সারা দেশের কৌশলগত স্থানে সাইলো, সিএসডি এবং দেশের প্রায় সব জেলা ও উপজেলায় এলএসডির মাধ্যমে খাদ্য মজুদ কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন খাদ্য অধিদপ্তর। সংস্থাটির বর্তমান খাদ্য মজুদ সক্ষমতা প্রায় ২১ লাখ টন। তবে চলতি বছরের শেষ নাগাদ আরো তিনটি সাইলো চালু হচ্ছে। আশুগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইলের মধুপুরের সাইলোর মাধ্যমে মজুদ সক্ষমতা বাড়বে দুই লাখ টন।
সূত্র জানায়, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে খাদ্যশস্যের কার্যকর ধারণক্ষমতা ছিল ১৪ লাখ ৯৩ হাজার টন। ২০০৯-১০ অর্থবছরে ১৫ লাখ ২৯ হাজার টন হলেও তা ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১৮ লাখ ৭৬ হাজার টনে উন্নীত হয়। কয়েক বছর ধরেই খাদ্যশস্যের মজুদ সক্ষমতা ২১ লাখ টনেই আটকে আছে। যদিও অর্থনৈতিক মজুদ সক্ষমতা কিছুটা কম, প্রায় ২০ লাখ টন। অনেক সময় খাদ্যগুদামের পরিপূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। বেশ কয়েক বছর খাদ্যগুদামের অর্ধেকই অব্যবহূত থাকে। তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খাদ্য মজুদ বাড়াচ্ছে সরকার। চলতি বছর চাল ও গম আমদানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রায় ৩৩ লাখ টন খাদ্যশস্য আমদানি ও অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে সংগ্রহ করবে খাদ্য অধিদপ্তর। এ অবস্থায় মজুদ সক্ষমতা বাড়ানোয় জোর দেয়া হচ্ছে। চলমান প্রকল্পগুলো দ্রুত সমাপ্তকরণের মাধ্যমে মজুদ সক্ষমতা বাড়াতে চায় খাদ্য মন্ত্রণালয়।
এ বিষয়ে খাদ্য সচিব ড. মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম বণিক বার্তাকে বলেন, খাদ্যশস্যের মজুদ বাড়ানোয় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এজন্য চলমান প্রকল্পগুলোকে তদারকি করা হচ্ছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই তিনটি নতুন সাইলো চালু করতে পারব বলে আশা করছি। কভিডের কারণে কার্যক্রম কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। তবে আমরা দ্রুত কার্যক্রম সমাপ্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এসব সাইলো হবে আন্তর্জাতিক মানের। দেশে যে খাদ্য গোডাউন (এলএসডি, সিএসডি) আছে, সেগুলো ফ্ল্যাট গোডাউন। এতে বস্তাবন্দি করে শস্য রাখা হয়। কিন্তু আধুনিক খাদ্য সংরক্ষণাগারে সেটি করা হবে না। এতে মানসম্পন্নভাবে দীর্ঘদিন খাদ্য সংরক্ষণ করা যাবে। প্রাথমিকভাবে একটি সাইলোতে আড়াই থেকে তিন বছর পর্যন্ত খাদ্যশস্যের মান সম্পূর্ণ বজায় রেখে সংরক্ষণ করা যাবে। দেশের আরো কয়েকটি অঞ্চলে একই ধরনের সাইলো নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, সারা দেশের কৌশলগত স্থানে সাইলো, সিএসডি এবং দেশের প্রায় সব জেলা-উপজেলায় কমপক্ষে একটি এলএসডি, গুরুত্বপূর্ণ উপজেলায় দুই বা ততোধিক এলএসডির মাধ্যমে খাদ্য ব্যবস্থাপনার প্রশাসনিক ও পরিচালন কার্যাবলি সম্পাদন করে। খাদ্য অধিদপ্তরের সাতটি সাইলো, ১২টি সিএসডি এবং ৬৩২টি এলএসডিতে এক হাজার টনের ৭১২টি ৫০০ টনের ১ হাজার ৭৯০টি এবং আরো বিভিন্ন রূপ ধারণ ক্ষমতার ২২০টিসহ মোট ২ হাজার ৭২২টি গুদাম রয়েছে। বর্তমানে গুদামগুলোর সম্মিলিত ধারণক্ষমতা ২১ লাখ টন। এ ধারণ ক্ষমতা পর্যায়ক্রমে ৩০ লাখ টনে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
জানা গেছে, বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে নানা ধরনের খাদ্যগুদাম নির্মাণ করছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। আধুনিক খাদ্য সংরক্ষণাগার নির্মাণ প্রকল্পের মাধ্যমে ৫ দশমিক ৩৫ লাখ টন ধারণ ক্ষমতার আটটি আধুনিক স্টিল সাইলো (চাল ও গম) নির্মাণ করা হচ্ছে। ৩ হাজার ৫৬৮ কোটি ৯৪ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির মেয়াদকাল ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের অক্টোবর মেয়াদে বাস্তবায়িত হবে। দ্বিতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে ১ হাজার ৬৪৮ কোটি ৯৮ লাখ টাকা বৃদ্ধি করা হয়। প্রথম অনুমোদনের সময় বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৯১৯ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে ১ হাজার ৯১৯ কোটি ৯৬ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়। মূলত এসব সাইলোর মাধ্যমে ধারণসক্ষমতা প্রায় ২৬ লাখ টনে উন্নীত করার পরিকল্পনা করা হয়।
দেশের আটটি অঞ্চলে সাইলোর মধ্যে ঢাকা স্টিল রাইস সাইলো (ঢাকা সিএসডি), নারায়ণগঞ্জ স্টিল রাইস সাইলো (নারায়ণগঞ্জ সিএসডি), মধুপুর স্টিল রাইস সাইলো (টাঙ্গাইল), বরিশাল স্টিল রাইস সাইলো (বরিশাল সিএসডি), ময়মনসিংহ স্টিল রাইস সাইলো (ময়মনসিংহ সিএসডি), মহেশ্বরপাশা স্টিল গমের সাইলো (মহেশ্বরপাশা সিএসডি), চট্টগ্রাম স্টিল গমের সাইলো (চট্টগ্রাম সাইলো) এবং আশুগঞ্জ স্টিল রাইস সাইলো (আশুগঞ্জ সাইলো)। স্টিল সাইলো বেশ টেকসই এবং দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ করা যায়। অন্যদিকে সারা দেশে ১ লাখ ৫ হাজার টন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন নতুন খাদ্যগুদাম নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষ হয়েছে। এ প্রকল্পে এক হাজার টনের ৫২টি এবং ৫০০ টনের ১০৬টি গুদামসহ মোট ১৫৮টি নতুন খাদ্যগুদাম নির্মাণ করা হয়েছে। বগুড়ার সান্তাহারে ২৫ হাজার টন ধারণ ক্ষমতার অত্যাধুনিক বহুতলবিশিষ্ট খাদ্যগুদাম নির্মাণ কার্যক্রম শেষ হয়েছে। প্রকল্পটি ৪০০ কোটি ৯১ লাখ টাকায় সংশোধিত আকারে বাস্তবায়িত হচ্ছে। ২০১৩ সালে জুলাই থেকে গত বছরের জুন মেয়াদে বাস্তবায়ন হচ্ছে।
সরকার আধুনিক সাইলো নির্মাণের পাশাপাশি পাঁচ লাখ গৃহস্থালি সাইলো নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রত্যেক গৃহস্থালিতে ৬০ কেজি করে খাদ্য সংরক্ষণ করে রাখা যাবে। এর ফলে দুর্যোগের সময় পর্যাপ্ত খাদ্য পাওয়া যাবে। এছাড়া ৩১৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ে সারা দেশে পুরনো খাদ্যগুদাম ও আনুষঙ্গিক সুবিধাদির মেরামত এবং নতুন অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। জুলাই ২০১৮ থেকে জুন ২০২১ মেয়াদে বাস্তবায়িত হচ্ছে। ‘সারা দেশের পুরনো খাদ্যগুদাম ও আনুষঙ্গিক সুবিধাদির মেরামত এবং নতুন অবকাঠামো নির্মাণ’ প্রকল্পটি প্রাক্কলিত ব্যয় ৩১৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। জুলাই ২০১৮ থেকে জুন ২০২১ পর্যন্ত মেয়াদকালে বাস্তবায়িত হবে। সারা দেশের আটটি বিভাগের ৬২টি জেলাধীন ১৯৪টি উপজেলা ও স্তটি সিটি করপোরেশনে এটি বাস্তবায়িত হবে। সেখানে ৫৫০টি গুদাম ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক সুবিধাদির মেরামত করা হবে। নতুন অবকাঠামো নির্মাণ ২০টি, তিনটি (ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনা) ল্যাবরেটরিতে যন্ত্রপাতি/যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং ৭২৫টি স্থাপনায় সোলার প্যানেল স্থাপন করা হবে। পরিবার পর্যায়ে প্লাস্টিকের সংরক্ষণাগারের মাধ্যমে খাদ্য মজুদাগারের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। মাটির পাত্র বেশ স্বাস্থ্যসম্মত কিন্তু উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য প্লাস্টিক সাইলো বৃদ্ধি করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, সরকারিভাবে ধান, চাল ও গমের গুদামজাত করা হয়। খাদ্য গুদামগুলোর ধারণক্ষমতা প্রায় ২১ লাখ টন। এটি দেশের জন্য মোটেও পর্যাপ্ত নয়। সামনের দিনে এটিকে ৫০ লাখ টনে বাড়িয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করতে হবে। দেশের অধিকাংশ কৃষক ক্ষুদ্র ও ছোট হওয়ার কারণে তাড়াতাড়ি বিক্রি করতে বাধ্য হয়। ফলে শস্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত হয় না। গুদাম কিংবা সংরক্ষণাগার সুবিধা বাড়ানোর মাধ্যমে কৃষকের ন্যায্য দাম দেয়া সম্ভব। বাজার ও কৃষকের চাহিদা অনুসারে শস্যগুদাম নির্মাণে জোর দিতে হবে। সরকারের গুদাম খালি থাকলে ব্যবসায়ীরা এ সুযোগের অপব্যবহার করেন। ফলে বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। তাই কৃষক ও ভোক্তাস্বার্থে দেশের খাদ্যগুদামের মজুদ বাড়াতে হবে।










