আগামী সপ্তাহেই ভারত সফর করবেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে ১০ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় পঞ্চম টু প্লাস টু মিনিস্টারিয়াল ডায়ালগে অংশ নেবেন তারা। উভয় পক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, এ সংলাপে আলোচনার বিষয়বস্তু হবে ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক টানাপড়েন ও উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারত্ব। বিশেষ গুরুত্ব পাবে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল বাস্তবায়নে দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো। পাশাপাশি বাংলাদেশ প্রসঙ্গও দুই পক্ষের আলোচনায় উঠে আসতে পারে বলে মনে করছে ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো। 

অ্যান্টনি ব্লিংকেন ও লয়েড অস্টিনের বৈঠকের প্রস্তুতি যাচাইয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অব স্টেট ডোনাল্ড লুরও শিগগিরই ভারত সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে। এ বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি মিডিয়া নোটও প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ৪ থেকে ১১ নভেম্বর কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান ও ভারত সফর করবেন ডোনাল্ড লু। 

নোটে আরো বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ভারত টু প্লাস টু মিনিস্টারিয়াল ডায়ালগ সামনে রেখে ডোনাল্ড লুসহ মার্কিন প্রতিনিধিরা সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। সাক্ষাতে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ইস্যুতে কৌশলগত সমন্বয়, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও নিরাপত্তা সহযোগিতার মতো বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলবেন তারা। সংলাপ চলাকালে অ্যান্টনি ব্লিংকেন ও লয়েড অস্টিনকে সহযোগিতা করার জন্য সেখানে ডোনাল্ড লু উপস্থিত থাকবেন। প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা, আঞ্চলিক উন্নয়ন, প্রযুক্তি ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি এবং মহাকাশ সহযোগিতার মতো বিষয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ভারতের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পর্যায়ের এ সংলাপের আলোচনা হবে। 

বাংলাদেশে নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের তাৎপর্য রয়েছে বলে মনে করছে ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো। তাদের ভাষ্যমতে, সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের টানাপড়েন দেখা যাচ্ছে। আবার একই ইস্যুতে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে চীন। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্র-ভারতের মন্ত্রী পর্যায়ে বৈঠকটিতে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আলোচনার প্রেক্ষাপট এক প্রকার প্রস্তুত হয়ে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সংলাপের আনুষ্ঠানিক সূচিতেও আঞ্চলিক ও ভূরাজনৈতিক বিষয়ে আলোচনার কথা বলা রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবীর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যেহেতু আঞ্চলিক বিষয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সংলাপে আলোচনা হবে, স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশ প্রসঙ্গ আসতে পারে। তবে তাদের নিজস্ব বিষয়গুলো প্রাধান্য পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।’

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত মন্ত্রী পর্যায়ের সংলাপে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ উঠবে কিনা এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকার মার্কিন দূতাবাস কোনো তথ্য দিতে পারেনি। 

গত সেপ্টেম্বরে ভারতে জি২০ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বাইডেন ও অন্যান্য রাষ্ট্রপ্রধান ছাড়াও বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সম্মেলন চলাকালে বাইডেন ও শেখ হাসিনার মধ্যেও অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়। ওই সফরের আগেও বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে টানাপড়েন প্রশমনে ভারত মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিতে পারে বলে গুঞ্জন উঠেছিল। 

সেপ্টেম্বরে জি২০ সম্মেলনের আগে আগস্টে আন্তর্জাতিক ও ভারতীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে ভারতের পাঠানো বার্তা বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ পেয়েছিল। এ বিষয়ে ডয়েচে ভেলের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকার দুর্বল হয়ে পড়লে ভূরাজনৈতিক দিক থেকে তা ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র কারো পক্ষেই সুখকর হবে না বলে নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে ওয়াশিংটনকে জানানো হয়েছে। 

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, আসন্ন নির্বাচনসহ সামগ্রিক বিষয় বিবেচনায় নিলে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত মন্ত্রী পর্যায়ের সংলাপ বাংলাদেশের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ হতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহল এখন বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে বেশ উচ্চকণ্ঠ হয়ে উঠেছে। বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রায় সবাই নিয়মিত বিরতিতে এ বিষয়ে কথা বলছে। যুক্তরাষ্ট্র-ভারতের আলোচনায়ও বাংলাদেশ প্রসঙ্গ, বিশেষ করে নির্বাচন নিয়ে আলোচনা উঠতেই পারে। 

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হারুন-অর-রশিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সংলাপে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ আসাটা অস্বাভাবিক কিছু না। আঞ্চলিক বিষয়ে যেহেতু আলোচনা হবে, কাজেই বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের নির্বাচন এখানে সম্পর্কিত। মার্কিন প্রতিনিধিরা ভারতে আসবে এবং আলোচনা হবে। এর অর্থ হলো ভারতের সঙ্গে দেশটির আলোচনার প্রয়োজনীয়তা বা আবশ্যকতা রয়েছে। এক্ষেত্রে ভূরাজনীতি বলি, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যু বলি, প্রশান্ত-মহাসাগরকেন্দ্রিক জোটবদ্ধতা বলি, এমনকি দক্ষিণ এশিয়া বা বাংলাদেশ, যে ইস্যুই বলি দুই দেশের আলোচনার প্রয়োজন আছে। বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে কৌশলগত প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ কোনো না কোনোভাবে আলোচনায় চলে আসতে পারে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্যে ভারতের নিরাপত্তাসংক্রান্ত ইস্যুও জড়িত রয়েছে। বাংলাদেশে একটি স্থিতিশীল, সেকুলার ও গণতান্ত্রিক সরকার থাকলে উত্তর ভারতের সেভেন সিস্টার্স অঞ্চলগুলো নিয়ে ভারতের দুশ্চিন্তা কম। অর্থাৎ নিজ স্বার্থেই এটি ভারতের অগ্রাধিকারের বিষয়।’