সারা দেশেই তাপপ্রবাহ বইছে। দিন ও রাতে নেই এতটুকু স্বস্তি। এ দুর্যোগ ঠিক কবে শেষ হচ্ছে তার সঠিক পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে না। দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোয় এ মুহূর্তে প্রায় দুই লাখের বেশি রোগী ভর্তি রয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি এসব রোগীর অস্বস্তি বাড়িয়ে তুলেছে চলমান তাপপ্রবাহ। বেশির ভাগ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ওয়ার্ডগুলোয় আলো-বাতাসের অপর্যাপ্ত প্রবাহ ও অতিরিক্ত রোগীর চাপ অস্বস্তির মূল কারণ। বিশেষ করে যেসব রোগী হাসপাতালে শয্যা না পেয়ে মেঝে বা বারান্দায় বিছানা পেতে চিকিৎসা নিচ্ছে তাদের কষ্ট অনেক বেশি। 

গত শনিবার দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড হয়েছিল যশোরে ৪২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে মৃদু তাপপ্রবাহ, ৩৮ থেকে ৩৯ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে মাঝারি তাপপ্রবাহ, ৪০ থেকে ৪১ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তীব্র তাপপ্রবাহ ও ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি হলে সেটি অতি তীব্র তাপপ্রবাহ। চলতি মাসের বাকি সময় তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকতে পারে।

অতিরিক্ত তাপমাত্রা স্বাভাবিকভাবেই অসুস্থতা বাড়ায়। তাই হাসপাতালগুলোকে যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত রাখার কথা বলেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। গতকাল রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাঁচটি বিশেষায়িত (টারশিয়ার) এবং দুটি জেলা হাসপাতালে সরজমিনে দেখা যায়, বিভিন্ন রোগের কারণে ভর্তি হওয়া রোগীরা চরম অস্বস্তিতে রয়েছে। কোনো কোনো হাসপাতালে বিদ্যুৎবিভ্রাট হতেও দেখা গেছে। রোগীর বিছানার পাশে বসে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছেন কোনো না কোনো স্বজন। হাসপাতালগুলোর অনেক ওয়ার্ডে আলো-বাতাসের অপর্যাপ্ততা রয়েছে। শয্যা সংকুলন না হওয়ায় মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা নেয়ার চিত্র নিত্যদিনের। 

রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য সাভার থেকে এসেছেন ৩৫ বছর বয়সী বিনা (ছদ্মনাম)। পেটের পীড়া, পায়ুপথে রক্ত যাওয়াসহ বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে তিনি এ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে ভর্তি হয়েছেন ১৪ এপ্রিল। চলমান তাপপ্রবাহ তার শারীরিক অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলেছে বলে জানান তিনি। পিত্তথলির পাথর অপসারণের চিকিৎসার জন্য এ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটিতে ভর্তি হয়েছেন ২৫ বছরের তরুণ রফিকুল আলম (ছদ্মনাম)। তিনি বলেন, ‘গরমে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছি। অসুস্থতার কারণে যেমন শারীরিক অস্থিরতা রয়েছে। গরম এ জটিলতা আরো বাড়াচ্ছে। রাতে ঘুমাতেও কষ্ট হয়। সিলিং ফ্যানের বাতাসও যেন গরম হয়ে আছে।’ 

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ১১ নং ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছেন রাজধানীর মালিবাগের বাসিন্দা পঞ্চাশোর্ধ্ব সেলিম মোল্লা (ছদ্মনাম)। ওয়ার্ডে শয্যা পাননি তিনি। এমনকি ওয়ার্ডের মেঝেতেও নয়। বারান্দার মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন তিনি। তার স্ত্রী পাশে বসে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছেন। তবু গরমের উত্তাপ অসহনীয়।

তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে হাসপাতালগুলো রোগীবান্ধব কিনা তা নিয়ে বিভিন্ন দেশে আলোচনা চলছে। দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাসের (ডিআরআর) বৈশ্বিক তথ্যভিত্তিক প্লাটফর্ম প্রিভেনশন ওয়েব বলছে, গরমের কারণে ভর্তি রোগীরা কী কী ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে তা বিবেচনায় না রেখেই হাসপাতাগুলোর ডিজাইন করা হয়েছে। স্বাস্থ্য পরিষেবা বজায় রাখতে পারে এমন অভিযোজন সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে তৈরি করা হয়নি হাসপাতাল। বিদ্যুৎবিভ্রাট, শয্যা পাওয়ার ক্ষেত্রে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করার ফলে রোগীরা আরো অসুস্থ হয়ে পড়ে। হাসপাতালগুলো নির্মাণ ও প্রস্তুত করার সময় এমন ডিজাইন বিবেচনায় না রাখার পর নতুন ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। ভবন ও অবকাঠামো পরিবর্তনশীল স্বাস্থ্যসেবা চাহিদার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে উপযোগী নয়। 

দেশের উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতাল রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটিতে সাধারণত সক্ষমতার তিন গুণ রোগী ভর্তি থাকে। এ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. এফএম শামীম আহাম্মদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোয়, বিশেষ করে টারশিয়ারি পর্যায়ের হাসপাতালগুলোয় শয্যার তুলনায় বেশি রোগী ভর্তি হয়। আমাদের হাসপাতাল ১২শ শয্যার হলেও সাধারণত তিন হাজারের বেশি রোগী ভর্তি থাকে। এতে রোগীরা ওয়ার্ডে মেঝে ও বারান্দায় বিছানা করে চিকিৎসা নেয়। আমরা হাসপাতালের সব ওয়ার্ড শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত করতে পারিনি। এর জন্য অনেক সম্পদ ও বরাদ্দ প্রয়োজন। তবে যেসব জায়গায় অতিপ্রয়োজন সেসব জায়গায় এসির ব্যবস্থা করা রয়েছে। কার্ডিওলজি, শিশু ওয়ার্ড, অস্ত্রোপচার কক্ষ, অস্ত্রোপচার-পরবর্তী সেবা কক্ষ থেকে শুরু করে বিশেষ বিশেষ ওয়ার্ডে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র রয়েছে। বাকি সব স্থানেই রয়েছে বৈদ্যুতিক পাখা। যেসব বারান্দায় রোগীরা মেঝেতে বিছানা পাতে সেসব স্থানে পাখা দেয়া হয়েছে। রোগীর যেন কষ্ট না হয় সেজন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করি।’

হাসপাতালগুলোয় গরমের সময় চিকিৎসা নিতে আসা রোগীকে বেশ কষ্টে পড়তে হয় বলে মন্তব্য করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘হাসপাতালগুলোয় রোগীদের জন্য সাধারণত বৈদ্যুতিক পাখারও সংকট রয়েছে। অনেক ওয়ার্ডে পাখা নষ্ট হয়ে পড়ে থাকে মাসের পর মাস। হাসপাতাল পরিচালকদের সেই ক্ষমতা নেই যে তারা অর্থ ব্যয় করে সুবিধা নিশ্চিত করবে। তাদের নির্ভর করতে হয় গণপূর্ত বিভাগ ও স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ওপর। এ বিষয় নিয়ে মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগী হতে হবে।’