নড়াইলে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বেশির ভাগ টিউবওয়েলে পানি উঠছে না। নড়াইল সদরের ছয়টি ইউনিয়ন, লোহাগড়ার চারটি ও কালিয়া উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের দেড় লক্ষাধিক মানুষ সুপেয় পানির অভাবে ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। এসব এলাকায় প্রতিটি গ্রামে হাতে গোনা দু’একটি টিউবওয়েলে সামান্য পরিমাণ পানি উঠছে। ফলে খাওয়ার পানি সংগ্রহ করতে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে এলাকার মানুষের। বিশুদ্ধ পানির সংকটে বিভিন্ন এলাকায় বাড়ছে ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগ। হাসপাতালগুলোতে রোগী নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। এতে জনমনে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।

নড়াইল জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে জানা গেছে, ১২ থেকে ১৩ বছর আগে নড়াইলের কোনো এলাকায় তেমন পানির সংকট দেখা যায়নি। সাত-আট বছর ধরে নড়াইলের তিনটি উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রামে তীব্র পানির সংকট দেখা দেয়। দিন দিন এ সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করছে এবং এর (এলাকার) পরিধিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে সদর উপজেলার মাইজপাড়া, হবখালি, শাহবাদ, চন্ডিবরামপুর, কলোড়া, বিছালী ইউনিয়ন এবং লোহাগড়া উপজেলার নলদী, লাহুড়িয়া, জয়পুর ও শালনগর ইউনিয়ন এবং কালিয়া উপজেলার কয়েকটি গ্রামে প্রতি বছর ডিসেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত খাওয়ার পানি সংকট দেখা দেয়। এসব এলাকায় সাধারণত পানির স্থিতিতল ২৫ ফুটের নিচে থাকলে স্বাভাবিকভাবে পানি উত্তোলন করা যায়। কিন্তু ডিসেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত এসব এলাকায় পানির স্থিতিতল ৩৫ ফুটের নিচে চলে যায়। যেসব এলাকায় পানির স্থিতিতল ৩৫ ফুটের নিচে চলে যায়, সেসব এলাকায় টিউবওয়েলের পানি ওঠে না। প্রতি বছর পানির স্থিতিতল ক্রমাগত নিচে নামছে। নলকূপে পানি না ওঠায় পান করাসহ গৃহস্থালি কাজে মারাত্মক অসুবিধা হচ্ছে, তেমনি ব্যাহত হচ্ছে সেচনির্ভর কৃষি আবাদও।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নড়াইল সদর উপজেলার মাইজপাড়া, হবখালি, শাহবাদ, চন্ডিবরামপুর, কলোড়া, বিছালী ইউনিয়ন এবং লোহাগড়া উপজেলার নলদী, লাহুড়িয়া, জয়পুর ও শালনগর ইউনিয়নে টিউবওয়েল থেকে পানি উঠছে না। বেশির ভাগ টিউবওয়েল অকেজো হয়ে গেছে। এসব এলাকার প্রায় ৯০ ভাগ টিউবওয়েলে পানি উঠছে না। এলাকায় হাতে গোনা কিছু টিউবওয়েলে পানি উঠলেও নারী ও শিশুরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে সুপেয় পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এলাকার বেশির ভাগ পুকুরও শুকিয়ে গেছে।

রাজাপুর গ্রামের বাসিন্দা আরমান শেখ জানান, তার মহল্লায় কয়েকদিন ধরে কোনো টিউবওয়েলে পানি নেই। পঁচাশিপাড়া গ্রামের জয়নাল মোল্যা বলেন, সুপেয় পানি বর্তমানে তাদের কাছে সোনার হরিণের মতো। একটু পানযোগ্য নিরাপদ পানি সংগ্রহ করতে অনেক ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে তাদের। এ অবস্থার সৃষ্টি হওয়ায় অনিরাপদ উেসর পানি পান করে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

হবখালী ইউনিয়নের পাজারখালী গ্রামের সেলিম জানান, প্রতি বছর এ সময় এলে তাদের এলাকায় খাওয়ার পানির সংকট দেখা দেয়। এ বছরও খাওয়ার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। তাদের গ্রামে অন্তত ৮০০ টিউবওয়েল রয়েছে। বেশির ভাগ টিউবওয়েলে পানি উঠছে না। ৮০০ টিউবওয়েলের মধ্যে ৮ থেকে ১০টি টিউবওয়েলে স্বল্প পরিমাণে পানি উঠছে। যেসব বাড়ির টিউবওয়েলে পানি উঠছে, সেসব বাড়িতে এলাকাবাসী এসে লাইনে দাঁড়িয়ে পানি নিচ্ছেন।

লোহাগড়া উপজেলার নোয়াগ্রাম ইউনিয়নের বাড়িভাঙ্গা গ্রামের রুবেল মোল্যা বলেন, ‘আমাদের গ্রামের কমপক্ষে ৬০টি টিউবওয়েলে গত দুই মাস ধরে পানি উঠছে না। গ্রামের দুটি মসজিদে মুসল্লিরা ওজু করার জন্য পানি পাচ্ছেন না। অনেকেই নবগঙ্গা নদীতে গিয়ে গোসল করছেন। নদী থেকে পানি এনে ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে কেউ কেউ বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে পাইপ বসিয়ে কোনো রকম খাওয়ার পানি সংগ্রহ করছে। গ্রামের কয়েকটি টিউবওয়েলে তারা পাইপ বসালেও সেখানে লাইন দিয়ে পানি নিতে হচ্ছে। এ করোনার সময় এভাবে পানি সংগ্রহ করা অনেকটাই ঝুঁকিপূর্ণ।’

নড়াইল সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাক্তার মশিউর রহমান বাবু বলেন, জেলায় এ সময় পানির স্তর নিচে নেমে যায়। ফলে বিভিন্ন এলাকায় সুপেয় পানির অভাব দেখা দেয়। এ সময়টাতে অন্য সময়ের তুলনায় ডায়রিয়াসহ অন্যান্য পানিবাহিত রোগ বেশি হয়। প্রতিদিনই হাসপাতালে এ ধরনের অসংখ্য রোগী ভর্তি হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, মানুষের শরীরের জন্য পানির বিকল্প কিছুই নেই। এলাকাতে পানি পাওয়া না গেলেও দূর থেকে হলেও সুপেয় পানি সংগ্রহ করে বেশি বেশি পানি পান করার পরামর্শ দেন।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) নড়াইলের সহকারী প্রকৌশলী (সেচ) মো. রকিবুল হোসেন বলেন, ‘পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার জন্য ভূগর্ভস্থ পানি দিয়ে বোরো চাষ অনেকটা অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। সে কারণে নদী ও খালের পানি দিয়ে সেচকাজ চালানোর জন্য কৃষকদের এগিয়ে আসতে হবে। বিএডিসির অধীনে নড়াইল জেলায় ২১টি পাওয়ার পাম্পের আওতায় ৪৪৩ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে। এসব জমিতে পানি সেচের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হয়নি। কৃষকরা আগ্রহ প্রকাশ করলে নদী বা খালের পানি দিয়ে সেচ প্রকল্প চালুর ক্ষেত্রে বিএডিসি সহযোগিতা করবে।’

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর নড়াইলের নির্বাহী প্রকৌশলী এমএম আবু সালেহ বলেন, ‘ভূগর্ভস্থ পানি বেশি উত্তোলনের কারণে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। যার কারণে শুষ্ক মৌসুমে অনেক এলাকায় টিউবওয়েলে পানি আসছে না। তবে বৃষ্টি হলে সমস্যা কেটে যাবে। আমরা জনগণের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির পরিবর্তে সার্ভিস ওয়াটার অর্থাৎ নদী ও খালের পানি এবং বৃষ্টির পানি ব্যবহারের জন্য পরামর্শ দিই। এছাড়া বিনা প্রয়োজনে অতিরিক্ত পানি ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে। ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে নড়াইলের চিত্রা ও নবগঙ্গা নদীর পানি কীভাবে ব্যবহার বাড়ানো যায়, সে ব্যাপারে গবেষণা চলছে।’