আইন অনুযায়ী টেক্সটাইল কারখানা থেকে নির্গত তরল বর্জ্য সরাসরি নদীতে নিক্ষেপ নিষেধ। তবে আদতে সে আইন মানে না অধিকাংশ কারখানা। বিভিন্ন গবেষণায় বারবারই উঠে এসেছে যে দেশের নদ-নদী দূষণের ক্ষেত্রে বড় দায় টেক্সটাইল শিল্পের অপরিশোধিত তরল বর্জ্যের। তবে এবার টেক্সটাইল খাতের মাধ্যমে নদ-নদীসহ পরিবেশদূষণের বিষয়টি আরো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। সদ্য গেজেটভুক্ত পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ২০২৩-এ টেক্সটাইল শিল্পকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া জাহাজ ভাঙা শিল্পকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় না রাখার সিদ্ধান্ত থেকেও ফিরে এসেছেন নীতিনির্ধারকরা। নতুন বিধিমালায় অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পের তালিকায় জাহাজ ভাঙাসহ ৭২ ধরনের শিল্প অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংশোধিত বিধিমালা বাস্তবায়ন করা গেলে পরিবেশদূষণ অনেকটাই কমে আসবে।
গেজেটভুক্ত পরিবেশ বিধিমালা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আগে যেসব কার্যক্রম পরিবেশের জন্য তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত ছিল, এখন সেগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ১৯৯৭ সংশোধন করে প্রণীত হয়েছে নতুন এ বিধিমালা। এতে সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তন তা হলো টেক্সটাইল খাত ও অবকাঠামো নির্মাণযজ্ঞকে কমলা-খ থেকে লাল তালিকায় নেয়া হয়েছে। খসড়া বিধিমালায় জাহাজ ভাঙা শিল্পকে লাল তালিকায় না রাখার বিষয়টি নিয়ে পরিবেশবাদীদের ঘোর আপত্তি ও সমালোচনার পর সেটি সংশোধন করে আবার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের সব দেশেই টেক্সটাইল, জাহাজ ভাঙা ও অবকাঠামো খাত পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকির তালিকায় থাকে। এতদিন বাংলাদেশে এসব খাতকে কম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখানো হচ্ছিল। সংশোধিত বিধিমালা পাস হওয়ায় পরিবেশ সংরক্ষণের অনেক বাধা কেটে গেছে বলেও মনে করছেন তারা।
নতুন বিধিমালা ২০২৩-এ ভাষাগত একটি পার্থক্যও দেখা গেছে। ১৯৯৭ সালের বিধিমালায় সবুজ, কমলা-ক, কমলা-খ ও লাল শ্রেণীতে ছাড়পত্র দেয়া হতো। নতুন বিধিমালায় কমলা-ক-এর পরিবর্তে হলুদ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। শুধু যে ভাষাগত পরিবর্তন এসেছে তা নয়, শিল্পের শ্রেণীভেদ ও ছাড়পত্র পাওয়ার শর্তের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে।
পরিবেশ সংরক্ষণ নীতিমালা ১৯৯৭ অনুযায়ী কাপড় রঙ করাসহ রাসায়নিক প্রক্রিয়াটি লাল তালিকায় ছিল। অন্যদিকে ওয়াশিং ছিল কমলা-খ তালিকায়। আবার ১০০ মিটারের নিচে রাস্তা নির্মাণ, পুনর্নির্মাণ, সম্প্রসারণ (ফিডার রোড, স্থানীয় রাস্তা) ও সেতু নির্মাণ, পুনর্নির্মাণ, সম্প্রসারণের বিষয়টিও ছিল এ তালিকায়।
নতুন বিধিমালায় বলা হয়েছে, বস্ত্র ও অবকাঠামো নির্মাণ—এ দুটি শিল্পের ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পেতে হলে সংস্থাটির লাল তালিকায় বর্ণিত শর্তগুলো মেনে চলতে হবে। নতুন এ বিধিতে লাল তালিকায় রয়েছে খনিজ প্রকল্প (অনুসন্ধান ব্যতীত), পরমাণু
বিদ্যুৎ প্রকল্প, কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াকরণ, সিমেন্ট ক্লিংকার প্রস্তুত, পেট্রোলিয়াম জাতীয় ক্রুড অয়েল রিফাইনারি, সমন্বিত টেক্সটাইল মিলস (স্পিনিং, উইভিং, ডায়িং ও ফিনিশিং), টেক্সটাইল
ডায়িং, প্রিন্টিং (দৈনিক উত্পাদনক্ষমতা ১৫ টনের বেশি) ও ওয়াশিং ইউনিট (প্রতিদিন ১৫ টনের বেশি)।
এছাড়া সব ধরনের ভারী ধাতু উত্পাদন, লৌহ ও ইস্পাত শিল্প, ওষুধের কাঁচামাল প্রস্তুত, সব ধরনের শিল্পনগরীর অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে রাস্তা, সেতু, রেললাইন, বিমানবন্দর ও ফ্লাইওভার নির্মাণের বিষয়টি আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ১০ কিলোমিটারের বেশি রাস্তা, ৫০০ মিটারের বেশি দীর্ঘ সেতু, রেললাইন স্থাপন, ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট সিস্টেম ও ফ্লাইওভার, হাউজিং ও নগরায়ণ প্রকল্পের (২৫ একরের ঊর্ধ্বে) ক্ষেত্রে লাল তালিকার শর্ত মেনে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নবায়ন করতে হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
লাল তালিকায় অন্তর্ভুক্ত নতুন শিল্প খাতগুলোর বিষয়ে সংস্থাটির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘টেক্সটাইলের
মাধ্যমে ব্যাপক হারে নদীদূষণ হয়। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তর এতদিন এটি সুষ্ঠুভাবে নজরদারি করতে পারছিল না। তাই ক্ষতি বিবেচনায় এটি লাল তালিকায় রাখা হয়েছে। একইভাবে নতুন করে রাস্তা, সেতু ও রেললাইন নির্মাণ করতে গেলে জীববৈচিত্র্য ও চারপাশের পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব যৌক্তিকতা বিবেচনা করে যথেষ্ট যাচাই-বাছাই শেষে এসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।’
এসবের পাশাপাশি নতুন বিধিমালায় ছাড়পত্র পাওয়ার পদ্ধতিও সহজ করা হচ্ছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কেউ ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করলে সেটি সর্বোচ্চ সাত কার্যদিবসের মধ্যে অনুমোদন করতে হবে। তা করা না গেলে এ সময়ের মধ্যে ফিরিয়ে দেয়ার কারণও উল্লেখ করতে হবে। এতে ফাইল আটকে রাখার আর সুযোগ থাকবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (আইন) খোন্দকার মো. ফজলুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা
চেষ্টা করেছি, যেন কোনো অস্পষ্টতা না থাকে। বিধিমালাটি অনেক বেশি পরিবেশবান্ধব, গণমুখী। আমরা ছাড়পত্রের জন্য সময় বেঁধে দিয়েছি। ফলে এখন আর জনভোগান্তির কোনো সুযোগ থাকবে না।’
বিধিমালার খসড়ায় জাহাজ ভাঙা শিল্পকে লাল তালিকা থেকে সরিয়ে কমলা তালিকায় রাখার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ব্যবসা
সহজীকরণের লক্ষ্যে কয়েকটি শিল্পকে আমরা কমলা তালিকায় রেখেছিলাম। যেমন জাহাজ ভাঙা শিল্প। জাহাজ ভাঙার মাধ্যমে পরিবেশদূষণ হলেও সেটা শিল্প-কারখানার মতো লোকালয়ে পরিবেশদূষণ করছে না। তাই তাদের ছাড়পত্রের বিষয়টি কেন্দ্রীয় অফিসের বদলে বিভাগীয় অফিস থেকে তদারক করা যৌক্তিক বলে আমরা মনে করেছি। কিন্তু এটি নিয়ে পরিবেশবাদীরা ঘোর আপত্তি জানালে পরবর্তী সময়ে সেটি সংশোধন করে আগের মতোই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করি।’
সার্বিকভাবে নতুন পরিবেশ বিধিমালা আগের চেয়ে অনেক বিস্তারিত ও শক্তিশালী হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি বলেন, ‘এ
বিধিমালা ১৯৯৭-এর বিধিমালার চেয়ে অনেক বিস্তারিত। এখানে পরিদর্শন করে ছাড়পত্রের যে বিধান রাখা হয়েছে তা শক্তিশালী বিধান বলে মনে করি। আমার বিবেচনায় বিধিমালাটি আরো আধুনিক করা যেত। বিশেষ করে জনমত যাচাই, জনগণের অভিযোগের নিষ্পত্তি ও গণশুনানির বিষয়ে। পরিবেশ অধিদপ্তর যদি এ বিধিমালা প্রয়োগ করতে চায় তবে তার আরো অনেক জনবল এবং দাপ্তরিক সক্ষমতার প্রয়োজন। নয়তো এ বিধিমালার সুফল মিলবে না। এটি যেন কাজির গরুতে পরিণত না হয়, সেই সদিচ্ছা সরকারকে দেখাতে হবে।’










