প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম মহানগরীতে চলছে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প। এসব প্রকল্পে নগরীর ৩৬ খাল খনন ও সংস্কারকাজ চলমান। তবে দখল হয়ে যাওয়া ২১ খাল নিয়ে কোনো পরিকল্পনা নেই চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) কিংবা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ)। জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের সঙ্গে দখল হওয়া খালগুলোকে যুক্ত করতে সম্প্রতি উদ্যোগ গ্রহণ করেছে চসিক। দখল হয়ে যাওয়া খালগুলো নিয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠালেও জাতীয় নির্বাচনে আগে নতুন করে এ প্রকল্প পাসের সম্ভাবনা কম দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, চসিক ২১ খাল নিয়ে নতুন করে উদ্যোগ গ্রহণ করলেও সরকারের ব্যয় সংকোচন নীতি গ্রহণ করার কারণে জাতীয় নির্বাচনের আগে প্রস্তাব অনুমোদনের সম্ভাবনা কম। তবে শুরুর দিকে যদি সমন্বয় করে ৫৭ খাল নিয়ে এক সঙ্গে কাজ শুরু করা যেত তাহলে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পটি আরো কার্যকর হয়ে উঠত।

চসিকের তথ্য মতে, দখল হওয়া ২১ খাল হলো—স্লুইস নং-১ (এসএস) সংযোগ খাল, স্লুইস নং-২ (চরপাড়া), স্লুইস নং-৮ (হোসেন আহমদ পাড়া), স্লুইস নং-৯ (নতুন সাইড পাড়া, সিইপিজেড), স্লুইস নং-১০ (সিইপিজেড), স্লুইস নং-১০ (আনন্দ বাজার), স্লুইস নং-১১ (উত্তর হালিশহর), স্লুইস নং-১১ (কাট্টলী), স্লুইস নং-১২ (উত্তর কাট্টলী), স্লুইস নং-১২ (ডিএস সংযোগ খাল, উত্তর কাট্টলী), স্লুইস নং-১৩ (লতিফপুর), স্লুইস নং-১৪ (সলিমপুর), স্লুইস নং-১৫ (সলিমপুর), স্লুইস নং-১৬ (বাংলাবাজার), বৈরাগ্য ছড়া খাল, বামাইর খাল। এছাড়া বির্জাখাল, বালু খালী খাল, কৃষ্ণা খাল, কুয়াইশ খাল, ফরেস্ট খাল কর্ণফুলী ও হালদা নদীর সঙ্গে মিশেছে।

এদিকে ২১ খাল উদ্ধারে চসিক কর্তৃপক্ষ ডিপিপি প্রণয়নে গত বছরের শেষের দিকে কনসালট্যান্ট ফার্ম নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করে। তবে কনসালট্যান্ট ফার্ম নিয়োগ নিয়ে এখনো কোনো প্রক্রিয়া শুরু করতে পারেনি তারা। এ কনসালট্যান্ট ফার্ম ২১ খালের আদ্যোপান্ত চিহ্নিত করবে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো খালগুলোর সীমানা চিহ্নিত করা, আরএস-বিএস খতিয়ান বের করে দখলের অংশ বের করা ও খালের পানি প্রবাহ নিশ্চিতের লক্ষ্যে ভূমি অধিগ্রহণের সুপারিশ। এছাড়া খালগুলোর কাজ সম্পন্ন করতে প্রাথমিক নকশা তৈরি, জমির মূল্য নির্ধারণসহ সার্বিক কাজের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন জমা দেয়া। এ প্রতিবেদন পাওয়ার পরই ডিপিপি প্রস্তুত করে প্রস্তাবনা পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল চসিকের। তবে ফিজিবিলিটি প্রতিবেদনের কাজ এখনো কারা করবে সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি চসিক। যার কারণে প্রকল্পটির কাজ শুরু নিয়ে তৈরি হয়েছে দীর্ঘসূত্রতা।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. রেজাউল করিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২১ খাল উদ্ধার নিয়ে আগে দায়িত্বপ্রাপ্তরা কোনো পদক্ষেপ নেননি। আমি দায়িত্ব পাওয়ার পর খাল উদ্ধারের বিষয়ে কাজ শুরু করি। আমরা একটি প্রাথমিক প্রস্তাব এরই মধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। যখন জলাবদ্ধতা প্রকল্পের শুরু হয়েছিল তখন প্রকল্পটির সঙ্গে যদি ২১ খালতে যুক্ত করা যেত তাহলে জলাবদ্ধতা প্রকল্পটি আরো কার্যকার হতো। সেজন্য নতুন করে খালগুলো উদ্ধারে আমরা তৎপরতা বাড়াচ্ছি। আশা প্রকল্পটি দ্রুতই আলোর মুখ দেখবে। চট্টগ্রামে চলমান জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পে ৩৬ খালের সঙ্গে দখল হয়ে যাওয়া ২১ খালকে সংযুক্ত করার প্রস্তাব অনেক আগেই দিয়েছিল চসিক, কিন্তু জলাবদ্ধতা নিরসনের কাজ শেষের পথে হওয়ায় চসিকের এ প্রস্তাব গ্রহণ করেনি সিডিএ।’

সিডিএ কর্মকর্তারা জানান, চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। শুরু থেকে খালগুলো সংযোজনের বিষয়টি এলে তখন সেভাবে কাজ শুরু করা যেত, কিন্তু প্রকল্পের কাজ যেহেতু প্রায় শেষের দিকে সেজন্য নতুন করে এ ২১টি খালকে এ প্রকল্পে সংযুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।

সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিয়ে প্রায় চারটি প্রকল্পের কাজ চলছে। নগরীর খালগুলোকে নিয়ে আমরা কয়েকটি ধাপে কাজ করছি। সেখানে ২১ খালকে সংযুক্ত করা সম্ভব হয়নি। কাজের মধ্যে নতুন করে প্রকল্প সংযুক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় চসিকের প্রস্তাব গ্রহণ করা যায়নি। এখন চসিকের প্রস্তাবটিতে যদি শুরু থেকেই আমাদের সংযুক্ত করে তাহলে এক সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করব।’ 

নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম শহরের খালগুলোকে দখল করে ছোট করে ফেলা হয়েছে। অনেক খালের তো অস্তিত্বই নেই। জলাবদ্ধতা প্রকল্পগুলোর শুরুতেই নগরীর ৫৭ খাল নিয়ে একসঙ্গে কাজ করলে আমরা সুফল পেতাম দ্রুতই। কোনো কাজের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা না থাকার কারণে এ সংকটগুলো তৈরি হয়। এ বিষয়গুলোকে দায়িত্বপ্রাপ্তদের আরো আগেই পরিকল্পনা মধ্যে নেয়া উচিত ছিল। এখন দখল হয়ে যাওয়া খালগুলোকে উদ্ধার করতে নানামুখী সমস্যা পোহাতে হবে। সেজন্য সিটি করপোরেশন করে কঠোরতার সঙ্গে কাজ করতে হবে।’

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে দখল হয়ে যাওয়া খালগুলো উদ্ধারে যে প্রস্তাব দেয়ার কথা বলা হয়েছে সেই কাজের সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন করা হয়নি। যার কারণে প্রস্তাবটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও সেটি খুব দ্রুত অনুমোদনের সম্ভাবনা নেই। যার কারণে বেদখল হওয়া খালগুলো উদ্ধারে আরো বেশি সময় লাগতে পারে। তবে চসিক খালগুলো আগে উদ্ধারের ব্যবস্থা গ্রহণ করলে পরবর্তী সময়ে সেটি অনুমোদন সহজ হবে বলে মনে করছেন তারা।