ার জন্য আর মাত্র পাঁচ বছরের কম সময় রয়েছে। তাই করোনাকালে ক্ষত কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এলডিসি থেকে উত্তরণ-পরবর্তী প্রস্তুতির জন্য পোশাক খাতের সক্ষমতা বাড়াতেই সরকারের কাছে এসব সুবিধা চাওয়া হয়েছে।

বাণিজ্যমন্ত্রীর কাছে পাঠানো বিজিএমইএর চিঠিতে বলা হয়, এলডিসি থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার প্রস্তুতি ও বিশ্ববাজারে দুর্যোগসহ নভেল করোনাভাইরাস মহামারীর প্রভাব মোকাবেলা করে তৈরি পোশাক শিল্প যাতে টিকে থেকে দেশে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে পারে, সেজন্য সরকারের সুদৃষ্টি দরকার। একই সঙ্গে রফতানির বিপরীতে সব ওভেন তৈরি পোশাক কারখানা যেন নগদ সহায়তা ভোগ করতে পারে, সেজন্য এক্ষেত্রে স্থানীয় মূল্য সংযোজন ন্যূনতম ৩০ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ করার অনুরোধ করা হয়। এছাড়া নন-কটন পোশাক রফতানির ওপর ১০ শতাংশ হারে বিশেষ প্রণোদনা দেয়ার দাবি জানানো হয়।

বর্তমানে আমদানি নীতিতে পূর্ববর্তী বছরের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে চার মাসের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও মোড়কসামগ্রী বা অ্যাকসেসরিজ বিনামূল্যে আমদানির বিধান রয়েছে। এটি বাড়িয়ে ছয় মাস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। কিন্তু আমদানি নীতি ২০২১-২৪ প্রকাশিত না হওয়ায় এটি বাস্তবায়ন হয়নি। তাই এটি দ্রুত বাস্তবায়নে উদ্যোগ গ্রহণের অনুরোধ করা হয়। সুতা থেকে নিট গার্মেন্টস ও সোয়েটার উৎপাদনে নির্ধারিত অপচয় হার পুনর্নির্ধারণ হওয়া পর্যন্ত বন্ড কমিশনারেটে সব নিরীক্ষা কার্যক্রম জরিমানা ও দাবিনামা ব্যতিরেকে সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতেও বলা হয়।

দেশীয় ও অন্যান্য উৎস থেকে সংগৃহীত সব ধরনের সুতা দিয়ে উৎপাদিত সব তৈরি পোশাক পণ্যের রফতানি মূল্যের ওপর ৪ শতাংশ হারে বিশেষ নগদ সহায়তা দিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। সিন্ডিকেট থেকে তৈরি পোশাক রফতানিকারকদের সুরক্ষার জন্য পরবর্তী বাজেটে ভোক্তা অধিকার আইন-৯-এর ধারা-২-এর উপধারা-২২-এ ‘পরিবহন’ শব্দটির পর ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং, আইসিডি এবং শিপিং সার্ভিস শব্দগুলো সংযোজনে উদ্যোগ গ্রহণ করতে বলা হয়।

সরকারের নতুন পণ্য ও নতুন বাজার স্লোগানের বাস্তব প্রতিফলন ও পণ্য বৈচিত্র্যকরণকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে রফতানি বৃদ্ধির লক্ষ্যে স্থানীয় স্পিনিং মিলের আমদানি করা সব ধরনের ফাইবারকে বিটিএমএর প্রত্যয়ন সাপেক্ষে শুল্ক ও করমুক্ত আমদানির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিশেষ অনুরোধ জানানো হয়। একই সঙ্গে বস্ত্র খাতে রফতানির বিপরীতে নগদ সহায়তার ক্ষেত্রে যেকোনো ফাইবার দিয়ে উৎপাদিত তৈরি সুতায় প্রস্তুতকৃত বস্ত্রসামগ্রীকে অন্তর্ভুক্ত করতে বাণিজ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়। রফতানির স্বার্থে নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম অব্যাহত রাখার জন্য স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল সংগ্রহের জন্য ব্যাক টু ব্যাক এলসি খোলার ক্ষেত্রে রফতানিকারকদের বন্ডেড ওয়্যারহাউজ লাইসেন্স দাখিলের জন্য চাপ প্রয়োগ না করে বিদ্যমান আইন সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়।

বেনাপোল বন্দরের পাশাপাশি ভোমরা ও সোনামসজিদের মাধ্যমে বন্ড সুবিধার আওতায় তুলা, সুতা, কাপড় এবং বস্ত্র ও পোশাক খাতের অন্যান্য কাঁচামাল আমদানির ব্যবস্থা গ্রহণে উদ্যোগ নিতে বলা হয়। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তৈরি পোশাক শিল্পের আমদানি ও রফতানি কার্যক্রম বাড়াতে সড়ক, নৌ-পরিবহন ব্যবস্থার পাশাপাশি রেলপথকে উন্মুক্ত করার বিষয়ে বলা হয়। বেনাপোল স্থলবন্দরসহ সব স্থলবন্দর ও রেলপথ দিয়ে বস্ত্র ও পোশাক খাতের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে অন্তত আংশিক শিপমেন্টের অনুমোদন দেয়ার উদ্যোগ গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়। এছাড়া বেনাপোল স্থলবন্দরসহ অন্য সব অনুমোদিত স্থলবন্দরের পণ্য সংরক্ষণ বা ওয়্যারহাউজ সক্ষমতা এবং প্রয়োজনীয় লোকবল বৃদ্ধির ব্যবস্থা গ্রহণেও বিশেষ অনুরোধ জানানো হয়।

জানতে চাইলে বিজিএমইএর সভাপতি ফারুক হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, করোনা-পরবর্তী সময়ে এখন কিছুটা স্বাভাবিক হলেও এর ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আরো সময় লাগবে। প্রায় দুই বছর পোশাক খাতকে সচল রাখতে এ খাতের উদ্যোক্তারা বিপুল পরিমাণ ব্যাংকঋণ নিয়েছেন। তবে তার সুফল হিসেবে এখন এ খাতের উদ্যোক্তারা নতুন নতুন কার্যাদেশ পাচ্ছেন। তবে এখন বাজার আরো সম্প্রসারিত করার সুযোগ রয়েছে। সেজন্যই আমরা সরকারের কাছে এসব সুবিধা চেয়েছি। এগুলো পেলে আমরা বাজারটাকে আরো সম্প্রসারিত করতে পারব। একই সঙ্গে এলডিসি থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমরা কার্যকর প্রস্তুতি নিতে পারব।

এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বিজিএমইএর প্রস্তাবগুলো তারা পর্যালোচনা করছেন। যেসব জায়গায় সুবিধা দেয়া সম্ভব, সেসব ক্ষেত্রে অবশ্যই সুবিধা বাড়ানো হবে। সেই সঙ্গে এলডিসি থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ব্যবসায়ীদের নিজেদেরও সক্ষমতা বাড়াতে হবে।