চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের (জুলাই-নভেম্বর) প্রথম পাঁচ মাসে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের বিপরীতে অর্থ ছাড় কমলেও সুদ পরিশোধ বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। এ সময় বিভিন্ন দেশের কাছ থেকে পাওয়া ঋণের অর্থ ছাড় হয়েছে ২১১ কোটি ৭০ লাখ ডলার। গত বছরের একই সময়ে তুলনায় অর্থ ছাড় কমেছে প্রায় ১৬ শতাংশ কম।
এ পাঁচ মাসে সরকারকে বৈদেশিক ঋণের সুদ বাবদ সরকারকে পরিশোধ করতে হয়েছে ৫৬ কোটি ২২ লাখ ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৩৭ শতাংশ বেশি। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সর্বশেষ প্রতিবেদনে এমন চিত্রই উঠে এসেছে।
চীন-রাশিয়াসহ কিছু দেশ থেকে বাজারভিত্তিক সুদহারে বেশি পরিমাণে ঋণ নেয়ায় সেগুলোর বিপরীতে সুদ পরিশোধের চাপ বেড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের ভাষ্যমতে, এ ধরনের ঋণের সুদহার বেশি। বেশকিছু মেগা প্রকল্পের ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হলে দুই বছরের মধ্যে আরো ২০০ কোটি ডলার পরিশোধের চাপ তৈরি হবে। এ অবস্থা মোকাবেলার জন্য রফতানি, রেমিট্যান্স ও প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রবাহ বাড়ানোয় আরো মনোযোগী হওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।
ইআরডির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে বিদেশী ঋণের অর্থ সবচেয়ে বেশি ছাড় করেছে জাপান, ৬১ কোটি ৯ লাখ ডলার। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪৪ কোটি ৪২ লাখ ডলার ছাড় করেছে এডিবি। এছাড়া ঋণের অন্যান্য উৎসের মধ্যে রাশিয়া ৪৩ কোটি ৯৯ লাখ ও বিশ্বব্যাংক ৩৮ কোটি ৭৯ লাখ ডলার ছাড় করেছে।
এ পাঁচ মাসে বিভিন্ন আসল ও সুদ মিলিয়ে সরকারের ঋণ পরিশোধে ব্যয় (ডেবট সার্ভিসিং কস্ট) ছিল ১৪ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা। ডলারের হিসাবে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১৩৩ কোটি ২০ লাখে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এর ছিল পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা বা ৮৮০ কোটি ৪৬ লাখ ডলার।
ইআরডির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে অর্থ ছাড় হয়েছে ২১১ কোটি ৭০ লাখ ডলার। আর একই সময়ে ঋণ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ১৩৩ কোটি ২১ লাখ ডলার। সে অনুযায়ী ঋণ পরিশোধে সরকারের ব্যয় হয়েছে মোট অর্থ ছাড়ের প্রায় ৪৬ শতাংশের সমপরিমাণ।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘চীন, রাশিয়াসহ কিছু দেশ থেকে বাজারভিত্তিক সুদহারে ঋণ নেয়ায় এমন চাপ তৈরি হয়েছে। কারণ এসব ঋণের সুদ বেশি। দুই-তিন বছর পর আসল পরিশোধের চাপও যুক্ত হবে। তাই রফতানি, রেমিট্যান্স ও এফডিআই বাড়ানো ছাড়া এর কোনো সহজ সমাধান নেই। সরকারের ঋণ নেয়ার চেয়ে বেসরকারি খাতে এফডিআই আনা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নতুন করে ঋণ নিয়ে একটা সময় আবার সুদ পরিশোধ করতেই হবে। কিন্তু বিনিয়োগ এলে সেখানে লাভ হওয়ার পর পরিশোধের বিষয় আসবে।’
দেশের চলমান মন্থর রেমিট্যান্সের প্রভাব, ডলার সংকট ও ক্রমাগত রিজার্ভ ক্ষয়ের মধ্যেও অর্থ ছাড় কমেছে। সংকটের সময়ে অর্থ ছাড় কমলেও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে ঋণের প্রতিশ্রুতি। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার প্রতিশ্রুতি বেড়েছে ১১ গুণের বেশি। ইআরডির তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে ঋণের প্রতিশ্রুতি এসেছে ৫৮৫ কোটি ৯১ লাখ ডলারের। গত অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৪৬ কোটি ৩১ লাখ ডলার। গত পাঁচ মাসে সবচেয়ে বেশি প্রতিশ্রুতি এসেছে এডিবি থেকে, ২০৬ কোটি ২ লাখ ডলার। জাপান ও বিশ্বব্যাংক থেকে এসেছে যথাক্রমে ১৫০ কোটি ৩৩ লাখ ও ১৪১ কোটি ৮০ লাখ ডলারের। এ সময় রাশিয়া, ভারত ও চীন থেকে নতুন কোনো প্রতিশ্রুতি মেলেনি।
অর্থ ছাড় কমার পেছনে প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতিকে দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা। বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘সরকারের প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ওপর অর্থ ছাড় নির্ভর করে। কারণ পাইপলাইন থেকে প্রকল্প বাস্তবায়ন কম হলে অর্থ ছাড় কমে যায়। কিছু কিছু ঋণের মেয়াদ সংকুচিত হয়ে আসায় এবং গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ায় সুদ পরিশোধের চাপ তৈরি হয়েছে।’
বণিক বার্তাকে তিনি আরো বলেন, ‘রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মেট্রোরেল ও কর্ণফুলী টানেলের মতো প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ শুরু হলে এ চাপ আরো বাড়তে পারে। ২০২৬ সাল নাগাদ আরো ৫০ থেকে ২০০ কোটি ডলার পরিশোধের সময় চলে আসবে। তাই রফতানিতে নতুন করে কোনো শক লাগলে তা আরো খারাপ পরিস্থিতি তৈরি করবে।’
আর্থিক হিসাব আগে কখনো ঋণাত্মক হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি আরো জটিল হওয়ার আগেই সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় নজর দিতে হবে।’










