রাজধানীর অদূরে কেরানীগঞ্জে ২০১৭ সালে ঝিলমিল আবাসন প্রকল্পের কাজ শুরু করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। এ প্রকল্পের আওতায় বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী ৪৮০ বিঘা জমিতে ৮৫টি বহুতল ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা। এর মধ্যে ৬০টি ভবন হবে ২০ তলাবিশিষ্ট এবং বাকিগুলো ২৫ তলার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার পরিবেশ-প্রকৃতি ও জলবায়ু ঝুঁকি বিবেচনায় সেখানে সুউচ্চ ভবন নির্মাণের প্রকল্পটি রাজউকের সঠিক সিদ্ধান্ত নয়।

ঝিলমিলের মতোই পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের বড় একটা অংশও ভূমিকম্প ও ভূমিধসের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছেন নগর বিশ্লেষকরা। এছাড়া রাজউক অনুমোদিত আবাসন প্রকল্পগুলোর প্রায় সবই রাজধানীর পার্শ্ববর্তী এলাকার জলাধার কিংবা নিচু ভূমি ভরাট করে গড়া হয়েছে। এগুলোও ভূমিকম্পের অতিঝুঁকিতে। রাজউকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, ভূমিকম্প ও পরিবেশগত ঝুঁকি যাচাই ছাড়া আবাসন প্রকল্প ও ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেয়ার বিষয়টি তাদের কাঠামোগত ভুলের অংশ। ফলে ঢাকায় ভূমিকম্পের ঝুঁকি বেড়েছে স্বাভাবিকের চেয়ে তীব্রভাবে।

ভূতাত্ত্বিক গঠনের দিক থেকে ঢাকা মধুপুর ট্র্যাক্টের অন্তর্ভুক্ত। যদিও এ ট্রাক্টের বেশির ভাগ অংশেরই মাটি শক্ত। সে হিসেবে ঢাকার ভূমিকম্পের প্রবণতা প্রাকৃতিকভাবেই কম। তবে এ অঞ্চলে কিছু ত্রুটিপূর্ণ ভূমি রয়েছে, যেগুলো ভূমিকম্পের বেশ ঝুঁকিতে। এর মধ্যে পূর্বাচল, উত্তরা, কেরানীগঞ্জ, মিরপুর, ডেমরা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। মূলত খাল-বিল ও নদ-নদীর পার্শ্ববর্তী ভূমিগুলোই ত্রুটিপূর্ণ ভূমি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন গবেষকরা। এ বিবেচনায় রাজউকের গড়া পূর্বাচল নতুন শহর, ঝিলমিল ও উত্তরা থার্ড ফেজ—এ তিনটি আবাসন প্রকল্পই ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে। তুরাগ তীরের পার্শ্ববর্তী খাল-বিল ও জলাভূমি ভরাট করে নির্মিত হয়েছে উত্তরা থার্ড ফেজ ও পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প। অন্যদিকে বুড়িগঙ্গা থেকে দুই কিলোমিটার দূরে জলাভূমি ভরাট করে গড়ে উঠছে সুরম্য আবাসন প্রকল্প ঝিলমিল। এছাড়া অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে শক্ত মাটির এলাকায়ও ভূমিকম্পের ঝুঁকি বাড়ছে বলে গবেষকরা সতর্ক করেছেন।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন যদিও বলছেন, রাজউকের আবাসন প্রকল্পের কারণে নয়, বরং ভূমিদসুদ্যের কারণে রাজধানীর প্রকৃতিপ্রদত্ত শক্ত অংশেও ভূমিকম্পের ঝুঁকি বাড়ছে। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাজউকের আবাসন প্রকল্পের কারণে রাজধানীতে ভূমিকম্পের ঝুঁকি খুব একটা বাড়ছে না। তবে যারা নদী-খাল ও বিল ভরাট করে আবাসন প্রকল্প নির্মাণ করেছে, এরাই মূলত ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। জলাভূমি ভরাটের কারণে সারাদেশে গ্রাউন্ড ওয়াটার রিচার্জ হচ্ছে না। ঢাকা শহরে প্রায় দুই কোটি মানুষের নিত্য ব্যবহার্য পানির সিংহভাগই নেওয়া হচ্ছে ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে। মূলত এ কারণেই ঢাকায় ভূমিকম্পের ঝুঁকি অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে।’

রাজধানীর বাসযোগ্যতা নিশ্চিতে জলাভূমি রক্ষা করা রাজউকের দায়িত্ব হলেও সংস্থাটি নিজেই তা ভরাট করে আবাসন প্রকল্প নির্মাণ করছে, এমন অভিযোগ নগর পরিকল্পনাবিদদের। এতে অন্য আবাসন কোম্পানিগুলো খাল-বিল ও জলাভূমি ভরাটের সাহস পাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জলাভূমি ভরাট করে যে আবাসন প্রকল্পগুলো রাজউকসহ বিভিন্ন কোম্পানি করছে, তাতে যখন বড় বড় ভবন হবে তখন সেগুলো ভূমিকম্পসহ নানভ দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকবে। এতে অনেক ক্ষয়ক্ষতির শঙ্কা রয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে রাজউকের সংশ্লিষ্টতা থাকায় ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়ন ব্যবস্থাপনায় আইনের শাসন প্রয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সংস্থাটির নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়।’

নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ আরো বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, জলাশয়-জলাভূমি ভরাটের মাধ্যমে আবাসন প্রকল্প গড়ে ওঠার সময় রাজউকসহ রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। কখনো কখনো নিজের অসহায়ত্বও প্রকাশ করে। পরবর্তী সময়ে আবার নতুন পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় জরিমানা বা অন্যান্য উপায়ে প্রকল্পগুলো এক ধরনের বৈধতা হয়তো পেয়ে যায়। অথচ এতে ভূমিকম্পসহ অন্যান্য নগর দুর্যোগের মাধ্যমে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। রাজউকসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে এ প্রক্রিয়া থেকে বের হয়ে নিরাপদ নগরায়ণ নিশ্চিত করতে টেকসই পরিকল্পনা ও উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণে নির্মোহভাবে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে।’

বাংলাদেশ প্ল্যানার্স ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, এক দশকে ঢাকা ও এর চারপাশের ১ লাখ ৯৩৭ একর জলাশয় ভরাট হয়েছে। ঢাকা মহানগরীতেই ভরাট হয়েছে ৯ হাজার ৫৫৬ একর। কেরানীগঞ্জে ২৬ হাজার ৪৭৪, রূপগঞ্জে ১৬ হাজার ৫৪২, গাজীপুরে ১৩ হাজার ৮৪২ ও সাভারে ২০ হাজার ৬৩৮ একর জলাশয় অস্তিত্ব হারিয়েছে। তবে এ হািসবও এক বছর আগের। এ সময়ের মধ্যে আরো অনেক জলাশয়কেই তার শ্রেণী পাল্টে দেয়া হয়েছে বলে জানান গবেষকরা। রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) চেয়ারম্যান মো. এজাজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা ঢাকার জলাভূমি নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দেখেছি, উত্তরা থার্ড ফেজ ও ঝিলমিলের পুরোটা এবং পূর্বাচল নতুন শহরের বড় অংশ রাজধানীর জলাভূমি ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে। যথাযথ ওয়াটার মডেলিং করে সরকারি-বেসরকারি আবাসন প্রকল্পগুলো ডেভেলপ না করার ফলে ঢাকায় ভূমিকম্পের ঝুঁকি তীব্র হচ্ছে।’

জলাভূমি ভরাট করে সরকারি ও বেসরকারি আবাসন প্রকল্প নির্মাণের ফলে শুধু ভূমিকম্পই নয়, আরো অনেক দুর্যোগের সঙ্গেই লড়াই করতে হচ্ছে নগরবাসীকে। জলজট ও তাপপ্রবাহ এমনকি ডেঙ্গুর মতো সমস্যাগুলোর পেছনেও জলাভূমি ভরাটই বড় কারণ বলে উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ঢাকার অবৈজ্ঞানিক ও অপরিকল্পিতভাবে জলাভূমি ভরাট হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মাকসুদ হাসেম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘কৃষিভূমি বা জলাধারের শ্রেণী পরিবর্তন করে আবাসিক করা আসলে একটি অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। ঢাকার যেখানে কৃষিভূমিতে আবাসন করা হয়েছে, সেখানেই দুর্যোগ স্থায়ী আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে জলাবদ্ধতা, তাপপ্রবাহ, ডেঙ্গু—এগুলো ওয়াটারবডির শ্রেণী পরিবর্তনের কারণেই হচ্ছে।’

অবকাঠামো নির্মাণ ও পরবর্তী সময়ে তা ভেঙে ফেলা বা জরিমানা নিয়ে অনুমোদন দেয়ার বিষয়টি দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেছেন নগর গবেষণা কেন্দ্রের সভাপতি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এ শহরে একটা সময় ধান চাষ হতো, মাছ ধরা যেত, খাল ছিল, সুন্দর নদী ছিল, বাঁচার পরিবেশ ছিল। এসব হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শহরটির বাসযোগ্যতাও হারিয়ে গেছে। এক্ষেত্রে আবাসন প্রকল্পগুলোর দায়ই সবচেয়ে বেশি। বিষয়টি সরকার ও নগরবিদদের গুরুত্ব দিয়ে ভাবা দরকার।’