সীমিত দায় কোম্পানি ও আবাসন খাতের বিনিয়োগকারীদের প্রকৃত পরিচয় জানানোর নিয়ম করে নতুন আইন করছে যুক্তরাষ্ট্র। এ আইন হলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রে নিবন্ধিত শেল কোম্পানিগুলোর সুবিধাভোগী ও আবাসন খাতে নগদে বিনিয়োগকারীদের প্রকৃত পরিচয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার ডাটাবেজে জমা দিতে হবে। সেক্ষেত্রে দেশটিতে অবৈধ অর্থ পাচারের মাধ্যমে বেনামে বিনিয়োগকারীদের পরিচয় গোপনের সুযোগও আর থাকছে না। একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে খাত দুটিতে বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রেও। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বিষয়টি নিয়ে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বেনামে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বড় ধরনের আতঙ্কের সঞ্চার হয়েছে। এরই মধ্যে যারা দেশটিতে অবৈধ পথে পাচারকৃত অর্থ বিনিয়োগ করেছেন, নাম প্রকাশিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা নিয়েই বছর শুরু হচ্ছে তাদের।
পুঁজিবাদের কেন্দ্র হিসেবে বিশ্বের শীর্ষ করপোরেটসহ লাখ লাখ কোম্পানি ও ব্যক্তি পর্যায়ের বিনিয়োগকারীর প্রধান আকর্ষণ যুক্তরাষ্ট্র। প্রতি বছরই দেশটিতে অনেক সীমিত দায় কোম্পানি ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। দেশটির আবাসন খাতের এক-তৃতীয়াংশ বিনিয়োগই হয় নগদে। এসব সীমিত দায় কোম্পানি ও আবাসন খাতের নগদ লেনদেন যুক্তরাষ্ট্রসহ গোটা বৈশ্বিক অর্থনীতিতেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে আবার দুর্নীতি, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানের মাধ্যমে অর্জিত অবৈধ অর্থ বা সন্ত্রাসে অর্থায়নও বৈধতার সুযোগ পাচ্ছে। তবে বর্তমানে এ ধরনের বিনিয়োগের লাগাম টেনে ধরতে চাইছে বাইডেন প্রশাসন। এজন্য সীমিত দায় কোম্পানি ও নগদে আবাসন খাতে বিনিয়োগকারীদের প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত করতে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
এ বছরের ৬ ডিসেম্বর আবাসন খাতে বিনিয়োগকারীদের তথ্য প্রকাশের বিষয়টি করপোরেট ট্রান্সপারেন্সি আইনে অন্তর্ভুক্তির ঘোষণা দেয় মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের অধীন দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইমস এনফোর্সমেন্ট নেটওয়ার্ক (ফিনসেন)। এ সময় বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় জনগণের কাছ থেকে মতামতও চাওয়া হয়। সীমিত দায় কোম্পানিগুলোর সুবিধাভোগীদের তথ্য প্রকাশের বিষয়টি অন্তর্ভুক্তির ঘোষণা দিয়ে এ-সংক্রান্ত মতামত চাওয়া হয় ৭ ডিসেম্বর। চলতি বছরেই আইনটি প্রণয়ন করা হবে। এর আওতায় শেল কোম্পানিগুলোকে তাদের সুবিধাভোগীদের তথ্য বাধ্যতামূলকভাবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে জমা দিতে হবে।
আইনটি অস্বচ্ছ শেল কোম্পানির দুনিয়ায় বড় ধরনের তোলপাড় আনতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্যমতে, নতুন এ আইন করপোরেট গোপনীয়তার নিয়মের সুযোগ নিয়ে প্রকৃত মালিকদের তথ্য আড়াল করা কোম্পানিগুলোকে মারাত্মক বিপাকে ফেলতে যাচ্ছে। নতুন আইনের আওতায় কোম্পানিগুলোর মালিকদের নাম, জন্মতারিখ, ঠিকানা ও অন্যান্য পরিচয় শনাক্তকারী কাগজপত্র ফিনসেনের কাছে জমা দিতে হবে। আইন প্রণয়নের আগে যেসব কোম্পানি গঠন করা হয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে তথ্য জমা দেয়ার জন্য এক বছর সময় দেয়া হবে। অন্যদিকে আইন প্রণয়নের পরে যেসব কোম্পানি গঠন করা হবে, সেগুলোকে তাদের ১৪ দিনের মধ্যেই এসব তথ্য জমা দিতে হবে।
ফিনসেনের ভাষ্যমতে, সংস্থাটির এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য হলো শেল কোম্পানির আড়ালে তাদের অবৈধ অর্থ গচ্ছিত রাখা বা অস্বচ্ছ করপোরেট কাঠামোর মাধ্যমে বেআইনি কর্মকাণ্ডকে আড়াল করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া। স্থানীয় জনগণকে ৬০ দিনের মধ্যে এ বিষয়ে মতামত দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। সে হিসেবে মতামত গ্রহণের সময় শেষ হচ্ছে আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি।
এ বিষয়ে সংস্থাটির পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) হিমামাওলি দাস তার বক্তব্যে বলেন, অজ্ঞাত শেল করপোরেশন, ফ্রন্ট কোম্পানি ও অন্যান্য দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে যারা দুর্নীতি, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানের মাধ্যমে অর্জিত অবৈধ অর্থ কিংবা সন্ত্রাসে অর্থায়নের জন্য মুদ্রা পাচার করছে তাদের বিরুদ্ধে ফিনসেন কঠোর ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে।
মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের প্রত্যাশা, নতুন এ আইনের মাধ্যমে শেল কোম্পানি তৈরি করে অবৈধ অর্থ পাচার এবং করযোগ্য আয় আড়াল করার সঙ্গে জড়িতদের নিরস্ত করা সম্ভব হবে। এছাড়া আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আদালত ও ব্যাংকের জন্য অবৈধ অর্থের গতিপথ খুঁজে বের করার ক্ষেত্রেও সহায়ক হবে আইনটি।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের গুটিকয়েক অঙ্গরাজ্যে সীমিত দায় কোম্পানি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে এর নিয়ন্ত্রণকারীদের তথ্য পুরোপুরি প্রকাশ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অন্যদিকে ডেলাওয়ার ও ওয়াইমিং অঙ্গরাজ্যে এ ধরনের কোম্পানি খোলার জন্য তেমন কোনো তথ্যই দিতে হয় না। বর্তমানে অঙ্গরাজ্য দুটি শেল করপোরেশনগুলোর জন্য স্বর্গ হয়ে উঠেছে।
প্রসঙ্গত, শেল করপোরেশন হচ্ছে এমন ধরনের কোম্পানি, যেগুলোর কোনো ব্যবসায়িক কার্যক্রম থাকে না। মূলত কর ফাঁকি, সম্পদের তথ্য গোপন এবং আবাসন খাতে বিনিয়োগকারীদের প্রকৃত পরিচয় গোপন করতে এসব কোম্পানি সহায়ক ভূমিকা রাখে। নতুন ট্রেজারি আইনের আওতায় এ ধরনের কোম্পানির মালিকানা বা যাদের ন্যূনতম ২৫ শতাংশ শেয়ার রয়েছে অথবা ব্যবসায় উল্লেখযোগ্য হারে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকারীদের তথ্য সরবরাহ করতে হবে। তবে এরই মধ্যে প্রকৃত বিনিয়োগকারীদের তথ্য প্রকাশকারী প্রতিষ্ঠান, আইনসম্মতভাবে ব্যবসা পরিচালনাকারী ও তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে এ আইন তেমন কোনো প্রভাব ফেলবে না। নতুন আইনে এ ধরনের অনেক কোম্পানিকে অব্যাহতি দেয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে।
গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির প্রাক্কলন অনুসারে, গত পাঁচ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের আবাসন খাতের মাধ্যমে ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার পাচার করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে অস্বচ্ছ শেল কোম্পানি নিবন্ধনের মাধ্যমে রাজনৈতিক, সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও মাদক কারবারিদের অর্থ পাচার ও তা আড়াল করে রাখার বিষয়টি উন্মোচিত হয়। পানামা পেপারস, প্যারাডাইস পেপারস ও হালের প্যান্ডোরা পেপারসে এ ধরনের অনেক কেলেঙ্কারি উন্মোচিত হয়েছে। এসব ঘটনায় বেশ তোলপাড়ও সৃষ্টি হয়েছে।
শেল কোম্পানির মাধ্যমে অর্থ পাচার ও তা যুক্তরাষ্ট্রের আবাসন খাতের বিনিয়োগের মাধ্যমে বৈধ করার পদ্ধতিটি বেশ অভিনব। বিদ্যমান মার্কিন ডিসক্লোজার আইনের আওতায় যে কেউ পানামার মতো দেশে খোলা ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ডেলাওয়ারে শেল কোম্পানি খুলতে পারে। পরবর্তী সময়ে পানামার ব্যাংক হিসাব থেকে বড় অংকের অর্থ যুক্তরাষ্ট্রে খোলা শেল কোম্পানিতে বিনিয়োগ হিসেবে স্থানান্তর করা হলে সে অর্থের প্রকৃত মালিকের তথ্য কেউই জানতে পারছে না। আবার এসব শেল কোম্পানি থেকে নগদ অর্থ দিয়ে সহজেই যুক্তরাষ্ট্রের আবাসন খাতে বিনিয়োগ করা সম্ভব। পরবর্তী সময়ে এসব শেল কোম্পানি যখন আবাসন খাতের এসব বিনিয়োগ যেমন ফ্ল্যাট, অ্যাপার্টমেন্ট বা বাড়ি অন্য কারো কাছে বিক্রি করে যে অর্থ পায়, সেটিও মার্কিন কর্তৃপক্ষের কাছে বৈধ হয়ে যায়। তখন এ অর্থ মার্কিন কোনো ব্যাংকে রাখার ক্ষেত্রেও খুব একটা সমস্যা থাকে না। এভাবে অবৈধ অর্থ যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ করার এ পদ্ধতি এরই মধ্যে পাচারকারী ও সন্ত্রাসে অর্থায়নকারীদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
তবে নতুন আইনের আওতায় শেল কোম্পানি নিবন্ধন করতে হলে এর প্রকৃত মালিকের নাম ও পাসপোর্ট ফিনসেনের কাছে দিতে হবে। এতে শেল কোম্পানির মাধ্যমে অর্থ পাচারের বিষয়টি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলবে বলে মনে করছে সংস্থাটি। এছাড়া নতুন এ ঘোষণার সঙ্গে সংগতি রেখে ফিনসেন নগদে আবাসন খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও বিনিয়োগকারীর তথ্য জমা দেয়ার বিধান করতে যাচ্ছে। ফলে শেল কোম্পানি ও নগদে আবাসন খাতে বিনিয়োগ—কোনোটিই আর পরিচয় গোপন রেখে করা সম্ভব হবে না।
এ বিষয়ে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের ডেপুটি সেক্রেটারি ওয়েলি আদেইয়েমো সম্প্রতি ব্রোকিং ইনস্টিটিউশন থিংকট্যাংকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, বিদ্যমান আইন মানুষকে পরিচয় গোপন রেখে কোম্পানি খুলে নগদ অর্থের মাধ্যমে আবাসন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ দিচ্ছে। এক্ষেত্রে অর্থের উৎস গোপন থাকছে। আবাসন খাতে এ ধরনের সন্দেহজনক সব ধরনের নগদ লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের এ বছরের জুনে দেয়া দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণার সঙ্গে সংগতি রেখেই এসব পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। তার নির্দেশনার ভিত্তিতে দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তারা দুর্নীতিবিরোধী জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়ন করেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় সদ্যসমাপ্ত বছরের ৬ ও ৭ ডিসেম্বর শেল কোম্পানি ও নগদে আবাসন খাতে বিনিয়োগ-সংক্রান্ত ফিনসেন ঘোষণা প্রকাশ করা হয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের পক্ষ থেকে কয়েকটি দেশ ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে আরোপিত নিষেধাজ্ঞাও বাইডেনের দুর্নীতিবিরোধী ঘোষণারই ধারাবাহিকতা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। যুক্তরাষ্ট্রকে অনুুসরণ করে কানাডাও যদি একই ধরনের আইন করে তাহলে এ দুই দেশে যারা অবৈধ অর্থ সরিয়েছেন তাদেরও বড় ধরনের বিপদে পড়তে হবে। এখন পর্যন্ত এ দুই দেশে অনেক বাংলাদেশী তাদের অর্থ সরিয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার তানজিব-উল-আলম বণিক বার্তাকে বলেন, বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা যুক্তরাষ্ট্রে সম্পত্তি তেমন একটা কেনে না। যে কয় ব্যক্তি কেনে, তারা সাধারণত কোনো পোষ্য বা নির্ভরশীল কাউকে আইনসংগত মালিক দেখিয়ে কেনে। সুবিধাভোগীদের তথ্য প্রকাশের নতুন আইনটি এসব বিনিয়োগকারীর পরিচয় প্রকাশের ঝুঁকিকে অনেকাংশেই বাড়িয়ে দেবে বলে আমি মনে করি। আবাসন খাতের বা কোম্পানির বিনিয়োগকারীদের পরিচয় প্রকাশ করতে হলে আবাসন বাজার ও বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। আমরাও এর বাইরে থাকব না। এক্ষেত্রে সম্ভাবনা রয়েছে, পরিচয় প্রকাশের আইনটির সাধারণ পর্যায়ে প্রয়োগ হবে না। কারণ এক্ষেত্রে প্রোপার্টি ব্যবসায়ী গ্রুপগুলো এর বিরোধিতা করবে। সব দেশই রাশিয়া ও চীন থেকে আসা বেআইনি অর্থের ভাগ চায়। যুক্তরাষ্ট্রও এর ব্যতিক্রম নয়।










