শেখ হাসিনা দেশত্যাগের পর এর প্রভাব পড়েছে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। সাবেক এ প্রধানমন্ত্রী সোমবার পদত্যাগ করার পর চলমান পরিস্থিতিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি), জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) উপাচার্যসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিরাও একে একে পদত্যাগ করেছেন।
এরই মধ্যে শিক্ষার্থীদের আলটিমেটামের পর পদত্যাগ করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) উপাচার্য অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তারসহ প্রশাসনের ২৯ কর্মকর্তা। গতকাল বিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক তারিকুল হাসান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসনের সবার পদত্যাগ দাবি করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। গতকাল দুপুরে রাবি সমন্বয়ক কমিটির পক্ষ থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি জানানো হয়।
বিবৃতিতে সমন্বয়ক পরিষদ বলেছে, ‘উপাচার্য, দুই উপউপাচার্য, সম্পূর্ণ প্রক্টরিয়াল বডি, ছাত্র উপদেষ্টা ও জনসংযোগ কর্মকর্তা, লিগ্যাল সেল, যৌন নিপীড়ন সেল, ১৭ হলের প্রভোস্ট, ডরমিটরি প্রশাসক, অবৈধ সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্যদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে পদত্যাগ করার আলটিমেটাম দিচ্ছি। অন্যথায় শিক্ষার্থীরা তাদের টেনেহিঁচড়ে বের করতে বাধ্য হবে। কোনো অবস্থাতেই পারিবারিক কিংবা ব্যক্তিগত কারণ দেখানো চলবে না।’
এরপরই পদত্যাগ করেন উপাচার্য অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার, জনসংযোগ প্রশাসক অধ্যাপক প্রণব কুমার পান্ডে, ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম সাউদ। এছাড়া পদত্যাগ করেছেন প্রক্টর অধ্যাপক আসাবুল হক, সহকারী প্রক্টর মীর আব্দুল কাইয়ুম, ডরমিটরি ওয়ার্ডেন আতাউর রহমান রাজু, বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক শেখ শামসুল আরেফিন, বিশ্ববিদ্যালয় ছাপাখানার প্রশাসক মোহাম্মাদ শাখাওয়াত হোসেন, লিগ্যাল সেলের প্রশাসক সাদিকুল ইসলাম সাগর, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. আলমগীর হোসাইন সরকার, ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসিওরেন্স সেলের (আইকিউএসসি) পরিচালক দুলাল চন্দ্র রায়, অতিরিক্ত পরিচালক অধ্যাপক মশিহুর রহমান ও আব্দুর রশিদ সরকার, ইংলিশ অ্যান্ড আদার ল্যাংগুয়েজের পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) প্রশাসক অধ্যাপক জাফর সাদিক, কেন্দ্রীয় ক্যাফেটেরিয়ার প্রশাসক অধ্যাপক মাহফুজুর রহমান, টিএসসিসির পরিচালক ড. মিজানুর রহমান খান, সেন্ট্রাল সায়েন্স ল্যাবরেটরির পরিচালক সায়েদ মুস্তাফিজুর রহমান এবং কলেজ পরিদর্শক অধ্যাপক শহীদুল আলম।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক তারিকুল হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ২৮ জনের পদত্যাগপত্র হাতে পেয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।’
এর আগে উপাচার্য অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার, ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম সাউদ ও প্রক্টর অধ্যাপক আসাবুল হকসহ প্রক্টরিয়াল বডির সবাই রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্যের সচিবের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান। মঙ্গলবার পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন ছাত্র উপদেষ্টা। এছাড়া পদত্যাগ করেছেন রাবির গণসংযোগ দপ্তরের প্রশাসক প্রণব কুমার পাণ্ডে। পৃথকভাবে তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন সদ্য সাবেক উপাচার্য, ছাত্র উপদেষ্টা ও প্রক্টর।
এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধে বিশ্বাসী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ থেকে পদত্যাগ করেছেন আইন ও ভূমি প্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. রায়সুল ইসলাম। গত বুধবার সংগঠনটির কনভেনার বরাবর পাঠানো এক চিঠির মাধ্যমে পদ বাতিলের জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।
রাবির সদ্য সাবেক উপাচার্য গোলাম সাব্বির সাত্তার বণিক বার্তাকে বেলেন, ‘বৃহস্পতিবার বেলা তিনটা ১০ মিনিটে রাষ্ট্রপতির সচিবের কাছে মেইলের মাধ্যমে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছি। তারা পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। রাবির শিক্ষার্থীরা দাবি করছিলেন পদত্যাগের জন্য। সেজন্য পদত্যাগ করেছি।’
ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম সাউদ রেজিস্ট্রার বরাবর পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন বলে গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন।
অন্যদিকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ আবদুস সালাম, উপউপাচার্য অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান ও কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. আলমগীর হোসেন ভূঁইয়া পদত্যাগ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য, প্রকাশনা ও জনসংযোগ দপ্তরের পরিচালক ড. আমানুর আমান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে ই-মেইলে পদত্যাগপত্র জমা দেন তারা।
এর আগে ২০২০ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩তম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. শেখ আবদুস সালাম। ২০২১ সালের জুনে বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ উপউপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি (আইসিটি) বিভাগের ড. মাহবুবুর রহমান। অন্যদিকে ২০২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কোষাধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ পান অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আলমগীর হোসেন ভুঁইয়া।
আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর শেষ হবে উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ আবদুস সালাম মেয়াদ। প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর ও ট্রেজারারের মেয়াদ শেষ হতো ২০২৫ সালে।
গত বুধবার পদত্যাগ করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. নূরুল আলম। রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে ই-মেইলে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি।
২০১৮ সালে অধ্যাপক নূরুল আলম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) নিযুক্ত হন। ২০২২ সালের ১ মার্চ তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের মেয়াদ পূর্ণ হলে ২ মার্চ থেকে তিনি উপাচার্যের রুটিন দায়িত্ব পালন করছিলেন। একই বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর এক আদেশে তাকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে সাময়িকভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সেদিন বিকেলে তিনি উপাচার্যের দায়িত্ব নেন।










