গত কয়েক দশকে মৎস্য খাতে রীতিমতো নীরব বিপ্লব ঘটে গিয়েছে। খাতটিতে বৈশ্বিক পর্যায়ে সমীহজনক অবস্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে বড় একটি ভূমিকা রেখেছে অ্যাকুয়াকালচার বা চাষের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন। গ্রামাঞ্চলের অসংখ্য উদ্যোক্তা এখন মৎস্য চাষে এগিয়ে এসেছেন। লাভজনক এ ব্যবসায় ক্রমেই বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন তারা। এর মধ্য দিয়ে মৎস্য চাষ এখন দেশের গ্রামীণ অর্থনীতির কাঠামোকেও শক্তিশালী করে তুলছে।
চাষের মাধ্যমে মাছ উৎপাদনের দিক থেকে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে পঞ্চম। দেশে মোট উৎপাদিত মাছের অর্ধেকেরও বেশি আসছে অ্যাকুয়াকালচার থেকে। স্বাধীনতার সময় দেশে মাছের মোট উৎপাদন (চাষকৃত ও আহরিত মিলিয়ে) ছিল সোয়া সাত লাখ টনের কিছু বেশি। পাঁচ দশকের মাথায় এসে দেখা যাচ্ছে, শুধু অ্যাকুয়াকালচার থেকেই বার্ষিক সরবরাহ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫ লাখ টনে।
অ্যাকুয়াকালচারে বাংলাদেশের এ ঈর্ষণীয় অর্জনের পেছনে সরকারি ও ব্যক্তি খাত—উভয়কেই কৃতিত্ব দিয়ে থাকেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এ অর্জনের ভিত গড়ে দিয়েছিলেন দুজন মৎস্যবিজ্ঞানী। তারা হলেন ড. মো. ইউসুফ আলী ও এ কে আতাউর রহমান। অন্যদিকে মৎস্য চাষের আনুষ্ঠানিক শিক্ষার ভিত্তি গড়ে দেয়ার মাধ্যমে খাতটিকে আরো এগিয়ে যাওয়ার পথ গড়ে দেয়ার কৃতিত্ব দেয়া হয় ড. একেএম আমিনুল হককে।
ষাটের দশকে দেশে ব্যক্তিমালিকানার পুকুর ছিল পাঁচ লাখ। এর বাইরেও ছিল অসংখ্য খাল-বিল ও জলাশয়। এর পরও অ্যাকুয়াকালচার বা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মৎস্য চাষের বিষয়টি তখনো তেমন একটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। কারণ নদী থেকে বাছাইকৃত পোনা এনে বদ্ধ জলাশয়ে চাষ করার বিষয়টি ছিল বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে কার্পজাতীয় মাছের ক্ষেত্রে এ নিয়ে বেশ ঝামেলা পোহাতে হয়েছে মৎস্যচাষীদের। বিষয়টি মাছের জন্য যেমন অনিরাপদ ছিল, তেমনি পোনার মান ধরে রাখাটাও ছিল বেশ কঠিন।
এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য সে সময় কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তা ভালোভাবেই অনুভব করছিলেন মৎস্যবিজ্ঞানীরা। এক্ষেত্রে প্রথম সফলতা এসেছিল স্বাধীনতার ঠিক আগ মুহূর্তে। তৎকালীন মৎস্য বিভাগের পরিচালক ড. মো. ইউসুফ আলীর হাত ধরে। চাঁদপুরে অবস্থিত মৎস্য বিভাগের অধীন স্বাদু পানির মৎস্য গবেষণা কেন্দ্রে এ নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। কয়েক বছরের প্রয়াসের পর কার্পজাতীয় মাছ, বিশেষ করে রুই-কাতলা ও মৃগেলের কৃত্রিম প্রজননে সমর্থ হন তিনি। তবে স্বাধীনতাকালের ডামাডোলে এ প্রযুক্তির সম্প্রসারণ ঘটানো সম্ভব হয়নি।
স্বাধীনতার পর দেশের মৎস্যসম্পদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে উদ্যোগী হন বঙ্গবন্ধু। এজন্য ১৯৭২ সালে মৎস্য বিভাগকে মৎস্য অধিদপ্তরে রূপান্তরিত করেন তিনি। ওই সময়ে ড. মো. ইউসুফ আলীর উদ্ভাবিত প্রযুক্তি সম্প্রসারণে উদ্যোগী হন অধিদপ্তরের পরিচালক এ কে আতাউর রহমান। একই সঙ্গে এ মৎস্যবিজ্ঞানী নিজেও কার্পজাতীয় আরো কয়েকটি মাছের কৃত্রিম প্রজনন ঘটাতেও সক্ষম হন। এর ধারাবাহিকতায় সিলভার কার্প মাছের কৃত্রিম প্রজননে পরিপূর্ণ সফলতা আসে ১৯৭৫-৭৬ সালে। এছাড়া তারা এ সময়ে তেলাপিয়া মাছের চাষ সম্প্রসারণেও বেশ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
অন্যদিকে দেশে মৎস্য চাষের আনুষ্ঠানিক ও বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষার জনক বলা হয় জাতীয় অধ্যাপক ড. একেএম আমিনুল হককে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য অনুষদের প্রতিষ্ঠাতা তিনি। এখন পর্যন্ত সারা দেশে অনেক মৎস্যবিজ্ঞানী, সম্প্রসারণ কর্মী ও উদ্যোক্তা গড়ে দিয়েছে ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত অনুষদটি।
এ বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ড. সৈয়দ আরিফ আজাদ বণিক বার্তাকে বলেন, কার্পজাতীয় রুই-কাতলা ও মৃগেল মাছ সাধারণত পুকুর বা বদ্ধ পানিতে ডিম পাড়ে না। ফলে পুকুরে এসব মাছ চাষ করতে হলে মৎস্য চাষীদের নদী থেকে রেণু পোনা সংগ্রহ করে এনে পুকুরে ছাড়তে হতো। এতে পোনা বাছাই ও মান ধরে রাখা বেশ অনিরাপদ ছিল। ফলে কৃষকরা আগ্রহী হতেন না। কিন্তু কৃত্রিম প্রজনন সফল হওয়ার পর দেশে ব্যাপকভাবে চাষের মাছ উৎপাদন শুরু হয়। এর ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন তিনজন। তারা হলেন ড. মো. ইউসুফ আলী, এ কে আতাউর রহমান ও ড. একেএম আমিনুল হক। পরবর্তী সময়ে বেসরকারি খাতের বেশকিছু উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠান চাষের মাছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। আর মাছ চাষে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করেছে যশোর, ময়মনসিংহ ও কুমিল্লা জেলা।
এক্ষেত্রে আরো এক ব্যক্তির ভূমিকাকে স্মরণ করে থাকেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তিনি মো. লিয়াকত আলী। দেশে অ্যাকুয়াকালচারের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে মৎস্য অধিদপ্তরের সাবেক এ মহাপরিচালক পরবর্তীকালে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।
বেসরকারি খাতকে যুক্ত করার মাধ্যমে অ্যাকুয়াকালচারকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে ময়মনসিংহ অ্যাকুয়াকালচার এক্সটেনশন প্রজেক্টের অবদানও অনস্বীকার্য বলে মনে করা হয়। ডেনমার্কের প্রতিষ্ঠান ডানিডার সহায়তায় গৃহীত এ প্রকল্পের মাধ্যমে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে পাঙাশ, তেলাপিয়া, কার্পজাতীয় মাছের চাষ সম্প্রসারণ করা হয়।
অন্যদিকে বেসরকারি পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক মৎস্য চাষের ক্ষেত্রে অগ্রণী ধরা হয় সাজ্জাদ হোসেন, নুরুল হক ও হূতিশ পণ্ডিত নামের তিন বন্ধুকে। শিক্ষাজীবন শেষ করে ১৯৮৩ সালে ময়মনসিংহের ত্রিশাল, ভালুকা ও মুক্তাগাছা এলাকায় মাছের চাষ শুরু করেন তারা। তাদের প্রতিষ্ঠিত
আল-ফালাহ, ব্রহ্মপুত্র মৎস্য হ্যাচারি ও রিলায়েন্স অ্যাকুয়া ফার্মের সাফল্য পরে জেলার অনেক শিক্ষিত তরুণকে মৎস্য চাষে টেনে আনে। এক পর্যায়ে এ অনুপ্রেরণা ছড়িয়ে পড়ে গোটা দেশেই। বড় কয়েকটি করপোরেট গ্রুপও এখন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মৎস্য চাষে বড় বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে এসেছে।
এ বিষয়ে আল-ফালাহর পরিচালক সাজ্জাদ হোসেন জানান, শিক্ষাজীবন শেষ করে চাকরিতে প্রবেশ না করে আমরা তিন বন্ধু মাছের চাষ শুরু করি। এ সময় পারিবারিক ও সামাজিকভাবেও নানা বিঘ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে আমাদের। কিন্তু মাছ চাষ ছাড়িনি। দৃঢ়প্রতিজ্ঞা ও পরিকল্পনার মাধ্যমে কয়েক বছরের মধ্যেই সফলতা পাই আমরা। একেবারেই ব্যক্তি উদ্যোগে বিকশিত হওয়া এ খাতে এখন নানা ধরনের পরিবর্তন ও বহুমুখিতা এসেছে। মাছ চাষে এখন উন্নত প্রযুক্তি ও কারিগরি সহায়তা প্রয়োগ করা হচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের নানা সহযোগিতাও পেয়েছি।










