চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বহুলেন টানেল চালু হয়েছে অক্টোবরে। ৩১ ডিসেম্বর প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ বেশকিছু কাজ সম্পন্ন হয়নি। শেষ পর্যায়ে এসে তৃতীয় দফায় প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা। অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করে বৈদেশিক ঋণের অর্থ দিয়ে ব্যয় নির্বাহ নিশ্চিত করতে এ প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। তবে মেয়াদ বাড়লেও ব্যয় বাড়ছে না দেশের অন্যতম মেগা প্রকল্পটির। যদিও এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি বলে জানিয়েছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা।

বিবিএ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের চুক্তি অনুযায়ী প্রকল্পটি ছয় বছরের মধ্যে শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু কভিড-১৯ ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আমদানি মালপত্র যথাসময়ে আসতে না পারায় প্রকল্পের মেয়াদ দুই দফায় বাড়িয়ে চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী একনেকে পাস হয়েছে চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি। এ সময়ে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে হয়েছে ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি ৭১ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। নতুন করে তৃতীয় সংশোধনীতে ব্যয় না বাড়লেও সময় বাড়ানো হচ্ছে ছয় মাস। সর্বশেষ ২৮ নভেম্বর বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগকে (আইএমইডি) ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়ে চিঠি দিয়েছে সেতু কর্তৃপক্ষ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু টানেলের প্রকল্প পরিচালক হারুনুর রশীদ চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘টানেল ২৯ অক্টোবর থেকে সম্পূর্ণভাবে যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে। এর পরও কিছু আনুষঙ্গিক কাজ থাকে যেগুলো বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে শেষ করতে বিলম্ব হয়েছে। ঋণ চুক্তির মেয়াদ থাকায় ব্যয় না বাড়িয়ে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়াতে প্রস্তাব করা হয়েছে। এখনো এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি।’

শুরুতে প্রকল্পের ডিপিপির মেয়াদ দেড় বছর বাড়ানোর চিন্তাভাবনা করেছিল প্রকল্প কর্তৃপক্ষ, যা ২২ নভেম্বর প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) সভায় উত্থাপন করাও হয়। ২৩ নভেম্বর প্রজেক্ট স্টিয়ারিং কমিটির (পিএসসি) নবম সভায় ব্যয় বৃদ্ধি ব্যতিরেকে আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। প্রকল্প কর্তৃপক্ষ সময় বৃদ্ধির কারণ হিসাবে সার্ভিস এরিয়ার কাজ শেষ না হওয়া, বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের এভিআর (অটোমেটিক ভোল্টেজ রেগুলেটর) আমদানিতে বিলম্ব, সার্ভিস এরিয়ায় নির্মিত ভবনের সিলিংয়ের জিপসাম বোর্ড আমদানিতে বিলম্ব, সার্ভিস এরিয়ার ইলেকট্রিক্যাল কাজ শেষ না হওয়া, ভূমি অধিগ্রহণে বিলম্ব, পুলিশ ক্যাম্প ও ফায়ার স্টেশন নির্মাণকাজে বিলম্ব ছাড়াও স্ক্যানার বসানো, পুনঃরফতানির ভিত্তিতে আনা পণ্য পুনর্মূল্যায়ন শেষে অপসারণের বিষয়টি উল্লেখ করেছে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যয় বৃদ্ধি বাদ দিয়ে সময় বাড়ানোর প্রস্তাবটি আইএমইডি অনুমোদন করতে পারবে। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি ও স্টিয়ারিং কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নভেম্বরের শেষে প্রকল্পের মেয়াদ তৃতীয় দফায় বাড়াতে আইএমইডি সচিবকে চিঠি দেয়া হয়েছে। ৩১ ডিসেম্বর টানেল প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার আগেই সময় বাড়ানোর বিষয়টি অনুমোদন হবে বলে জানিয়েছেন তারা।

এ-সংক্রান্ত নথিপত্রে দেখা গেছে, সার্ভিস এরিয়ার কাজ শেষ হয়েছে ৮৫ শতাংশ। বৈশ্বিক সংকটে সার্ভিস এরিয়ার মালপত্র আমদানিতে বিলম্ব হচ্ছে। সার্ভিস এরিয়ার ফার্নিচার ক্রয়, এয়ার কন্ডিশনিং সিস্টেম, ফলস সিলিং, সাবস্টেশন নির্মাণ, বিদ্যুৎ সংযোগ, ল্যান্ড স্ক্যাপিং ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ এখনো শেষ হয়নি। ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ ক্যাম্পের কাজ শেষ হয়েছে মাত্র ৫০ শতাংশ। জানুয়ারি মাসে এভিআর দেশে পৌঁছবে এবং সেটি ইনস্টলেশনের জন্য কয়েক মাস সময় লাগবে। তাছাড়া কাজ শেষ করতে না পারায় সার্ভিস এরিয়ার জন্য এরই মধ্যে ২৯ দশমিক ৭০ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করা হলেও ডিসেম্বরের মধ্যে পরিশোধ করা যাবে ৫ দশমিক ১৯ মিলিয়ন ডলার। অবশিষ্ট ১২ দশমিক ২৬ মিলিয়ন ডলার ডিসেম্বরের মধ্যে পরিশোধ সম্ভব না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো ছাড়া উপায় দেখছে না সেতু বিভাগ।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পটির নভেম্বর পর্যন্ত ভৌত কাজের অগ্রগতি ৯৮ দশমিক ৯০ শতাংশ। অর্থাৎ ১ দশমিক ১০ শতাংশ কাজ বাকি রয়েছে। কিন্তু সীমিত এ কাজ শেষ হওয়ার আগে অর্থ পরিশোধ সম্ভব না হওয়ায় এর দায় বর্তাবে সেতু কর্তৃপক্ষের ওপর। ২৯ ফেব্রুয়ারি ঋণচুক্তির মেয়াদ থাকায় ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্প শেষ করতে হলে কয়েকশ কোটি টাকারও বেশি অব্যবহৃত থেকে যাবে। তাছাড়া অসমাপ্ত বেশকিছু কাজের ব্যয় ডলারে পরিশোধের কথা। এ কারণে মেয়াদ বাড়ানো ছাড়া চীনা ব্যাংকের ঋণ থেকে অর্থ পরিশোধ সম্ভব নয়। তাছাড়া নতুন করে ৬ দশমিক ৯৩১ একর ভূমি অধিগ্রহণ শেষ না হওয়ায় প্রাক্কলন করা ৯০ কোটি টাকা অপরিশোধিত থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

প্রকল্পের জন্য নতুন অনুষঙ্গ হিসেবে এরই মধ্যে দুটি স্ক্যানার বসানো হয়েছে। উভয় প্রান্তে বসানো এ স্ক্যানার কমিশনিংয়ের কাজ চলমান। চলতি ডিসেম্বরের মধ্যে আরো দুটি স্ক্যানার ইংল্যান্ড থেকে বাংলাদেশে আসবে। ডিসেম্বরের মধ্যে পুলিশ ক্যাম্প ও ফায়ার স্টেশন নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সেটি বাস্তবায়ন হয়নি। পুনঃরফতানির ১৬২টি কনসাইনমেন্টের মাধ্যমে ৪১৮টি আইটেম আমদানি হলেও নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৩৯টি। সব মিলিয়ে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই বলে জানিয়েছে সেতু কর্তৃপক্ষ।