চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড ও মিরসরাই উপকূল ঘিরে স্থাপন করা হয়েছে মেয়াদোত্তীর্ণ স্ক্র্যাপ জাহাজ ভাঙার ইয়ার্ডগুলো। চালু থাকা ৫০টির বেশি ইয়ার্ডে কাজ করেন প্রায় ২৫ হাজারের বেশি শ্রমিক। ঝুঁকিপূর্ণ এ শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের সিংহভাগই আসে উত্তরবঙ্গের দারিদ্র্যপীড়িত জেলাগুলো থেকে। পরিসংখ্যান বলছে, গত এক দশকে বিভিন্ন দুর্ঘটনায় এ খাতের প্রায় ১৫৬ জন শ্রমিক মারা গেছেন, যাদের মধ্যে ৮৯ জন উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার। দেশের উত্তরাঞ্চলে কর্মসংস্থানের সুযোগ তুলনামূলক কম থাকায় উচ্চ মজুরির আশায় ঝুঁকিপূর্ণ এ পেশায় যুক্ত হয়েছেন ওই অঞ্চল থেকে কাজের সন্ধানে আসা শ্রমিকরা।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মঙ্গা ও দারিদ্র্যপীড়িত এলাকা হিসেবে পরিচিত দেশের উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা। জাহাজ ভাঙা শিল্প বর্তমান অবস্থানে এসেছে ওই অঞ্চলের মানুষের শ্রমে। এছাড়া জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডের কাজ ঠিকাদারের হাতে চলে যাওয়ায় তারাও উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে শ্রমিকদের নিয়ে এসেছেন। তবে সম্প্রতি এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। এরই মধ্যে এ পেশায় যুক্ত হওয়া স্থানীয়দের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় উত্তরবঙ্গের শ্রমিক মৃত্যুর হার কমেছে কিছুটা।

শিল্প মন্ত্রণালয়, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর এবং বেসরকারি সংস্থা ইপসার তথ্যমতে, ২০০৫ থেকে ২০২০—এই ১৬ বছরে এ শিল্প খাতে শ্রমিক মারা গেছেন প্রায় ২১৪ জন। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত মারা গেছেন প্রায় ১৩ জন। তবে জাহাজ ভাঙা শিল্পের শুরুর থেকে এখন পর্যন্ত কতজন শ্রমিক মারা গেছেন, তার কোনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি। এমনকি এ খাতে শুরু থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত উত্তরবঙ্গের মানুষজনই এ পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে পরিস্থিতি পরিবর্তনে স্থানীয়রা এখন এ পেশায় যুক্ত হচ্ছেন বেশি।

উত্তরবঙ্গের কতজন শ্রমিক মারা গেছেন তার সুনির্দিষ্ট তথ্য না পাওয়া গেলেও ২০১২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত মৃত্যুবরণকারী শ্রমিকের ঠিকানাসংবলিত তালিকা রয়েছে। এ তালিকা অনুযায়ী, ২০১২-২০২১ সাল পর্যন্ত এক দশকে মারা গেছেন ১৫৬ জন শ্রমিক। যার মধ্যে উত্তরবঙ্গের ৮৯ জন বা ৫৭ দশমিক ১০ শতাংশ এবং অন্যান্য অঞ্চলের ৪২ দশমিক ৯০ শতাংশ। তবে শুরু থেকে যারা মারা গেছেন, তার পরিসংখ্যান না থাকলেও শুরুর দিকে শ্রমিক মৃত্যুর ৯০ শতাংশই ছিল এ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০১২ সালে জাহাজ ভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনায় নিহত হন ২১ জন। এর মধ্যে উত্তরবঙ্গের ১৪ জন ও অন্যান্য অঞ্চলের সাতজন। ২০১৩ সালে নিহত ১১ জনের মধ্যে ছয়, ২০১৪ সালে নয়জনের মধ্যে পাঁচ, ২০১৫ সালে নিহত ১৬ জনের মধ্যে ১১, ২০১৬ সালে নিহত ১৭ জনের মধ্যে উত্তরবঙ্গের ১৪, ২০১৭ সালে নিহত ১৫ জনের মধ্যে ১০, ২০১৮ সালে ২০ জনের মধ্যে ১১, ২০১৯ সালে ২২ জনের মধ্যে ১০, ২০২০ সালে ১১ জনের মধ্যে চারজন উত্তরবঙ্গের শ্রমিক নিহত হয়েছেন। অর্থাৎ গত এক দশকে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার শ্রমিক মারা গেছেন ৮৯ জন ও অন্যান্য জেলার শ্রমিক মারা গেছেন ৬৭ জন।

তথ্যমতে, চলতি বছরের শুরুতেই ৫ মার্চ তাসিন শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে লৌহার পাতের আঘাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চমেক হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন ইয়ার্ডের হেলপার ময়মনসিংহের রিপন মিয়া (৩৭)। ১২ এপ্রিল আরএ শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে স্টিলের নিচে চাপা পড়ে মারা যান কুড়িগ্রামের আতাউর রহমান (৪৫)। এদিকে ২৭ মে এমএ মোতালেব স্টিল ইয়ার্ডে নওগাঁর তরিকুল ইসলাম (২৪), ২৫ আগস্ট তাইহুয়া স্টিলে কর্মরত রংপুরের মো. আলী (২৭) আয়রন প্লেটের আঘাতে মারা যান।

চট্টগ্রামের ভাটিয়ারী এলাকার বেশ কয়েকটি শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে কাজ করেন রংপুর, নওগাঁ, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, জামালপুর এলাকার শ্রমিকরা। রংপুরের আনোয়ার শেখ জানান, বাবার হাত ধরে রংপুর থেকে চট্টগ্রামে এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হন আট বছর আগে। আগে আমাদের এলাকার শ্রমিক বেশি কাজ করতেন এখানে। আমাদের এলাকা মঙ্গাপীড়িত হওয়ার কারণে কাজ ছিল না। এখন আগের মতো নেই। এলাকায় কাজের সুবিধা বেড়ে যাওয়ার কারণে এ ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় শ্রমিক আসছে কম। এখন চট্টগ্রামের পাশের এলাকার শ্রমিক এ পেশায় যুক্ত হচ্ছেন।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) সহকারী সচিব নাজমুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, জাহাজ ভাঙা শিল্পের আজকের এ উত্থানের পেছনে সব থেকে বড় অবদান উত্তরাঞ্চলের শ্রমিকদের। ঝুঁকিপূর্ণ এ কাজে শুরুর থেকে তারাই আমাদের সঙ্গে ছিলেন। স্থানীয়রা এ পেশায় আসতে চাইতেন না। কিন্তু অবস্থার পরিবর্তন, বেকারত্ব বেড়ে যাওয়া, কাজের নিরাপত্তা বাড়ায় এখন স্থানীয়রাও এ পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। গত কয়েক বছরে এ খাতে স্থানীয়দের আধিপত্য বেড়েছে। তবে এখনো জাহাজ ভাঙা শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকের প্রায় ৭০ শতাংশই উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার মানুষ।

জাহাজ ভাঙা শিল্পের বিভিন্ন ইয়ার্ড, শ্রমিক, ফোরম্যানদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের অন্যান্য শিল্প খাতের চেয়ে তুলনামূলক বেশি মজুরি দেয়া হয় এখানে। একজন অদক্ষ শ্রমিকও নতুন কাজে যুক্ত হয়ে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা মাসিক বেতন পেয়ে থাকেন। এ খাতের শ্রমিকরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভ্রাম্যমাণ হওয়ায় অল্প দিনের মধ্যেই দক্ষ শ্রমিক হিসেবে নাম লেখায়। এতে করে দ্রুত বেশি বেতনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজের দিকে এগিয়ে যায়। এ কারণে সহজেই মাসিকভিত্তিক অধিক আয় করতে ঝুঁকিপূর্ণ এ পেশায় আসতে প্রলুব্ধ করেন শ্রমিক সংগ্রহে নিয়োজিত মাঝিরা।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই), বিএসবিআরএ এবং পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সরকারিভাবে নিবন্ধিত শিপইয়ার্ডের সংখ্যা ১৫০টির মতো। তবে এর মধ্যে সারা বছর কাজ থাকে এমন শিপইয়ার্ড রয়েছে প্রায় ৫০টি। এ পেশায় যুক্ত রয়েছে ২৫ হাজার শ্রমিক। দেশে ইস্পাতের চাহিদার প্রায় ৮৫ শতাংশের জোগান আসে জাহাজ ভাঙা শিল্প থেকে।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইয়াং পাওয়ার ইন সোস্যাল অ্যাকশনের (ইপসা) সমন্বয়ক মোহাম্মদ আলী শাহীন বণিক বার্তাকে বলেন, দেশের জাহাজ ভাঙা শিল্প উত্তরবঙ্গ থেকে আসা শ্রমিকদের হাতের ওপর আজকে এখানে এসে দাঁড়িয়েছে। এক সময় এ খাতে শ্রমিকদের ৯৫ শতাংশই ছিল উত্তরবঙ্গের। দুর্ঘটনায় আহত ও নিহত বেশি হয়েছে এ এলাকার মানুষ। তবে চট্টগ্রামের মানুষের মধ্যে দারিদ্র্য, বেকারত্ব কিংবা অর্থিক অবস্থার পরিবর্তনের কারণে স্থানীয়রা এখন এ জাহাজ ভাঙা শিল্পে শ্রমিকের কাজে জড়াচ্ছেন। অন্যদিকে উত্তরবঙ্গে সরকারের ইপিজেডসহ নানা উন্নয়নমুখী পদক্ষেপ গ্রহণের কারণে জাহাজ ভাঙা শিল্প খাতে ওই এলাকার শ্রমিক কমে গেলেও এখনো তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ।

স্থানীয়রা বলছেন, প্রতিটি জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডের জন্য শ্রমিক সংগ্রহের মাঝি রয়েছেন। তারা দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে শ্রমিকদের বেশি বেতনের কথা বলে সীতাকুণ্ড এলাকায় নিয়ে আসেন। আবার শুরু থেকেই এ খাতে উত্তরবঙ্গের শ্রমিকের সংখ্যা বেশি হওয়ায় তাদের মাধ্যমেও অনেকে খাতটিতে যুক্ত হচ্ছেন।