চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে ৯ শ্রমিক নিহতের ঘটনা নিছক কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা অব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘন ও সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বহীনতার কারণেই এমন মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটেছে বলে মন্তব্য করেছেন জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের নেতারা। আজ রোববার দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধনে বক্তারা এসব কথা বলেন। জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের উদ্যোগে আয়োজিত কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন ফোরামের আহ্বায়ক তপন দত্ত।
সদস্যসচিব ফজলুল কবির মিন্টুর সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন কবি আবুল মোমেন, জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের আহ্বায়ক তপন দত্ত, বন্দর ও জাতীয় সম্পদ রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক (ডা.) এম আবু সাঈদ, ফোরামের যুগ্ম আহ্বায়ক ও জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সভাপতি এএম নাজিম উদ্দিন, ফোরামের কোষাধ্যক্ষ রিজওয়ানুর রহমান খান জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মানিক মণ্ডলসহ অন্যরা।
এ সময় আবুল মোমেন বলেন, একটি ইয়ার্ডে একই ঘটনায় ৯ শ্রমিকের প্রাণহানি অত্যন্ত মর্মান্তিক ও উদ্বেগজনক। শ্রমিকের জীবনকে কোনোভাবেই শিল্পের উৎপাদন ও মুনাফার চেয়ে কম মূল্য দেয়া যায় না। জাহাজভাঙা শিল্পে নিরাপত্তা নিশ্চিতে মালিকপক্ষের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোকেও কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের আহ্বায়ক তপন দত্ত বলেন, ইয়ার্ডে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু অত্যন্ত ভয়াবহ ও নজিরবিহীন ঘটনা। জাহাজভাঙা শিল্পে গত ২৫ বছরে একসঙ্গে এত শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। এই মৃত্যুকে শুধু দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর পেছনে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি ও দায়িত্বশীলদের অবহেলা রয়েছে কি না, তা খুঁজে বের করতে হবে। যে জাহাজকে ‘গ্যাস ফ্রি’ সার্টিফিকেট দেয়া হয়েছিল, সেই জাহাজের ট্যাংকে কীভাবে বিষাক্ত গ্যাস পাওয়া গেল। গ্যাস ফ্রি সার্টিফিকেট দেয়ার আগে যথাযথ পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না এবং সার্টিফিকেট দেয়ার পর জাহাজে নিয়মিত গ্যাস পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না- এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আনতে হবে।
ফোরামের নেতারা বলেন, দক্ষ শ্রমিক ও অনুমোদিত কন্ট্রাক্টরের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানোর দাবি শ্রমিকদের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরেই জানানো হচ্ছে। কিন্তু সেই দাবি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হয়নি। ফলে শ্রমিকদের প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। জাহাজভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনা ও শ্রমিকের মৃত্যু ঘটলেও কার্যকর জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে তদন্তের পর দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর মামলা বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এ কারণে মালিকপক্ষ নিরাপত্তা বিধি মানার ক্ষেত্রে আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
তারা আরো বলেন, ফেরদৌস স্টিলের দুর্ঘটনা তদন্তে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৯ সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। তবে শুধু তদন্ত কমিটি গঠন করলেই হবে না। তদন্ত অবশ্যই নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। তদন্তে দায়ীদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। তারা নিহত ৯ শ্রমিকের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেয়া, আহত শ্রমিকদের সম্পূর্ণ চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং দুর্ঘটনার জন্য দায়ী মালিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার দাবি জানান।
বক্তারা বলেন, প্রতিটি জাহাজে কাজ শুরুর আগে এবং কাজ চলাকালে বাধ্যতামূলক গ্যাস পরীক্ষা ও নিয়মিত গ্যাস মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ শ্রমিক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শুধু তদন্ত কমিটি গঠন করে দায়িত্ব শেষ করার সুযোগ নেই। প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত করে জবাবদিহি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতে কার্যকর ও স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।










