ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ভোটারদের সজাগ থাকার পরামর্শ দিয়েছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের যে লক্ষ্য, সেটা অর্জনের জন্য একটি বিষয়ই দরকার, সেটি হলো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। কিন্তু এ গণতন্ত্রের পথে অনেক বাধা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক বিবর্তন হচ্ছে। বাংলাদেশকে এর থেকে সবক নিতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ মিলনায়তনে গতকাল প্রখ্যাত রাজনীতিক, সাংবাদিক ও সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদের লেখা বই ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর: পাঠ ও পর্যালোচনা’ শীর্ষক আলোচনায় আকবর আলি খান এ কথা বলেন।
প্রধান আলোচক আকবর আলি খান বলেন, দেশে পরোক্ষ গণতন্ত্রকে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রে রূপান্তর করতে হবে। কারণ পরোক্ষ গণতন্ত্রে বিশেষ গোষ্ঠীর হাতে ক্ষমতা পুঞ্জীভূত হয়। সবশেষ যেটা দরকার—নির্বাহী বিভাগ, সংসদ, বিচার ব্যবস্থাকে স্বাধীন করতে হবে। বাংলাদেশের বর্তমানে সব রাষ্ট্রীয় অঙ্গগুলো নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্বে রয়েছে। নির্বাহী বিভাগের যদি এ ধরনের কর্তৃত্ব থাকে, তাহলে উদার নৈতিক গণতন্ত্রে মৃত্যু ঘটে, এটা মোটেও ঘটতে দেয়া উচিত না।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক এ উপদেষ্টা শাসনতান্ত্রিক পদ্ধতির পরিবর্তন, ভোট ব্যবস্থার সংস্কার, শাসনতান্ত্রিক বিধান ছাড়াই গণভোটের প্রবর্তন, ভোটের আনুপাতিক হারে প্রতিনিধি নির্বাচন পদ্ধতি প্রবর্তনের প্রস্তাব করে এ বিষয়ে যারা গণতন্ত্রের সমর্থক, তাদের নিরন্তর গবেষণার পরামর্শ দেন।
আবুল মনসুর আহমদের বই থেকে উদ্ধৃত করে আকবর আলি খান বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান সম্পর্কে আবুল মনসুর আহমদের চূড়ান্ত সমাধান হলো—বাংলাদেশের সংবিধান গণতান্ত্রিক হতে হবে। তিনি লিখেছেন, ‘পাকিস্তানের শাসনতান্ত্রিক সংবিধান রচনার সময়েও আমি বলিয়াছিলাম, পাকিস্তানে ইসলাম রক্ষা না করিয়া গণতন্ত্র রক্ষার ব্যবস্থা করুন। গণতন্ত্রই ধর্মের গ্যারান্টি। বাংলাদেশের সংবিধান রচনার সময় আমি বলিয়াছিলাম, বাংলাদেশের সমাজবাদের কোনো বিপদ নাই। যত বিপদ গণতন্ত্রের, গণতন্ত্রকে রোগমুক্ত করুন সমাজবাদ অবশ্যই সুস্থ হইয়া যাইবে।’
আবুল মনসুর আহমদের লেখার সঙ্গে একমত পোষণ করে আকবর আলি খান বলেন, বস্তুত একটু বিস্মিত হয়ে গেছি যে, বেশকিছু দিন ধরেই আমি এ কথাগুলো বলে আসছি। আমি মনে করেছি যে, এগুলো আমার বক্তব্য। দেখলাম আমি আবুল মনসুর আহমদের বক্তব্যই প্রচার করছি। এ বক্তব্য হলো যে, আমাদের সংবিধানে চারটি স্তম্ভ আছে—গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা। আমার বক্তব্য হলো, যে দেশে গণতন্ত্র নেই সে দেশে টেকসইভাবে ধর্মনিরপেক্ষতা চালু করা সম্ভব না। দ্বিতীয়ত, সমাজতন্ত্রের জন্যও গণতন্ত্র প্রয়োজন। গণতান্ত্রিক পদ্ধতির বাইরে যে সমাজতন্ত্র সেটা জোর করে চাপিয়ে দেয়া হবে এবং সেটা টেকসই নাও হতে পারে। আর বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদ লালিত, পালিত ও বিকশিত হয়েছে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের আওতায়। সুতরাং বাংলাদেশের যে লক্ষ্য সেটা অর্জন করার জন্য একটি বিষয়ই দরকার, এ বিষয়টি হলো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা।
আকবর আলি খান বলেন, অনেক বিষয় নিয়ে আবুল মনসুরের বইয়ে আলোচনা আছে। যেগুলো নিয়ে আমাদের চিন্তার প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে দেশ রক্ষা ও বাণিজ্য চুক্তি। সীমান্ত বাণিজ্য এবং জনগণের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন। যত সময় যাবে আবুল মনসুর আহমদের অবদান ততই বুঝতে পারবে।
সভাপতির বক্তব্যে ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, পুঁজিবাদ বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে গ্রাস করে নিয়েছে। আমাদের পূর্ণ স্বাধীনতা হয়নি, অর্থনৈতিক মুক্তি আসেনি। একটা সামাজিক বিপ্লব দরকার। আমরা স্পষ্ট করে বুঝি, এ বিপ্লব ছাড়া মুক্তির কোনো উপায় নেই।
আলোচনায় আরো অংশ নেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ বিন আলী। অনুষ্ঠানে পঞ্চমবারের মতো আবুল মনসুর আহমদ প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের পুরস্কার দেয়া হয়।










