আধুনিক সিঙ্গাপুরের জনক লি কুয়ান ইউ। ১৯৫৯ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দেশটির প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। এ পদে দায়িত্ব পালন করছেন তার জ্যেষ্ঠ পুত্র লি সিয়েন লুংও। তার বয়সও এখন ৭০ পেরিয়েছে। চলতি মেয়াদ শেষের পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আর দায়িত্ব পালন করবেন না তিনি। তার উত্তরসূরি হিসেবে এখন দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী ও সাবেক সরকারি আমলা লরেন্স ওংয়ের নাম শোনা যাচ্ছে সবচেয়ে বেশি।
লি সিয়েন লুংয়ের উত্তরাধিকারী প্রশ্নে এর আগে সিঙ্গাপুরের জাতীয় পর্যায়ে তেমন কোনো বিতর্ক না হলেও ভাঙন দেখা গিয়েছে খোদ লি পরিবারের মধ্যেই। বড় ভাই লি সিয়েন লুংয়ের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়েছেন তার দুই ছোট ভাইবোন। তাদের অভিযোগ ছিল, ছেলে লি হংয়িকে যেনতেনভাবে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন লি সিয়েন লুং। যদিও শেষ পর্যন্ত ছেলে লি সিয়েন লুংয়ের পরিবর্তে লরেন্স ওংকেই উত্তরাধিকারী হিসেবে বেছে নিয়েছেন তিনি।
সম্প্রতি লরেন্স ওংকে পিপলস অ্যাকশন পার্টির (পিএপি) নেতৃত্বে নিজের উত্তরাধিকারী হিসেবে ঘোষণা দেন লি সিয়েন লুং। এর মধ্য দিয়ে লরেন্স ওংয়ের প্রধানমন্ত্রিত্বের পথও প্রশস্ত করে দেন তিনি। এ বিষয়ে ঘোষণা দেয়ার সময়ে তিনি বলেন, লরেন্সকে নিয়ে আমার পরিকল্পনা হলো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার উত্তরসূরি হবেন তিনি। সেক্ষেত্রে হয় ২০২৫ সালের নির্বাচনের আগে অথবা পরে (জয়লাভ করলে) তিনি এ দায়িত্ব পালন করবেন। আমার বয়স সত্তর পেরিয়েছে। লরেন্স ওং যখনই মনে করবেন তিনি প্রস্তুত, আমি তখনই তার হাতে দায়িত্ব তুলে দেব।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এখানকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশ প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেলেও ব্যতিক্রম সিঙ্গাপুর। এর মধ্য দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিনিয়োগ ও ব্যবসার জন্য সবচেয়ে আদর্শ গন্তব্য হয়ে উঠেছে নগররাষ্ট্রটি। দীর্ঘদিন ধারণা করা হচ্ছিল, আরেক উপপ্রধানমন্ত্রী হেং সুই কিয়াত পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে লি সিয়েন লুংয়ের উত্তরসূরি হবেন। কিন্তু গত বছর অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবেই ষাটোর্ধ্ব এ নেতা প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান। পরবর্তী উত্তরসূরি নির্বাচন নিয়ে বড় ধরনের দুশ্চিন্তায় পড়ে যান লি সিয়েন লুং।
এ অবস্থায় সমস্যা সমাধানে দলের বর্ষীয়ান নেতা খাও বুন ওয়ানের শরণাপন্ন হন তিনি। এ বিষয়ে লি সিয়েন লুংয়ের বক্তব্য ছিল নিজের উত্তরসূরি হিসেবে এমন কাউকে দেখতে চান তিনি, যিনি নিজের ব্যক্তিগত পছন্দ ও উচ্চাভিলাষের বাইরে এসে দল ও সিঙ্গাপুরকে নেতৃত্ব দেবেন। দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে তার উত্তরসূরি বেছে নেয়ার গুরুভার নিজ কাঁধে তুলে নেন খাও বুন ওয়ান। এজন্য অনেকটা পদ্ধতিগতভাবে এগিয়েছেন তিনি।
প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে মন্ত্রিসভার ১৭ সদস্য, পার্লামেন্টের স্পিকার তান চুয়ান-জিন ও শ্রমিক প্রধান নগো চি মেংয়ের সাক্ষাত্কার নেন খাও বুন ওয়ান। প্রধানমন্ত্রী লি সিয়েন লুং ও দুই বর্ষীয়ান মন্ত্রীকে এ প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়। এ ১৯ জনের মধ্যে ১৫ জনই প্রধানমন্ত্রিত্বের জন্য নিজেদের পছন্দ হিসেবে লরেন্স ওংয়ের কথা বলেছেন। এর ভিত্তিতে খাও বুন ওয়ান দলের শীর্ষ পর্যায়ে এক প্রতিবেদন জমা দেন। পিএপি ও সিঙ্গাপুরের চতুর্থ প্রজন্মের নেতৃত্ব হিসেবে মনোনীত হন লরেন্স ওং। তবে ২০২৫ সালে অনুষ্ঠেয় সিঙ্গাপুরের পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে লরেন্স ওং দলের নেতৃত্ব দেবেন কিনা, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো ঘোষণা আসেনি।
সিঙ্গাপুরের জনসাধারণের মধ্যে লরেন্স ওংয়ের জনপ্রিয়তাও রয়েছে অনেক। মহামারী ও লকডাউনের ধাক্কা কাটিয়ে পুনরুদ্ধারে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়ার মধ্যে নিজের জনভিত্তি অনেকটাই দৃঢ় করেছেন তিনি। কিছুদিন আগে দেশটির থিংক ট্যাংক প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অব পলিসি স্টাডিজ (আইপিএস) এক জরিপ চালায়। এতে উঠে আসে, মহামারীর প্রাদুর্ভাব-পরবর্তী সিঙ্গাপুরকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য লরেন্স ওংকে শ্রেষ্ঠ নেতা হিসেবে মনে করছে ৬০ শতাংশ সিঙ্গাপুরীয়। তাদের বিশ্বাস, মহামারীর প্রাদুর্ভাবজনিত অভিঘাত কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি অন্যান্য দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও সিঙ্গাপুরের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে সফলভাবে সামাল দিতে পারবেন তিনি।
লরেন্স ওংয়ের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে এর আগে খুব বেশি আলোচনা হয়নি। রাজনীতিতে যোগদানের আগে পেশায় ছিলেন সরকারি আমলা। সিঙ্গাপুরের জনসাধারণের কাছে তার পরিচিতিও ছিল কম। ক্ষমতাসীন পিপলস অ্যাকশন পার্টির (পিএপি) সমসাময়িক অন্য অনেক নেতার মতোই নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ভূমিকা রাখার তেমন একটা সুযোগ পাননি তিনি। বরং পরিচিতি পেয়েছেন গৃহীত নীতিমালার সফল বাস্তবায়নকারী হিসেবে।
সে হিসেবে অনেকেরই ধারণা নীতিগতভাবে লি পরিবারের শাসনামলেরই ধারাবাহিকতা বজায় রাখবেন তিনি। আবার কোনো কোনো পর্যবেক্ষকের বিশ্লেষণ হলো লরেন্স ওং আগে নিজের ক্ষমতার ভিত্তি দৃঢ় করে নেবেন। এর পরেই নিজের পছন্দসই সংস্কারের কাজে হাত দেবেন তিনি।
পিএপি ও সিঙ্গাপুরের চতুর্থ প্রজন্মের নেতা নিয়ে রাজনৈতিকভাবে তেমন কোনো আলোড়ন না হলেও জল ঘোলা হয়েছে লি পরিবারের ভেতরে। লি কুয়ান ইউর দুই ছেলেই সেনাবাহিনীতে ছিলেন। বড় ছেলে লি সিয়েন লুং পরবর্তী সময়ে রাজনীতিতে যোগ দিলেও ছোট ছেলে লি সিয়েন ইয়াং নিজেকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন। চিকিৎসকের পেশায় মনোনিবেশ করেছেন একমাত্র মেয়ে লি ওয়েই লিং। সিঙ্গাপুর সরকারে লি সিয়েন লুংয়ের স্ত্রী হো চিংয়ের প্রভাব নিয়ে বরাবরই সমালোচনায় মুখর হয়েছেন তারা দুজনে। তাদের অভিযোগ ছিল, লি সিয়েন লুং ও হো চিং নিজেদের বড় ছেলে লি হংয়িকে সিঙ্গাপুরের রাজনীতি ও ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছেন।
লি সিয়েন লুংয়ের সমালোচকদের মতে, ছেলে লি হংয়িকে প্রস্তুত হওয়ার সময় দিতেই লরেন্স ওংকে উত্তরসূরি হিসেবে নির্বাচন করেছেন সিঙ্গাপুরের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী। এর আগে লি কুয়ান ইউ রাজনীতিতে অবসর নেয়ার পর তার উত্তরসূরি গোহ চোক তোং ১৪ বছর সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রিত্ব করেছেন। সে সময় তার পৃষ্ঠপোষকতায় রাজনীতিতে নিজের ভিত্তি শক্ত করেছেন লি সিয়েন লুং। ২০০৪ সালে প্রায় বিনা বাধায়ই সিঙ্গাপুরের শাসনভার হাতে তুলে নেন তিনি। লরেন্স ওংয়ের সময়ও এমন চিত্রের পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে লি হংয়ির উত্থানের সম্ভাবনা রয়েছে বলে অভিযোগ সমালোচকদের।
এ বিষয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী লি সিয়েন লুংয়ের ছোট ভাই লি সিয়েন ইয়াংয়ের বক্তব্য হলো সিঙ্গাপুরের রাজনীতিতে আরেকজন লির কোনো প্রয়োজন নেই।










