তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের বিকাশ ও উন্নয়নের মাধ্যমে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০১০ সালে গঠন করা হয় বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (বিএইচটিপিএ)। সেই থেকে সরকারের তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগের আওতাধীন এ সংস্থাটি দেশের বিভিন্ন স্থানে হাই-টেক পার্ক, সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক, আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার স্থাপনের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এ ধারাবাহিকতায় প্রাচীন জনপদ সিলেটে স্থাপন করা হয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাই-টেক পার্ক’। ২০২১ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রকল্পটির উদ্বোধন করা হলেও কোনো অবকাঠামোই তৈরি করেনি প্লট বরাদ্দ পাওয়া কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানগুলো। সেখানে উৎপাদন তো দূর অস্ত!
বিএইচটিপিএ সূত্রে জানা যায়, বিশ্বমানের বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে দেশী-বিদেশী তথ্যপ্রযুক্তি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে আকৃষ্ট করার লক্ষ্য নিয়ে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় ১৬২ দশমিক ৮৩ একর জায়গাজুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাই-টেক পার্ক। এর মধ্যে ১২টি প্রতিষ্ঠানকে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৭১ দশমিক ৯৮২ একর জায়গা। ছোট ছোট আইটি কোম্পানির জন্য হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ সফটওয়্যার ভবন তৈরি করে ফ্লোর ভাড়া দিয়েছে, যেখানে ছয়টি প্রতিষ্ঠান বরাদ্দ পেয়েছে ১৮ হাজার ৭৬০ বর্গফুট স্পেস। পার্কের বাকি জায়গায় গড়ে তোলা হয়েছে প্রশাসনিক ভবন, আবাসিক, রাস্তাঘাটসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো।
সিলেটের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাই-টেক পার্কে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ১২টি প্রতিষ্ঠানকে জায়গা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষের দেয়া তথ্যমতে, পার্কটিতে সবচেয়ে বেশি ৩২ একর জায়গা বরাদ্দ পেয়েছে র্যাংগস ইলেকট্রনিকস। এছাড়া আরএফএল ইলেকট্রনিকস পেয়েছে ২০ একর ও আরটিএম আল কবির টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি ৮ একর জায়গা। এর বাইরে ব্যাবিলন রিসোর্সেস, হেলথ ল্যান্ডমার্ক হোল্ডিং, টুগেদার আইটি, ইএলবি, অটোমেশন সার্ভিস লিমিটেড, ম্যাকডোনাল্ড স্টিল বিল্ডিং প্রডাক্টস, অগ্রণী ব্যাংকসহ আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও প্লট পেয়েছে।
জায়গা বরাদ্দ পাওয়া প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই অবকাঠামো নির্মাণের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করেনি। কোনো কোনোটি ভবন তৈরির কাজে হাত দিলেও উৎপাদনে যেতে অনেক সময় লাগবে বলে জানায়। আবার যারা স্পেস বরাদ্দ নিয়েছিলেন তাদের অর্ধেকেই হাই-টেক পার্ক থেকে নিজেদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পার্কের নির্মাণাধীন সফটওয়্যার ভবনে স্পেস বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে। এর মধ্যে তিনটি আইটি কোম্পানির পাশাপাশি অগ্রণী ব্যাংক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগও স্পেস নিয়েছে। এছাড়া ক্যান্টিনের জন্যও স্পেস বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে দুই হাজার বর্গফুট জায়গা বরাদ্দ পেয়েছে ইন-টাচ আইটি। তবে প্রতিষ্ঠানটি উৎপাদনে যাওয়ার আগেই হাই-টেক পার্ক থেকে তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছে। এ বিষয়ে ইন-টাচ আইটির স্বত্বাধিকারী চৌধুরী মহসিন সিদ্দিক বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা আইসিটি ডিভিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করে আমাদের অসুবিধাগুলো জানিয়েছিলাম। পরে অবশ্য এটা বাদ দিয়েছি। কারণ আমাদের যেসব চাহিদা ছিল সে অনুযায়ী তারা সুবিধা দিতে পারেনি। চাহিদার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ আমাদের কাছে যে ভাড়া চেয়েছিল, ওটাতে আমাদের পোষাচ্ছিল না। এজন্য বাদ দিয়েছি।
পার্কটিতে এক হাজার বর্গফুট জায়গা বরাদ্দ পেয়েছিল সিমেড হেলথ লিমিটেড। যোগাযোগ করা হলে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. খন্দকার এ মামুন বণিক বার্তাকে বলেন, আমি ওইখানকার (বঙ্গবন্ধু হাই-টেক পার্ক) জায়গাটা ছেড়ে দিয়েছি। কারণ কভিড-পরবর্তী ঝামেলা, তার মধ্যে এখনো অবকাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন হয়নি, অনেক কিছুই নেই—এজন্য আমি জায়গা ছেড়ে দিয়েছি। একই কথা জানান সিলেট হাই-টেক পার্কে দেড় হাজার বর্গফুট জায়গা বরাদ্দ পাওয়া নুডস সলিউশনের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এম রাহবার জুমার আবেশ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ওখানে জায়গা বরাদ্দ নিয়েছিলাম। তবে পরবর্তী সময়ে আমি আর এগোইনি। আবেশ অবশ্য নিজের সমস্যার কথাই জানিয়ে বলেছেন, গত বছর আমি জায়গা বরাদ্দ নিয়েছিলাম। তবে কভিডের কারণে পরবর্তী সময়ে প্ল্যান চেঞ্জ করতে হয়। কারণ আমার সবকিছুই ঢাকাকেন্দ্রিক। সিলেটে আমার অফিসের কিছু কর্মী ছিল, যারা কাজগুলো করত; কভিডের কারণে ওরা যে যার মতো করে রয়েছে। আমার নিজেরও পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে হয়েছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাই-টেক পার্কের প্রকল্প পরিচালক ব্যারিস্টার মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা আমাদের কাজ শেষ করেছি। তবে প্রকল্পের উদ্বোধন হলেও বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো উৎপাদন শুরু করতে পারেনি। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে তাদের অবকাঠামো নির্মাণসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ড শুরু করেছে। তাছাড়া কোনো কিছু তো আর সঙ্গে সঙ্গেই শুরু করা যায় না। তার পরও আশা করা যায়, বছর দুয়েকের মধ্যে সব প্রতিষ্ঠানই উৎপাদনে যাবে। তিনি আরো বলেন, পার্কে সবচেয়ে বেশি জায়গা বরাদ্দ নিয়েছে র্যাংগস। সম্প্রতি তারা জানিয়েছে অবকাঠামোর জন্য প্রিফ্যাব্রিকেটেড পণ্য বিদেশ থেকে আমদানির লক্ষ্যে এলসি খুলছে। আগামী মার্চের মধ্যেই এগুলোর কাজ সম্পন্ন করতে পারবে। পরবর্তী সময়ে উৎপাদনে যাবে।
সিলেট হাই-টেক পার্কে এক একর জায়গার ওপর অবকাঠামো তৈরি শুরু করেছে আইটি প্রতিষ্ঠান টুগেদার আইটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল। কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমতিয়াজুল হক ভুঁইয়া বণিক বার্তাকে বলেন, হাই-টেক পার্কে জায়গা পেলেও এখনো উৎপাদনে যেতে পারিনি। তবে আমাদের অবকাঠামো তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শেড লাগানোর কাজ চলছে। অবকাঠামো নির্মাণ শেষে শিগগিরই আমারা উৎপাদনে যেতে পারব বলে আশা করছি।
স্থায়ী ক্যাম্পাস করার জন্য হাই-টেক পার্কে আট একর জায়গা বরাদ্দ পেয়েছে আরটিএম আল কবির টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি। প্রতিষ্ঠানটির বোর্ড অব ট্রাস্টির চেয়ারপারসন আহমেদ আল কবির বণিক বার্তাকে বলেন, হাই-টেক পার্কে আমাদের কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি। যেহেতু সেখানে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস হবে, তাই এটা কিছুটা সময়সাপেক্ষ। এদিকে সিলেট হাই-টেক পার্কে আরএফএল ইলেকট্রনিকসের কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে যোগাযোগ করা হলেও এ বিষয়ে কোনো তথ্য দিতেই কোম্পানিটির ঊর্ধ্বতনরা রাজি হননি।
সিলেটের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাই-টেক পার্কের সার্বিক কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএইচটিপিএর ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকর্ণ কুমার ঘোষ বণিক বার্তাকে বলেন, আমাদের আশা থাকে সবকিছু সময়মতো হবে। কিন্তু বাস্তবে কিছুটা সময় লেগে যায়। বিগত দুই বছর বা তিন বছরের কাছাকাছি সময় কভিডের কারণে সবকিছু থেমে গিয়েছিল। সত্যিকার অর্থে আমাদের যে প্ল্যান ছিল, কভিড তা তিন বছর পিছিয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, বড় বড় কোম্পানি, যেমন—সনি র্যাংগস, আরএফএলকে আমরা জায়গা দিয়েছি। এছাড়া দুটি ব্রিটিশ কোম্পানি সেখানে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে এবং জায়গাও চেয়েছে। এর মধ্যে জায়গা নেয়া কোম্পানিগুলো অবকাঠামোর কাজ শুরু করেছে। তাই আশা করছি, এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে পার্কটিতে উৎপাদন শুরু হয়ে যাবে। আর আড়াই থেকে তিন বছরের মধ্যে সেটা আরো বড় হবে এবং আগামী পাঁচ বছরের মাথায় ফুল সুইংয়ে কাজ করবে।
সিলেটের হাই-টেক পার্কের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে বিএইচটিপিএর ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, আমাদের সিলেট হাই-টেক পার্কের প্ল্যান অনেক ভালো। এটি দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আইটি ইন্ডাস্ট্রি গ্রোথ, কর্মসংস্থান, ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট, এক্সপোর্ট গ্রোথ, আমদানি কমিয়ে দেয়া—এগুলোতে বড় অবদান রাখবে। তাই এটিকে আরো বড় করার প্ল্যান রয়েছে আমাদের।










