দীর্ঘদিন ধরে সিলেটের পর্যটন শিল্পে চলছে মন্দা ভাব। করোনার পর চলতি বছর ভয়াবহ বন্যায় ব্যাপক ক্ষতি হয় এ শিল্পের। সর্বশেষ পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর পর্যটকরা ছিল কুয়াকাটামুখী। ফলে সিলেট অঞ্চলে পর্যটক-খরা অব্যাহত ছিল। তবে এবার বড়দিনের একদিন ও সাপ্তাহিক দুদিনের ছুটিসহ তিনদিনের ছুটিতে ব্যাপক পর্যটক উপস্থিতির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে সিলেটের বেশির ভাগ হোটেল-মোটেল বুকিং হয়ে গিয়েছে। ফলে বছরের বিদায় ও আগামী বছরের শুরুর মুহূর্তে ব্যবসা ভালো হওয়ার আশা করছেন সিলেটের পর্যটন শিল্পসংশ্লিষ্টরা।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের প্রাচুর্যে ভরা সিলেট। চা-বাগান, জলাবন বন, পাথুরে নদী, পাহাড়ের কোল থেকে নেমে আসা ঝরনা, দিগন্তবিস্তৃত নীল জলরাশির হাওরসহ বিভাগজুড়ে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন সব পর্যটনকেন্দ্র। প্রকৃতিকে কাছে থেকে দেখার মতো রয়েছে বহু পর্যটন স্পট, কিন্তু পর্যটনের ভরা মৌসুম যখন চলছিল তখন সিলেটে বাগড়া দেয় দফায় দফায় বন্যা। চলতি বছরের মে ও জুন মাসে ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়ে সিলেট। এর পরই ধস নামে সিলেটের পর্যটন শিল্পে। রাস্তাঘাট থেকে নিয়ে কৃষি, মৎস্যসহ সব খাত বিপর্যস্ত করে বন্যা। পর্যটন কেন্দ্রগুলোও ছিল পানিতে নিমজ্জিত। পবিত্র ঈদুল আজহারও ছুটিতেও সিলেটে পর্যটন সমাগম ঘটেনি। এতে পর্যটনসংশ্লিষ্টদের প্রতিদিন লোকসান গুনতে হয়েছে শত কোটি টাকার।

সিলেট হোটেল, মোটেল অ্যান্ড গেস্ট হাউস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এটিএম শোয়েব বলেন, ‘পর্যটনের সাথে কেবল হোটেল নয়, আরো অনেকগুলো বিষয় জড়িত। এর সাথে পরিবহন, রেস্টুরেন্ট, শপিং মল ও নৌকার বিষয়টিও জড়িত। অর্থাৎ পর্যটকরা যেদিকে যাবেন, সেদিকে আর্থিক বিষয় সম্পৃক্ত। অতীতে পর্যটক না আসায় সব খাতেই এর প্রভাব পড়েছে।’ 

এটিএম শোয়েব আরো বলেন, ‘বন্যার ভয়াবহতার কারণেও অনেক পর্যটক সিলেট আসতে চাননি। আবার পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর পর্যটকরা অনেকটা বরিশাল-কুয়াকাটামুখী হয়ে পড়েন। এ দুই কারণে মূলত সিলেটে পর্যটকের সংখ্যা কম ছিল। তবে পর্যটকের বরিশাল-কুয়াকাটামুখী স্রোত কমে আসতে শুরু করেছে। এর সাথে সিলেটের দিকে পুনরায় ঝুঁকছেন।’

সিলেট নগরীর ফরচুন গার্ডেনের এমডি সুমাইয়াত নুরী জুয়েল জানান, বিগত ঈদে সিলেটে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল এর আগে কোনো মৌসুমেই এ রকম অবস্থা হতে দেখিনি। এবার অনেক হোটেল মোটেল আগে থেকেই অনেকে বুকিং দিয়েছেন। ফলে এবার একটু ব্যবসা ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে যে ক্ষতি হয়েছে সেটা অপূরণীয়।

কোম্পানীগঞ্জ ট্যুরিস্ট ক্লাবের সভাপতি আবিদুর রহমান জানান, সিলেটের পর্যটনকেন্দ্রগুলো সব মৌসুমেই সচল থাকে। সাদাপাথর তেমন একটি পর্যটন কেন্দ্র। শীত মৌসুমে নৌকা চলাচলে কিছুটা প্রতিবন্ধকতা থাকলেও সাদাপাথরের দৃশ্য থাকে আরো আকর্ষণীয়। অতীতে অনেক ক্ষতি হয়েছে এ শিল্পে। আশা করা যাচ্ছে এবার ব্যবসা ভালো হবে।

জাফলংয়ের মামার দোকানের ব্যবসায়ী সজিবুল ইসলাম বলেন, বিগত দিনগুলোয় ভরা মৌসুমেও তারা অলস সময় পার করেছেন। ২৩, ২৪ ও ২৫ ডিসেম্বর তিনদিনের ছুটি রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এ দিনগুলোয় ব্যাপক পর্যটক সমাগম ঘটবে।

সিলেট ট্যুরিজম ক্লাবের সভাপতি হুমায়ুন কবীর লিটন বলেন, ‘বন্যায় পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে যাতায়াতের সড়কের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। যার জন্য পর্যটকরা আসতে অনাগ্রহী ছিলেন। তবে দিন দিন সিলেটের পরিস্থিতি ভালো হচ্ছে। বিশেষ করে বড়দিনসহ টানা তিনদিনের ছুটি হওয়ায় অনেকেই সিলেটের বাইরে থেকে হোটেল বুকিং করতে সহয়তা চাচ্ছেন, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত হোটেল রুম দেয়া যাচ্ছে না।’

সিলেট জেলা প্রশাসক মো. মজিবর রহমান বলেন, ‘বিগত বন্যা শিল্প-বাণিজ্যের সব খাতে কোনো না কোনভাবে ক্ষতি সাধন করেছে। এর মধ্যে পর্যটন শিল্প ছিল অন্যতম। এবার পর্যটনে সুদিন ফিরবে বলে আশা করা যাচ্ছে। পর্যটনসমৃদ্ধ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের। আশা করছি পুনরায় সিলেটের পর্যটন কেন্দ্রগুলো মুখর হয়ে উঠবে।’