প্রতি বছরের মতো এবারো সরকারিভাবে বোরো ধান ও চাল সংগ্রহ করেছে সরকার। গত ২৮ এপ্রিল শুরু হওয়া সংগ্রহ অভিযান চলে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। তবে এ নির্ধারিত সময়ে বোরো ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৫৯ শতাংশই পূরণ হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে বেঁধে দেয়া দামের চেয়ে বাজারে ধানের দাম বেশি থাকায় এবং সরকারি গুদামে ধান বিক্রির ক্ষেত্রে কিছু প্রক্রিয়াগত জটিলতা থাকায় কৃষকরা স্থানীয় বাজারেই ধান বিক্রি করে দেন। ফলে ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রতি বছরই সংগ্রহ কম হয়।
খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গিয়েছে, এ বছর প্রতি কেজি বোরো ধানের সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ২৭ টাকা, সিদ্ধ চাল ৪০ টাকা ও আতপ চাল ৩৯ টাকা। নির্ধারিত দামে ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬ লাখ ৫০ হাজার টন। তবে সময় শেষে বোরো ধান সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯৭৪ টন। সে হিসেবে লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৪১ দশমিক ২৩ শতাংশ পূরণ হয়েছে। একই সময়ে চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ লাখ টন। তার বিপরীতে সংগ্রহ হয়েছে ১১ লাখ ২০ হাজার ৮৮ টন। আতপ চালের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫০ হাজার টন, তার বিপরীতে সংগ্রহ হয়েছে ৫৪ হাজার ৮৯২ টন।
চলতি বছর বোরো মৌসুমে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ১৮ লাখ টন ধান ও চাল কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সব মিলিয়ে ধান-চাল সংগ্রহ হয়েছে ১৪ লাখ ৪২ হাজার ৯৫৪ টন। সে হিসেবে মোট ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়েছে ৮০ শতাংশ।
মোট হিসাব বাদ দিলে জেলাভিত্তিক ধান সংগ্রহের চিত্র বেশ করুণ। চলতি বছর ধান সংগ্রহে লক্ষ্যমাত্রার ধারে-কাছেও নেই যশোর জেলা। জেলাটিতে ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৯ হাজার ৭২৮ টন। সেখানে সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ৩ হাজার ১২৪ টন। অর্থাৎ ১৬ হাজার ৬০৪ টন কম সংগ্রহ হয়েছে। যশোরে পূরণ হয়নি চালের লক্ষ্যমাত্রাও। ২৭ হাজার ৭৫৫ টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে চাল সংগ্রহ হয়েছে ২৪ হাজার ৯৫৬ টন।
জেলার হাটবাজারগুলোতে মোটা ধান ৯৯০ থেকে ১ হাজার টাকা এবং চিকন ধান ১ হাজার ১৮০ থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকা মণ দরে বিক্রি হয়েছে। অন্যদিকে সরকারি গুদামে ধানের নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৮০ টাকা মণ। এছাড়া গুদামে ধান পৌঁছতে কৃষকের পরিবহন বাবদ আরো বাড়তি খরচ হয়। সে বিবেচনায় সরকারি গুদামে ধান বিক্রির চেয়ে স্থানীয় বাজারেই ধান বিক্রি করা কৃষকের জন্য সুবিধাজনক।
যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার ধলগ্রাম গ্রামের কৃষক রফিকুল বিশ্বাস বণিক বার্তাকে বলেন, স্থানীয় বাজারে প্রতি মণ ধান ১ হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি করেছি। এবার সরকারি দামের চেয়ে বাজারে ধানের দাম বেশি। সরকারি গুদামে ধান দেয়া অনেক ঝামেলার। আর্দ্রতার কথা বলে অনেক সময় ধান ফেরত দেয়া হয়। এতে সমস্যায় পড়তে হয়। কিন্তু স্থানীয় বাজারে এসব ঝামেলা নেই। নগদ দামও পাওয়া যায়। এজন্য এবারের সব ধান স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে দিয়েছি।
কৃষকদের অর্থ কীভাবে পরিশোধ করা হয় সে সম্পর্কে জানতে চাইলে যশোরের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, কৃষকদের একটি করে কৃষি কার্ড দেয়া হয়। ওই কার্ডে কৃষকের নাম, পরিচয় ও তার চাষ করা জমির পরিমাণ উল্লেখ থাকে। জেলায় কার্ডধারী কৃষকের ব্যাংকে ১০ টাকার হিসাব রয়েছে। ধান কেনার পর কৃষকের ব্যাংক হিসাবে টাকা দেয়া হয়। কৃষক ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা তোলেন।
লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার বিষয়ে যশোর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক নিত্যানন্দ কুণ্ডু বণিক বার্তাকে বলেন, কৃষক স্থানীয় বাজারে ধান বিক্রি করার কারণে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। কারণ স্থানীয় বাজারে বিক্রিতে তার পরিবহন ব্যয়, শ্রম ও সময় কম লাগে। তবে চুক্তিবদ্ধ চালকলের মালিকরা ঠিকমতো চাল সরবরাহ না করায় চাল সংগ্রহ কিছুটা কম হয়েছে। যারা কম দিয়েছে তাদের কাছে ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি ইস্যু করা হবে।
এছাড়া উত্তরবঙ্গের জেলা নওগাঁয় ২৬ হাজার ৩৪ টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও অর্জিত হয়েছে মাত্র ১ হাজার ১৪০ টন, যা লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৪ শতাংশ। জেলার সাপাহার, মহাদেবপুর, পত্নীতলা ও ধামইরহাট উপজেলা থেকে কোনো ধরনের ধান সংগ্রহ হয়নি। এছাড়া ৫৩ হাজার ৩২ টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সিদ্ধ চাল সংগ্রহ হয়েছে ৪৬ হাজার ৮০৪ দশমিক ২৩০ টন, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার ৮৮ শতাংশ। এছাড়া ৮৩৯ টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আতপ চাল সংগ্রহ হয়েছে ৬৩৩ টন।
নওগাঁ সদর খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসিএলএসডি) মাসুদ রানা বলেন, গত দুই বছর থেকে অ্যাপের মাধ্যমে ধান সংগ্রহ করা হচ্ছে। ধান সংগ্রহের আগে লিফলেট বিতরণ ও মাইকিংসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। তবে স্থানীয় বাজারে কৃষকরা ধানের দাম বেশি পাওয়ায় গুদামে ধান দিতে তেমন আগ্রহ দেখায়নি। স্থানীয় বাজারে চালের দামও বেশি ছিল। এর পরও মিলাররা লোকসান করে হলেও চাল দেয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন। সব মিলিয়ে ৮৮ শতাংশ চাল সংগ্রহ করা গিয়েছে।
প্রায় একই চিত্র নেত্রকোনা জেলায়ও। ২৪ হাজার ৪৮৪ টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ধান সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ১ হাজার ২৬৯ টন, যা লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৫ শতাংশ। এছাড়া ৫৬ হাজার ২২ টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সিদ্ধ চাল সংগ্রহ হয়েছে ৫১ হাজার ১৬৪ টন। তবে জেলাটিতে কেবল আতপ চালের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়েছে।
সিরাজগঞ্জ জেলায় ধান ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৮ হাজার ৭৬৫ টন। কিন্তু সংগ্রহ করা হয়েছে মাত্র ৫ হাজার ৯৭ টন। ২৫ হাজার ৮৮৮ টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে চাল সংগ্রহ হয়েছে ২৪ হাজার ৫৪৫ টন। আর আতপ চাল সংগ্রহ হয়েছে ৪৩ টন। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৭ টন।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক এসএম সাইফুল ইসলাম বলেন, সরকারি ক্রয় মূল্যের চেয়ে খোলাবাজারে ধানের দাম অনেক বেশি থাকার কারণে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হয়নি।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি ব্যবসা ও বিপণন বিভাগের চেয়ারম্যান মো. রশিদুল হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রথমেই গুদামগুলোকে উন্নত করতে হবে। এরপর বাজারে ধানের যে দাম সে দামের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। কারণ সমন্বয় না করলে কৃষক তো বিক্রি করতে চাইবে না। আরেকটা বিষয় হলো ভবিষ্যতে চালের দাম স্থিতিশীল রাখতে হলে সরকারকে অটো রাইস মিলে বিনিয়োগ করতে হবে। এছাড়া কোনো বিকল্প নেই। অটোরাইস মিলে বিনিয়োগ করা ছাড়া এ সমস্যার কোনো সমাধান আছে বলে মনে হয় না।
এ শিক্ষক আরো বলেন, আমরা শুনতে পাই অনেকেই ধান কিনে অতিরিক্ত মজুদ করে রাখে। এটা যদি করা হয়, তাহলে সরকারকেও বাজারে হস্তক্ষেপ করে বাজার থেকে ধান কিনে রাখতে হবে। এটা ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য জরুরি।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে খাদ্য অধিদপ্তরের সংগ্রহ বিভাগের পরিচালক মো. রায়হানুল কবীর বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা মিল মালিকদের কাছ থেকে চাল কিনি। যেহেতু তাদের সঙ্গে চুক্তি থাকে, তাই তারা সেটা পূরণ করতে বাধ্য। ফলে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়। কিন্তু ধান কেনা হয় কৃষকদের কাছ থেকে। সে ক্ষেত্রে তাদের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। গত কয়েক মৌসুম ধরে কৃষকরা বাজারে ভালো দাম পাচ্ছেন। ফলে তারা সরকারের কাছে বিক্রি না করে বাজারে বিক্রি করছেন। যার কারণে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হচ্ছে না। অন্যদিকে সরকারিভাবে যদি ধানের দাম বাড়ানো হয়, তাহলে বাজারেও ধানের দাম বেড়ে যাবে। এক্ষেত্রে আবার ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। সবকিছু বিবেচনা করেই দাম এমন জায়গায় রাখা হয়েছে।
বাজারে চাল বিক্রির ফলে অবৈধ চাল মজুদের ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে এ কর্মকর্তা বলেন, মজুদ করার সুযোগ নেই। সরকারের তো খাদ্য মজুদ নিয়ে আইন আছে। সম্প্রতি অনেককে জরিমানা করা হয়েছে। কিছু মানুষ তো সুযোগের অপব্যবহার করেনই। তবে তাদের ঠেকানোর জন্যও আইন আছে। কেউ অবৈধ মজুদ করতে চাইলে তার বিরুদ্ধে আইনের প্রয়োগ করা হবে।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন বণিক বার্তার যশোর, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ ও নেত্রকোনা প্রতিনিধি










