ডলার ও এলসি সংকটের কারণে বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছে শিপইয়ার্ড শিল্প। স্ক্র্যাপ জাহাজ কিনতে না পারায় প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলে গড়ে ওঠা দেড় শতাধিক শিপইয়ার্ড। তাই বালি ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছেন ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ। স্থানীয় রাজনীতিক ও প্রভাবশালীদের সঙ্গে সিন্ডিকেট গড়ে সমুদ্রতীরবর্তী বিভিন্ন এলাকা থেকে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন করছেন। পরিবেশ অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়। এভাবে বালি তোলায় স্থানীয় জীববৈচিত্র্য ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়েছে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবেশবিদরা।

স্থানীয়রা জানান, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের নয়টি মৌজাকে শিপইয়ার্ডের জন্য বরাদ্দ দেয় সরকার। এতে প্রায় ১৬০টি শিপইয়ার্ড গড়ে উঠেছে। সব ইয়ার্ডে কাজ না থাকায় গড়ে ৫০টি সারা বছর খোলা থাকে। স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার কারণে বিষাক্ত কেমিক্যাল সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়ায় এলাকাটি দূষণপ্রবণ এলাকা বলেও পরিচিত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ইয়ার্ডগুলোর মালিক-কর্মকর্তারা স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার পাশাপাশি বিভিন্নভাবে বালি উত্তোলনের সঙ্গেও জড়িয়েছেন। এর সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালীরাও জড়িত। শিপইয়ার্ড ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে  জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিক ও প্রভাবশালীরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বালি ব্যবসা করছেন। অনেক জায়গায় ছোট বা বড় পরিসরে বালি উত্তোলন এখন নিয়মিত ঘটনা এ এলাকার জন্য। তবে এ বিষয়ে কেউ মুখ খুলতে রাজি হন না।

পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বাঁশবাড়িয়া, বাড়বকুণ্ড ও আকিলপুর এলাকার বিভিন্ন সমুদ্রসৈকত থেকে বালি উত্তোলন করছেন কয়েকজন শিপইয়ার্ড ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক দলের স্থানীয় কিছু নেতা। এর মধ্যে বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের আকিলপুর সমুদ্রসৈকত এলাকার মাদার স্টিল লিমিটেড নামে শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডটির পাশের সন্দ্বীপ চ্যানেলের বিভিন্ন স্থান থেকে ড্রেজারের মাধ্যমে বালি তোলা হচ্ছে। সেই বালি আবার বাল্কহেডের মাধ্যমে এনে আবারো ড্রেজার বসিয়ে প্রায় দুই কিলোমিটার পাইপলাইনে করে নিয়ে জমা করা হচ্ছে। সেখান থেকেই বালি বিক্রি হয় ট্রাকে করে। এর প্রমাণও পেয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তরের তদন্তকারী দল। আকিলপুর সমুদ্রসৈকত থেকে প্রায় তিন লাখ ঘনফুট বালি উত্তোলন করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্থানীয়দের তথ্যমতে, মাদার স্টিল লিমিটেডের কর্মকর্তারা এ বালি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এমনকি স্থানীয় ইউনিয়ন চেয়ারম্যানও এর সঙ্গে জড়িত বলে প্রাথমিক তদন্তে জানতে পেরেছে সংস্থাটি। শুনানি শেষে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এ বিষয়ে কথা বলতে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান মাদার স্টিল লিমিটেডের কর্মকর্তা ও মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সম্ভব হয়নি।

বাড়বকুণ্ড ইউনিয়ন সংলগ্ন এলাকার সন্দ্বীপ চ্যানেলের বিভিন্ন স্থান থেকেও বালি উত্তোলন করে পাইপলাইনের মাধ্যমে নেয়া হচ্ছে ছয় কিলোমিটার দূরের মান্দারিতলার নডালিয়ায়। সেখানে ইউরো পেট্রো প্রডাক্টস লিমিটেডের কারখানার নিচু জমি ভরাট করা হচ্ছে এ বালি দিয়ে। এরই মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার ঘনফুট বালি সেখানে ফেলা হয়েছে বলে প্রমাণ পেয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে নিচু জমি ভরাটের এ কাজে স্থানীয় ইউনিয়ন চেয়ারম্যান জড়িত বলে প্রাথমিকভাবে জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, বালি উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতরা প্রভাবশালী হওয়ায় স্থানীয়রা কেউ এ বিষয়ে কথা বলতে চান না। এমনকি প্রাথমিকভাবে তথ্য উপস্থাপন করলে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়ার সময় সাক্ষীর অভাবে অভিযুক্তদের শাস্তির আওতায় আনা সম্ভব হয় না। হয়তো যাদের নামে ভূমি বরাদ্দ থাকে তাদের জরিমানা করে ছেড়ে দেয়া হয়। কয়েকদিন কাজ বন্ধ রাখলেও পরে আবার একইভাবে বালি তোলা হয়। অপরিকল্পিত ও অবৈধভাবে সমুদ্রসৈকতের বালি উত্তোলনের ফলে সৈকতসহ সমুদ্রের বেড়িবাঁধ ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সমুদ্রসৈকতের বালি উত্তোলন করলে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাও হবে। বড় ধরনের ভাঙনের কবলে পড়তে পারে সমুদ্রের তীর। তাছাড়া বিষয়টি সীতাকুণ্ড এলাকার ভূ-প্রকৃতি, পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থার মারাত্মক ক্ষতি হবে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা। এছাড়া অনুমতি ছাড়া বালি উত্তোলন বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (জেলা) আশরাফ উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সীতাকুণ্ড এলাকার আকিলপুর, বাঁশবাড়িয়া ও বাড়বকুণ্ড এলাকায় গিয়ে সমুদ্র থেকে বালি উত্তোলনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। সমুদ্রের তীর থেকে বালি তুলে সেগুলো পরে বিক্রির জন্য পাইপলাইনের মাধ্যমে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। তবে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তাদের কাউকে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে সরেজমিন তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছে। এখন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শুনানি করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানাবে।

পরিবেশবিদ মো. ইদ্রিস আলী বণিক বার্তাকে বলেন, সমুদ্র থেকে বালি উত্তোলন করে বিক্রি পরিবেশের ভারসাম্যের জন্য ক্ষতিকারক। এতে পরবর্তী সময়ে সমুদ্রসৈকতে বড় ধরনের ভাঙন দেখা দিতে পারে। তীরবর্তী এলাকায় কোনো বেড়িবাঁধ থাকলে তাও বড় ধরনের হুমকির মধ্যে পড়বে। তাই যারা এ বালি উত্তোলন করে ব্যবসার সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরকে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। জড়িতদের যদি দ্রুত শাস্তির আওতায় আনা না যায় তাহলে সমুদ্রের তীরবর্তী এলাকার মানুষের বড় ধরনের ক্ষতি হবে।