চাল উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো তৃতীয় অবস্থানে উঠে আসে গত অর্থবছর। ওই অর্থবছরে দেশে ৩ কোটি ৫৯ লাখ টন চাল (মিলড রাইস) উৎপাদন হয়। যদিও চলতি অর্থবছরে প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবে উৎপাদনে ছন্দপতন ঘটায় চতুর্থ অবস্থানে নেমে আসে বাংলাদেশ। তবে আগামী অর্থবছরে চাল উৎপাদন প্রায় ৭ লাখ ৩০ হাজার টন বাড়বে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক কৃষি সেবা বিভাগের ইউনাইটেড স্টেটস ডিপার্টমেন্ট অব এগ্রিকালচার (ইউএসডিএ)। এতে ইন্দোনেশিয়াকে টপকে বাংলাদেশ আবারো তৃতীয় অবস্থানে ফিরে আসবে।

বৈশ্বিক কৃষি উৎপাদন পরিস্থিতির সর্বশেষ তথ্য নিয়ে সম্প্রতি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ইউএসডিএ। চলতি সপ্তাহের মে-২০২১ সংখ্যায় প্রকাশিত বৈশ্বিক কৃষি উৎপাদন প্রতিবেদনে এমন পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে।

ইউএসডিএর তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরে দেশে চাল উৎপাদন হয়েছে ৩ কোটি ৪৬ লাখ টন, ২০২১-২২ অর্থবছর যা বেড়ে দাঁড়াবে ৩ কোটি ৫৩ লাখ ৩০ হাজার টনে। অন্যদিকে চলতি অর্থবছর ইন্দোনেশিয়ায় চালের উৎপাদন ছিল ৩ কোটি ৫২ লাখ টন, যা ২০২১-২২ অর্থবছর হবে ৩ কোটি ৫৩ লাখ টন। ফলে আগামী অর্থবছর ইন্দোনেশিয়ার চেয়ে বাংলাদেশে চাল উৎপাদন বাড়বে ৩০ হাজার টন। ফলে চীন ও ভারতের পর চাল উৎপাদনে তৃতীয় স্থানটি দখলে নেবে বাংলাদেশ। এদিকে চাল উৎপাদনকারী শীর্ষ চার দেশের মধ্যে শুধু ভারতে পণ্যটির উৎপাদন কমবে। বাংলাদেশে হেক্টরপ্রতি ফলন কম হলেও আবাদি জমির পরিমাণ বাড়বে। এতে সামগ্রিকভাবে দেশে চাল উৎপাদন বাড়বে।

জানা গেছে, ২০২১-২২ অর্থবছর বিশ্বে চাল উৎপাদন ৫০ কোটি ৫৪ লাখ ৫০ হাজার টন ছাড়াতে পারে। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের চেয়ে এটি প্রায় ২০ লাখ টন বেশি। আগামী অর্থবছর চীন ১৪ কোটি ৯০ লাখ টন চাল উৎপাদনের মাধ্যমে শীর্ষেই অবস্থান করবে। চলতি অর্থবছরের চেয়ে দেশটিতে উৎপাদন বাড়বে প্রায় সাত লাখ টন। অর্থবছরটিতে ভারতে চাল উৎপাদন হবে ১২ কোটি টন, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১০ লাখ টন কম। ২০১৯-২০ অর্থবছরের আগ পর্যন্ত দীর্ঘদিন ধরে তৃতীয় স্থানটি দখলে রেখেছিল ইন্দোনেশিয়া। আগামী অর্থবছর দেশটিতে চাল উৎপাদন হবে ৩ কোটি ৫৩ লাখ টন। চলতি অর্থবছরের তুলনায় এটি এক লাখ টন বেশি।

এদিকে চাল উৎপাদনের এ তথ্যের সঙ্গে ভিন্নতা রয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যে। সংস্থাটির হিসাবে গত অর্থবছর চালের উৎপাদন ছিল ৩ কোটি ৬৬ লাখ ৩ হাজার ৯২৭ টন। আগের অর্থবছর থেকে এটি ২ লাখ ১৩ হাজার টনের কিছুটা বেশি। ২০১৮-১৯ অর্থবছর চালের উৎপাদন ছিল প্রায় ৩ কোটি ৬৪ লাখ টন। গত অর্থবছর বোরোতে চালের উৎপাদন ছিল ১ কোটি ৯৬ লাখ ৪৫ হাজার টন। অন্যদিকে আমনে চালের উৎপাদন ছিল ১ কোটি ৪২ লাখ টন ও আউশে ২৭ লাখ ৫৫ হাজার টন। দেশের উৎপাদিত চালের ৫৫ শতাংশের বেশি আসে বোরো ধান থেকে, বাকিটা আউশ ও আমন থেকে। চলতি বোরো মৌসুমে চালের উৎপাদন ১০ লাখ টন বাড়তে পারে বলে প্রক্ষেপণ করছে কৃষি মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ঘাতসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ, বিশেষ করে হাওর এলাকা ধান আবাদের আওতায় আনা হচ্ছে। এ অঞ্চলের উপযোগী ধানের জাত সম্প্রসারণের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। চলতি মৌসুমে হাওর এলাকায় ধানের বাম্পার ফলনের মাধ্যমে দেশে চালের উৎপাদনে একটি বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

ইউএসডিএর প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, দেশে আগামী অর্থবছর ধান আবাদ বাড়তে পারে। চলতি অর্থবছরে ধানের আবাদ ছিল ১ কোটি ১৫ লাখ হেক্টর, যা আগামী অর্থবছর গিয়ে দাঁড়াবে ১ কোটি ১৬ লাখ ৫০ হাজার টন। ফলে ১ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে বেশি ধান আবাদ হবে। তবে এ সময়ে ধানের হেক্টরপ্রতি ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। চলতি অর্থবছর ধানের ফলন হেক্টরপ্রতি ৪ দশমিক ১৩ টন হলেও আগামী অর্থবছর ৪ দশমিক শূন্য ৯ টন হবে। মূলত শিলাবৃষ্টি ও হিট শকের কারণে ধানের ফলনে বিপর্যয় আসতে পারে। এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ধানে চিটা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, কৃষি খাতে গবেষণার পাশাপাশি সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিতে হবে। সামনের দিনে কৃষিজমি কমে যাবে। তাই ফলন বৃদ্ধির মাধ্যমে চালের উৎপাদন ধরে রাখতে হবে। সেটি করতে হলে উন্নত মানের বীজ সরবরাহ বাড়াতে হবে, তেমনি কৃষকের ধানের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে হবে। শুধু জাত উদ্ভাবনেই সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। জাতগুলো কৃষকের কাছে জনপ্রিয় করতে হবে। ধানের মজুদ ব্যবস্থায় সংস্কার প্রয়োজন। বিপণন ব্যবস্থায় মিলারদের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে কৃষক ও সরকারকে আরো শক্তিশালী অবস্থান নিতে হবে। এতে কৃষকদের আরো ন্যায্য মূল্য দেয়া সম্ভব হবে। কয়েক বছর ধরেই দেশে চালের উৎপাদনে একটি ধারাবাহিকতা আছে।

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) মহাপরিচালক মো. আসাদুল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, সঠিকভাবে পরিকল্পনা গ্রহণ ও তার বাস্তবায়নের কারণে দেশে চাল উৎপাদন বাড়ছে। করোনা মহামারীর সময়ে প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে। ফলে ধানের আবাদি জমি ও উৎপাদন বাড়ছে। চাল উৎপাদনে সবচেয়ে বড় কাজ হলো কৃষকদের উত্সাহিত করা। সেই কৃষকদের সহায়তার জন্য আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। সম্প্রসারণ সেবা, উপকরণ, আর্থিক এবং নীতি সহায়তা মাঠ পর্যায়ে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। ঘাতসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ করে তা লবণাক্ত, খরা ও হাওর অঞ্চলের কৃষকদের আবাদে উত্সাহিত করা হচ্ছে। চলতি বোরো মৌসুমে চালের রেকর্ড উৎপাদন হবে।