খুলনায় করোনা হাসপাতালে কিছুক্ষণ পরপরই অ্যাম্বুলেন্স-ইজিবাইক-ভ্যানে আসছে রোগী। দেশে এখন করোনার ভারতীয় ধরন বা ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টই পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, সীমান্তবর্তী হওয়ায় খুলনা বিভাগে প্রথমথেকেই এ ধরন মারাত্মকভাবে সংক্রমিত করতে থাকে। যে কারণে বিভাগটিতে এখন করোনা রোগীর শনাক্ত ও মৃত্যুতে প্রতিদিনের রেকর্ড ভাঙছে এবং সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী । পাশাপাশি উদ্বেগ বাড়াচ্ছে বিভাগের চিকিৎসক সংকটসহ অপ্রতুল চিকিৎসা ব্যবস্থাও।

খুলনার সিভিল সার্জন ডা. নিয়াজ মোহাম্মদ বলেন, বিভাগের সংক্রমণ পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটছে। শনাক্ত ও মৃত্যুতে প্রতিদিনই রেকর্ড ভাঙছে। এর গতি কোথায় গিয়ে থামবে, সেটা এখনই বলা কঠিন। 

চিকিৎসকরা বলছেন, খুলনা মেডিকেল কলেজ পরিচালিত খুলনার করোনা চিকিৎসার সবচেয়ে বড় হাসপাতালটি কাগজে-কলমে ১৩০ শয্যার। প্রায় মাসখানেক ধরে আক্রান্ত রোগীর চাপ সামলাতে সবাইকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এরইমধ্যে আরও দুটি হাসপাতাল হয়েছে। তবুও চাপ কমেনি।

শুক্রবার সকালে সরেজমিনে ওই হাসপাতালে অবস্থান করে দেখা গেছে, কিছুক্ষণ পরপর অ্যাম্বুলেন্স, ইজিবাইক, এমনকি ভ্যানে করেও রোগী আসছে। কারও করোনা পজিটিভ, কেউ উপসর্গ নিয়ে। অনেকের সঙ্গে অক্সিজেন সিলিন্ডার ছিল। অনেকের ছিল না। হাসপাতালের আসা ও ভর্তির মাঝখানের সময়ে অ্যাম্বুলেন্সে বসেই অক্সিজেন নিতে দেখা গেছে বেশিরভাগ রোগীকে।

হাসপাতালটির ভেতরে গিয়ে দেখা গেছে, মেঝেতে রোগীর সংখ্যা আগের চেয়ে কিছুটা কম। মেঝেতে-শয্যায় প্রায় সবারই অক্সিজেন লাগছে। ৭৭টি শয্যায় কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা আছে। বাকিগুলো চলছে সিলিন্ডার অক্সিজেনে।

এদিকে শৃঙ্খলা ও স্বাস্থ্যবিধির কোন বালাই নেই। নেই সামাজিক দূরত্বেরও কোন প্রতিফলন। সময়মত নমুনা সংগ্রহ না করা, অর্থের বিনিময়ে করোনার নমুনা দিতে আসা লোকজনের সিরিয়াল পরিবর্তন, গল্প-গুজব করে সময়ক্ষেপন, অক্সিজেন সিলিন্ডার লুকিয়ে রাখছে। সবকিছুমিলিয়ে হাসপাতালটির ভিতর-বাইরে এক ধরণের ‘হ য ব র ল’ অবস্থা বিরাজ করছে। সরেজমিনে হাসপাতাল ঘুরে অনিয়মের নানা দৃশ্য চোখে পড়ে। 

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. রবিউল হাসান করোনা ইউনিটের বাথরুমে অক্সিজেন সিলিন্ডার উদ্ধার হওয়ার ব্যাপারে বলেন, রোগীদের হাত থেকে বাঁচাতেই অক্সিজেন সিলিন্ডার লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। তবে আর্থিক লেনদেনসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে অভিযোগ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

অপরদিকে খুলনার চার করোনা হাসপাতালে আরও ২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় চার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়। এরমধ্যে করোনায় ২৩ জন এবং উপসর্গ নিয়ে চারজন মারা গেছেন।

খুলনা করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে ১১ জন, গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০ জন ও সদর হাসপাতালের করোনা ইউনিটে পাঁচজন ও আবু নাসের হাসপাতালে একজনের মৃত্যু হয়েছে।

খুলনা করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালের ফোকাল পার্সন ডা. সুহাস রঞ্জন হালদার জানান, হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এরমধ্যে করোনায় সাতজন ও উপসর্গ নিয়ে চারজনের মৃত্যু হয়েছে।

ডা. সুহাস বলেন, করোনায় মৃতরা হলেন- নগরের সোনাডাঙ্গার আবুল কালাম আজাদ (৪৬), হোসনেয়ারা (৫৫), দৌলতপুরের রোকেয়া (৬০), রূপসার বাবুল মোল্লা (৫০), যশোরের কদমতলা এলাকার জুলেখা (৫৭), বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জের কুমুদ মন্ডল (৭৮) ও নড়াইলের পুষ্প রানী (৬৫)। এছাড়া উপসর্গ নিয়ে চারজন মারা গেছেন।

হাসপাতালটিতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১৮৫ জন। যারমধ্যে রেডজোনে ১২৬ জন, ইয়ালোজোনে ৩১ জন, আইসিইউতে ১৯ জন এবং এইচডিইউতে ১৯ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছেন ৪৬ জন আর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৩৯ জন।

বেসরকারি গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্বত্বাধিকারী ডা. গাজী মিজানুর রহমান জানান, হাসপাতালের করোনা ইউনিটে ২৪ ঘন্টায় ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। তারা হলেন- যশোরের নওয়াপাড়ার কুলসুম বেগম (৭০), ফাতেমা (৭৫) ও আনোয়ারা (৪৫), খুলনার রূপসার মর্জিনা বেগম (৬৫), দিঘলিয়ার আব্দুল হাকিম (৪৫), খুলনা সদরের রুবিনা (৫০), খালিশপুরের সেলিম সিকদার (৫৮), খুলনার মোস্তফা (৪০) ও ডুমুরিয়ার বিঞ্চু মন্ডল ও আবেদা (৬৫)।

ডা. মিজান জানান, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন আরও ১২ জন। এরমধ্যে আইসিইউতে রয়েছেন আটজন ও এইচডিইউতে আছেন ১০ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছেন ২৬ জন এবং সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২১ জন।

খুলনা জেনারেল হাসপাতালের করোনা ইউনিটের মুখপাত্র ডা. কাজী আবু রাশেদ জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। তারা হলেন- নগরের বানিয়াখামার মমতাজ (৩৫), মিয়াপাড়ার শামীম আরা (৬০), রুপসার মোজাফফর শেখ (৬০), রুপসার হানিফ মোড়ল (৬৫) ও নড়াইলের মুলতাহির এলাকার রমেসা (৭৫)।

চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৭১ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছেন ২৩ জন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১৬ জন। 

খুলনার শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালের করোনা ইউনিটের মুখপাত্র ডা. প্রকাশ চন্দ্র দেবনাথ জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালের করোনা ইউনিটে মোড়লগঞ্জের ইউনুস আলী (৭০) নামে একজনের মৃত্যু হয়েছে।

ডা. প্রকাশ বলেন, হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ৪৫ জন রোগী। যারমধ্যে আইসিইউতে রয়েছেন ১০ জন। ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছেন পাঁচজন ও বাড়ি ফিরেছেন তিনজন।