বিশ্বব্যাপী উন্নয়নশীল দেশগুলোয় ঋণ বিতরণ করে আসছে এশিয়ার দেশ চীন। পশ্চিমা বিশ্ব এ ঋণকে ফাঁদ হিসেবে চিত্রিত করে আসছিল। সম্প্রতি শ্রীলংকা দেউলিয়া হয়ে যাওয়ায় পশ্চিমাদের এ দাবি আরো জোরালো হয়ে উঠেছে। কিন্তু একে ফাঁদ মনে না করার পক্ষে যুক্তি দেখিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। 

গতকাল বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে ‘উন্নয়নশীল দেশে ঋণ সংকট: চীন বা পশ্চিমা ফাঁদ?’ শীর্ষক একাডেমিক সেমিনারে বক্তারা বলেন, ‘‌শ্রীলংকার মোট বিদেশী ঋণের শতকরা ১০ ভাগ চীন থেকে নেয়া। দেশটির অধিকাংশ ঋণ মূলত প্রাইভেট সেক্টর থেকে নেয়া হয়েছে। আবার আফ্রিকাসহ তৃতীয় বিশ্বের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশকে প্রদত্ত চীনা ঋণ মওকুফেরও নজির রয়েছে। সুতরাং চীনের ঋণকে ফাঁদ বলা যেতে পারে না।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং উন্নয়ন ও অধ্যয়ন বিভাগের যৌথ আয়োজনে ‘আন্তঃবিভাগ সংলাপ সিরিজ-২০২৩’ শীর্ষক প্রথম সেমিনার ছিলো এটি। 

উন্নয়ন ও অধ্যয়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফারুক শাহের সঞ্চালনায় সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান। মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন ম্যাক্রো ও উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আনিস চৌধুরী। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. তানজীম উদ্দিন খান, অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মাসুদা ইয়াসমিন ও অধ্যাপক শাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর ও সহকারী অধ্যাপক এবিএম ওমর ফারুক প্রমুখ। 

মূল বক্তা অধ্যাপক ড. আনিস চৌধুরী বলেন, ‘‌যদি আমরা শ্রীলংকার কথা বলি, দেশটি চীন থেকে ঋণ নিয়েছে ১০ শতাংশের মতো। যেখানে কমার্শিয়াল সাইড অর্থাৎ প্রাইভেট ক্যাপিটাল মার্কেট থেকে লোন করেছে ৫০ শতাংশের অধিক। আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলো ইউরো বন্ড থেকে লোন করেছে প্রায় ৫০ শতাংশের উপরে। অন্যদিকে চীনের লোন কোনো দেশেই প্রায় ২০ শতাংশ অতিক্রম করেনি। অধিকাংশ দেশে সর্বোচ্চ ১৫-১৭ শতাংশ চীনা ঋণ। একই অবস্থা বিশ্বের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশেও। তাছাড়া চীন অনেক দেশে ঋণ মওকুফ করেছে। এমনকি অনেক দেশকে সুদবিহীন ঋণও দিয়েছে। সুতরাং চীনের ঋণ ফাঁদ হিসেবে মনে করার কিছু নেই।’

তিনি আরো বলেন, ‘‌গত প্রায় ২০ বছরে উন্নয়নশীল দেশগুলো কমার্শিয়াল লোন করেছে বেশি। অর্থাৎ প্রাইভেট ক্যাপিটাল মার্কেট। এ ধরনের লোন খুব ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এর সুদহার বেশি এবং দ্রুত পরিশোধ করতে হয়। এমনকি পুনরায় অর্থায়নের সুযোগ থাকে না। এটাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।’

অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘‌বাংলাদেশের ঋণ সর্বশেষ ১০ বছরে প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি খাতে ঋণের পরিমাণ তার আগের ৪৫ বছরের দ্বিগুণ হয়েছে। এ ঋণ বা ঘাটতি আমাদের সমস্যা সৃষ্টি করবে না, যদি তা আমাদের উৎপাদন সক্ষমতার চেয়ে বেশি না হয়। কিন্তু এটা যদি অন্য খাতে ব্যয় হয়, তাহলে সেটা অর্থনীতির ওপর বড় প্রভাব ফেলবে। আইএমএফ অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ৪২ মাসের যে কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, তা সাধারণ মানুষের মৌলিক অর্থনৈতিক সমস্যার সংকট নিরসন করতে পারবে না।’

অধ্যাপক মোহাম্মদ শাহাদাত হোসাইন সিদ্দিকী বলেন, ‘‌কোনো এক অর্থনীতিবিদ বলেছেন, একটি দেশের বিদেশী ঋণের পরিমাণ মোট প্রবৃদ্ধির শতকরা ২৩ ভাগের কম হলে ভালো। সেখানে আমাদের দেশে ঋণের পরিমাণ মাত্র ১০ ভাগ। হ্যাঁ, আমাদের অবস্থা সত্যিই অনেক ভালো এবং আমাদের আরো দু-তিন গুণ ঋণ নেয়া যেতে পারে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোও বিদেশী ঋণ নিচ্ছে।’ 

তিন বিভাগের যৌথ উদ্যোগে সেমিনারের আয়োজন করায় সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানান সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘‌ইকোনমিকস, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের যৌথ উদ্যোগে এ সুন্দর আয়োজন সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। এ ধরনের একাডেমিক সেমিনার একজন শিক্ষার্থীর মানসিক বিকাশ ও চিন্তার জগৎ বিস্তৃত করবে। আমি আশা করি, আগামীতেও এ ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে এবং এমন সুন্দর সেমিনার চলমান থাকবে।’