বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার চীন। সরকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আমদানি-রফতানি মিলিয়ে মোট বাণিজ্যের প্রায় ১৪ শতাংশই হয় পূর্ব এশিয়ার বৃহৎ এ দেশটির সঙ্গে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য হয়েছিল ৬৭৭ কোটি ডলারের। এর প্রায় এক দশক পর ২০২১-২২ অর্থবছরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য তিন গুণ বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৩ কোটি ডলার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি যত বড় হবে তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চীনের সঙ্গেও বাণিজ্য বাড়বে। বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য বিকাশে আপাতত চীনের কোনো বিকল্প নেই বলেও তাদের দাবি।
বাণিজ্যসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিপুল অর্থের পণ্য চীন থেকে আমদানি করলেও দেশটিতে বাংলাদেশী পণ্য রফতানি হয় খুবই কম। তার পরও দেশটির সঙ্গে ক্রমান্বয়ে বাণিজ্য বাড়বে। কেননা বাংলাদেশ যেসব রফতানি করছে বা নতুন করে রফতানিযোগ্য পণ্য তৈরির বিষয়ে ভাবছে সেগুলোর যন্ত্রাংশ, কেমিক্যাল থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানির প্রধান উৎস চীন। ফলে বাংলাদেশের প্রধান খাতগুলোকে তাদের প্রয়োজনেই দেশটি থেকে এসব কাঁচামাল আমদানি করতে হয়।
সরকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চীন থেকে বাংলাদেশের আমদানি করা পণ্যের মধ্যে রয়েছে পারমাণবিক চুল্লি, প্রকৌশল যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ, তুলা, ইলেকট্রিক্যাল যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ, সাউন্ড রেকর্ডার ও রিপ্রডিউসার, বোনা কাপড়, কৃত্রিম তন্তু ইত্যাদি। দেশটিতে রফতানি হওয়া পণ্যের মধ্যে রয়েছে ওভেন পোশাক, নিটওয়্যার, হোম টেক্সটাইল, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাদুকা ইত্যাদি।
দেশের মোট আমদানির ২৫ শতাংশই আসে চীন থেকে। যদিও মোট রফতানির মাত্র ১ দশমিক ২২ শতাংশ যায় দেশটিতে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১২-১৩ অর্থবছরে দেশটি থেকে আমদানি করা পণ্যের অর্থমূল্য ছিল ৬৩১ কোটি ডলার। এর বিপরীতে চীনে রফতানি হওয়া পণ্যের অর্থমূল্য ছিল ৪৬ কোটি ডলার। এক দশক পর ২০২১-২২ অর্থবছরে চীন থেকে ১ হাজার ৯৩৫ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করা হয়েছে। একই সময়ে দেশটিতে বাংলাদেশ থেকে রফতানি হওয়া পণ্যের অর্থমূল্য ছিল ৬৮ কোটি ডলার। গত ২০২২-২৩ অর্থবছরেও সে ধারা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিসিসিসিআই)। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে সংগঠনটি জানায়, গত অর্থবছরে চীন থেকে পণ্য আমদানি হয়েছে প্রায় ২ হাজার কোটি ডলারের। আর ৬৮ কোটি ডলারের পণ্য রফতানির তথ্য দিচ্ছে ইপিবি।
জানতে চাইলে বিসিসিসিআইয়ের সেক্রেটারি জেনারেল আল মামুন মৃধা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশের রফতানি সক্ষমতা বাড়ছে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার প্রত্যাশা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের রফতানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চীন থেকে আমদানিও বাড়তে থাকবে। কারণ যে পণ্য বাংলাদেশ রফতানি করছে বা নতুন করে তৈরির বিষয়ে ভাবছে সেগুলোর যন্ত্রাংশ, কেমিক্যাল থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল চীন থেকে আমদানি করতে হচ্ছে কিংবা হবে। ফলে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের বিকাশে চীনের কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশের প্রধান খাতগুলোকে তাদের প্রয়োজনেই চীন থেকে আমদানি করতে হয়। সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অর্থনীতি যত বড় হবে, চীনের সঙ্গে ব্যবসা তত বাড়তে থাকবে। আর দুই দেশের সম্পর্ক আগামী দিনগুলোয় ঘনিষ্ঠ থেকে ঘনিষ্ঠতর হবে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও রয়েছে চীনের অবদান। বেল্ট অ্যান্ট রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আওতায় এরই মধ্যে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে। সাড়ে ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের কাজ চলমান। ২০২৬ সালের মধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোয় বিনিয়োগ আসতে পারে আরো সাড়ে ৫ বিলিয়ন ডলারের মতো। অবশ্য ২০১৬ সালে দুই দেশের মধ্যে যে সমঝোতা স্মারক সই হয় সেটির আওতায় ২৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের কথা রয়েছে। কর্ণফুলী টানেল পার্শ্ববর্তী চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলে আগামী বছর থেকেই বড় ধরনের চীনা বিনিয়োগের আশা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। অঞ্চলটিতে মূলত ওইসব পণ্যই তৈরি হবে বাংলাদেশ যেগুলো উল্লেখযোগ্য পরিমাণে চীন থেকে আমদানি করে। পাশাপাশি নিজেদের বাজারে চাহিদা রয়েছে এমন রফতানিমুখী পণ্যও তৈরি হবে অর্থনৈতিক অঞ্চলটিতে।
চীনের সঙ্গে বিশাল যে বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে তা কমিয়ে আনার বিষয়ে কর্মতৎপরতা রয়েছে বলে জানান বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সংশ্লিষ্টরা। ২০২০ সালের জুলাই থেকে চীনও ট্যারিফ লাইনের আওতায় ৯৭ শতাংশ বাংলাদেশী পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা চালু করে। সম্প্রতি চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যকে অন্তর্ভুক্ত করে সেটি বাড়িয়ে ৯৮ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়েছে দেশটির সরকার। এ সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে দেশটির বাজারে বাংলাদেশী পণ্য রফতানি বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাতে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতিও কমে আসবে।
চীনে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সূত্রগুলো অবশ্য বলছে, প্রচলিত পণ্য দিয়ে চীনের বাজার দখলে নেয়ার প্রচেষ্টা খুব কঠিন হবে। দেশটিতে বাংলাদেশের কমার্শিয়াল উইংয়ের সূত্র অনুযায়ী, চীনের বাজার বিশাল হলেও প্রতিযোগিতামূলক। স্থানীয় উৎপাদন-সরবরাহকারীদের সঙ্গে ভালো মানের বিদেশী কোম্পানিই কেবল সে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে। তবে কনজিউমার বিহেভিয়ার বা ভোক্তাদের আচরণগত ধরন অনুসারে বলা যায়, উচ্চহারে মূল্য সংযোজিত পণ্যের চাহিদা দেশটিতে ক্রমেই বাড়তে থাকবে। বর্তমানে চীনের বাজারে রফতানি বৃদ্ধির জন্য মানসম্মত পণ্য ও অনলাইনে এসব পণ্যের ব্যাপক প্রচারণাও থাকতে হবে। তাছাড়া দেশটির প্রধান ২০ আমদানি পণ্যের একটিও রফতানি করে না বাংলাদেশ। তাই প্রচলিত পণ্য দিয়ে নয় বরং মূল্য সংযোজিত মানসম্মত পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে চীনে রফতানি বাড়াতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশকে ঘিরে আঞ্চলিক যোগাযোগ সৃষ্টিতে চীনের তৎপরতা রয়েছে। বিকল্প জ্বালানি রুটের পাশাপাশি একটি শিল্পাঞ্চল তৈরির উদ্যোগও রয়েছে তাদের। এর অংশ হিসেবে আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশের অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে চীন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে। চীন থেকে অনেক শিল্প প্রকল্পও বাংলাদেশে স্থানান্তর হতে পারে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাই কেবল চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে রাজনৈতিক লক্ষ্য বিবেচনায় বাংলাদেশ সরকারের বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে এখনো চীনকে বড় উৎস হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জাতিসংঘের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্কিত সংস্থা আঙ্কটাডের সদস্যপদ পেতে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশকে সমর্থনে ভূমিকা রেখেছিল চীন। তাছাড়া জাতিসংঘের সদস্যপদ পেতে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে চীনের যে ভেটো ছিল ১৯৭৪ সালে সেটা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়, যার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ জাতিসংঘে সদস্য হতে পেরেছিল। আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ চীনের স্বীকৃতি পায় ১৯৭৫ সালের ৪ অক্টোবর। তারপর থেকে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা দিনে দিনে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন খাতে তারা আমাদের সহযোগিতা করে আসছে, যার প্রথমেই আছে বাণিজ্য। আমাদের অনেক কিছু প্রয়োজন হয়, যা ভালো মূল্যে চীনের পক্ষেই দেয়া সম্ভব হয়। অনেক ঋণও দিয়েছে দেশটি, যার কিছু শোধ করতে হয়েছে আবার কিছু শোধ করতে হয়নি। এভাবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চীন বাংলাদেশকে সহযোগিতা করেছে। ক্রমেই বন্ধু হিসেবে চীনের অবস্থান অনেক দৃঢ় হয়েছে। যার প্রতিফলন সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে ব্যবসা-বাণিজ্যে। বাণিজ্যে ঘাটতি থাকলেও সেটা নিয়ে চিন্তার কোনো0কারণ আছে বলে আমি মনে করি না। বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নেও চীনের অনেক অবদান রয়েছে।’










