জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে ও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে জমি ও পানির প্রাপ্যতা দিন দিন কমে যাচ্ছে। হেক্টরপ্রতি উৎপাদনশীলতা কমায় কৃষকের মুনাফা কমে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ইন-পন্ড রেসওয়ে সিস্টেম বা আইপিআরএস প্রযুক্তিকে বলা হচ্ছে বিশ্বের সর্বাধুনিক ক্লাইমেট স্মার্ট প্রযুক্তি। এতে পুকুরে হেক্টরপ্রতি মাছের উৎপাদনশীলতা বাড়বে আট গুণ। এ প্রযুক্তি চালু হয়েছে দেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। এটিকে বলা হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ ক্লাইমেট স্মার্ট প্রযুক্তি।
আইপিআরএস মাছ চাষের এক সর্বাধুনিক প্রযুক্তি যেখানে সার্বক্ষণিক পানিপ্রবাহ এবং নিয়মিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পানির গুণাগুণ সর্বোত্তম রাখা হয়। ফলে অনেক বেশি ঘনত্বে মাছ চাষ করা যায়। পুকুরের মধ্যে রেসওয়ে বা সেল নির্মাণ করা হয়, যে সেলগুলোতে মাছ থাকে। পানির গুণাগুণ বিশেষ করে সার্বক্ষণিক পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা থাকে। সিস্টেমে সংযুক্ত স্মার্ট বা ডিমান্ড ফিডারের মাধ্যমে মাছের খাবার দেয়া হয়। বর্জ্য নিষ্কাশনের জন্য আলাদা ইউনিট রয়েছে, যার মাধ্যমে নিয়মিতভাবে সংগৃহীত বর্জ্য অপসারণ করা হয়।
আইপিআরএসের উদ্ভব ২০০৫ সালে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালাবামায় অবস্থিত অ’বার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। ড. জেসি চ্যাপেল উদ্ভাবিত এ প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে ওয়েস্ট অ্যালাবামার একটি ক্যাটফিশ ফার্মে ২০০৭ সালে সর্বপ্রথম স্থাপন হয়। পরে ২০১৩-১৪ সালে চীনে এর প্রভূত উন্নয়ন ঘটে। অতি নিবিড় মাছ চাষ পদ্ধতির ইনোভেটিভ এ প্রযুক্তি ২০১৬ সালে ভিয়েতনামে, ২০১৭ সালে মেক্সিকোয়, ২০১৮ সালে ভারত, মিসর এবং ২০১৯ সালে পাকিস্তানে সম্প্রসারণ হয়। নিকট ভবিষ্যতে থাইল্যান্ড ও কিউবায় এ প্রযুক্তি সম্প্রসারণ হতে যাচ্ছে।
সাধারণ পুকুরে যেখানে হেক্টরপ্রতি ১০-১৫ টন মাছ পাওয়া যায়, সেখানে এ পদ্ধতিতে প্রতি হেক্টরে ৮০-১১০ টন মাছ পাওয়া সম্ভব। একই সময়ে একই পুকুর থেকে আলাদা আলাদাভাবে বিভিন্ন আকারের বিভিন্ন প্রজাতির মাছ উৎপাদন করা যায়। ফলে বাজারজাতে উদ্যোক্তা অনেকটাই স্বস্তিতে থাকেন।
বাংলাদেশে এ প্রযুক্তির প্রথম প্রচলন করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নবাব মৎস্য খামার। ৪০ হেক্টরজুড়ে ৪২টি পুকুর নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি যাত্রা করে। ২০১৮ সালে জাতীয় মৎস্য পদক (রৌপ্য) লাভ করে তারা। চীনা প্রযুক্তি এবং মৎস্য অধিদপ্তরের কারিগরি সহায়তায় এরই মধ্যে এখানে আট হেক্টর পুকুরে ১৩ সেলবিশিষ্ট একটি আইপিআরএস চালু হয়েছে। কভিড-১৯-এর কারণে চীন থেকে যন্ত্রপাতি আসতে দেরি হওয়ায় প্রকল্পের কাজ তিন মাস পিছিয়ে যায়। প্রতিটি সেলের দৈর্ঘ্য ২২ মিটার, প্রস্থ ৫ মিটার ও গভীরতা ২ দশমিক ৫ মিটার। পুকুরের আয়তন আট হেক্টর। মোট পুকুরের ২ দশমিক ৫ শতাংশজুড়ে এই সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে।
প্রথম ট্রায়ালে রুই, কাতলা, কমন কার্প, পাঙ্গাশ, তেলাপিয়া, গ্রাস কার্প এবং কিছু পাবদা মাছ মজুদ করা হয়েছে। ট্রায়ালের ফলাফলে বেশ কয়েকটি প্রজাতির মাছের উৎপাদন অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। প্রকল্পের শুরু থেকেই জেলা মৎস্য দপ্তর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কারিগরি পরামর্শ সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে পোনা মজুদ, মজুদকৃত মাছের খাদ্য ও স্বাস্থ্য পরিচর্যা ইত্যাদি কার্যক্রম মৎস্য অধিদপ্তর তত্ত্বাবধান করছে। কারিগরি জনবল নিয়োগ, প্রকল্পের অর্থায়নেও প্রয়োজনীয় সহায়তা করছে। মৎস্য অধিদপ্তর ভবিষ্যতেও এ ধরনের যেকোনো উদ্যোগে সব ধরনের সহায়তা করবে।
এ বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. আমিমুল এহ্সান বণিক বার্তাকে বলেন, এটি দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ আইপিআরএস। প্রকল্পটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের মাছ চাষ নিবিড়করণ এবং যান্ত্রিকীকরণের ইতিহাসে সোনালি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। গুড অ্যাকুয়াকালচার প্র্যাকটিসেও আমরা আরো এক ধাপ এগিয়ে গেলাম। অদূর ভবিষ্যতে আরো অনেক উদ্যোক্তা এ প্রযুক্তি সম্প্রসারণে এগিয়ে আসবেন। সেই সঙ্গে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ভোক্তারা মানসম্পন্ন নিরাপদ খাঁটি বাংলাদেশী মাছের স্বাদ উপভোগ করতে পারবেন।
মৎস্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ড. সৈয়দ আরিফ আজাদ বণিক বার্তাকে বলেন, এটি একটি শক্তিনির্ভর ব্যবস্থা। কোনো কারণে বিদ্যুৎ চলে গেলে কয়েক মিনিটের মধ্যে পানির ভৌত রাসায়নিক গুলাবলির অবনতি ঘটে, বিশেষ করে অক্সিজেন কমে গিয়ে সংকটময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। এজন্য অবশ্যই জরুরি এবং বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা রাখা আবশ্যক। বিদ্যুতের উপযুক্ত ব্যাকআপ ব্যতিরেকে কোনোক্রমেই আইপিআরএস চালানো যাবে না।










