উৎপাদন খরচ বিবেচনায় ন্যায্য রফতানি মূল্য না পাওয়ায় একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সাতক্ষীরার মুরারিকাটি গ্রামের অত্যন্ত সম্ভাবনাময় মাটির তৈরি টালি শিল্প। গত পাঁচ বছরের ব্যবধানে অন্তত ৭০ শতাংশ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। যে কয়টি বর্তমানে উৎপাদনে আছে তারাও হয়তো প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পেরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

জানা গেছে, পাঁচ-ছয় বছর আগেও জেলার কলারোয়া উপজেলার মুরারিকাটি টালি পল্লী ছিল নারী-পুরুষ শ্রমিকে মুখরিত। আশপাশের অন্তত ছয়-সাত হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছিল রফতানিজাত মাটির টালি উৎপাদন করে। এখানে দেশের অনেক বড় বড় রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান আসত টালি সংগ্রহ করতে। মুরারিকাটির মাটির তৈরি টালি রফতানি হতো ইউরোপ-আমেরিকার অনেক দেশে। কিন্তু নানা সংকটের মুখে পড়ে ২০১৬ সালের পর থেকে মুরারিকাটির টালি কারখানা একের পর এক বন্ধ হয়ে গেছে ৭০ শতাংশ। যেখানে ২০১৫ সাল পর্যন্ত টালি তৈরি কারখানা ছিল ৪৫-৫০টি। বন্ধ হতে হতে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১২-১৩টিতে।

রফতানিজাত টালি উৎপাদনকারী মুরারিকাটি গ্রামের প্রতিষ্ঠান মেসার্স দীপা টালির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাদল চন্দ্র পাল জানান, তার প্রতিষ্ঠানে ছয় থেকে দশ প্রকার টালি উৎপাদন হয়। এসব টালির মধ্যে ফেক্স অ্যাংগুলার টালি, হেড ড্রাগুলার, স্কাটিং, স্টেম্প, স্কয়ার, রুপ, ব্রিকস ও ফ্লোর টালি উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠানে দৈনিক চার থেকে সাড়ে চার হাজার পিস টালি উৎপাদন হচ্ছে। এর আগে পরিমাণ ছিল আরো বেশি। বাদল চন্দ্র পাল আরো জানান, ২০১৬-১৭ সালের দিকেও তার উৎপাদন পরিমাণ দৈনিক ১০-১২ হাজার পিস। সে সময় কারখানার সংখ্যাও ছিল ৪৫-৫০টির মতো। নানা সংকটে টিকে থাকতে না পেরে কমপক্ষে ৩০-৩২টি টালি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে ১২-১৩টি কারখানা কোনো রকম উৎপাদন টিকিয়ে রেখেছে। তবে সেগুলোর অবস্থাও ভালো নয়। তিনি বলেন, ইতালিতে প্রতি টালির মূল্য দিচ্ছে সর্বোচ্চ ৭ থেকে সাড়ে ৭ টাকা। যা উৎপাদন খরচ পড়ে যায় ৬ থেকে সাড়ে ৬ টাকা। ফলে রফতানি মূল্য কম হওয়ার কারণে এক এক করে বন্ধ হয়ে গেছে অন্তত ৭০ শতাংশ টালি কারখানা।

মুরারিকাটি গ্রামের আরো এক টালি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স শেখ ট্রেডার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কলারোয়া পৌর কাউন্সিলর মো. ইমদাদুল ইসলাম জানান, মুরারিকাটির টালি শিল্প শুরু থেকে খুবই সম্ভাবনাময় হয়ে ওঠে রফতানিতে। এখানকার মাটির টালি ইতালিতে ব্যাপক চাহিদা হয়। দেশের বিভিন্ন রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান মুরারিকাটির টালি রফতানি করতে এগিয়ে আসে। কিন্তু মাত্র ছয়-সাত বছরের ব্যবধানে এ টালি শিল্প প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, উৎপাদিত পণ্যের সঠিক দাম না পাওয়ার পাশাপাশি জ্বালানি ও শ্রমিকের মূল্য বেড়ে যাওয়া। একটি রফতানিযোগ্য টালি তৈরি করতে খরচ পড়ছে প্রায় ৭ টাকা। সেখানে বিক্রি মূল্য পাওয়া যাচ্ছে ৭ থেকে সাড়ে ৭ টাকা। ফলে টিকে থাকতে না পেরে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এরইমধ্যে। তিনি নিজেও হয়তো উৎপাদন বন্ধ করে দিতে পারেন বলে জানান।

বাদল চন্দ্র ও ইমদাদুল ইসলামের দেয়া তথ্যমতে বর্তমান বছরে আট-নয় কোটি টালি উৎপাদন হচ্ছে এখানে। যার বর্তমান রফতানি মূল্য ৫০-৫৫ কোটি টাকা। কয়েক বছর আগেও এর তিন-চার গুণ বেশি পরিমাণ উৎপাদন হয়েছে। তাদের দাবি এ টালি শিল্প টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারের সহযোগিতা দরকার। তা না হলে এ সম্ভাবনাময় রফতানি শিল্পটি নিঃশেষ হয়ে যাবে শিগগিরই। সরকারকে রফতানি মূল্য বৃদ্ধির ব্যাপারে উদ্যোগী হতে হবে বলে জানান তারা।

খুলনার টালি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান মা কটোজ আইএনসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী আজগার রিপন বণিক বার্তাকে জানান, কলারোয়ার মুরারিকাটি গ্রামের উৎপাদিত মাটির তৈরি টালির ইউরোপ-আমেরিকায় প্রচুর চাহিদা রয়েছে। তবে করোনা-পরবর্তী সময়ে চাহিদা কিছু কমে গেছে। তবে বর্তমানে তিনি ইতালিতে রফতানি করছেন না। এখন ইতালি বাদে ইউরোপ-আমেরিকার প্রায় ২০টি দেশে টালি রফতানি করছেন। তিনি বলেন, টালি ইতালিতে রফতানি মূল্য ৭ টাকা, তা ইউরোপ-আমেরিকায় দাম পাওয়া যাচ্ছে ২২-২৫ টাকা। ফলে মাটির টালি এখন ইতালিতে রফতানি করতে আগ্রহ হারাচ্ছে অনেক রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান।

মা কটোজ আইএনসি ছাড়াও খুলনার জে. কে. ইন্টারন্যাশনাল, আরনো এক্সপোর্ট ইমপোর্টসহ দেশের বড় বড় প্রতিষ্ঠান মুরারিকাটি গ্রামের টালি ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশে রফতানি করছে।

এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মোহাম্মাদ হুমায়ুন কবির বণিক বার্তাকে বলেন, সাতক্ষীরার কলারোয়ার মুরারিকাটি গ্রামের মাটির তৈরি টালি ইউরোপ-আমেরিকার অনেক দেশে রফতানি হচ্ছে। এটি এ জেলার জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ও আনন্দের। এটি টিকে থাকলে আগামীতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে খুবই ভালো ভূমিকা রাখতে পারবে মনে করছেন তিনি। আর এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসক হিসেবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে জানান তিনি।