রফতানির বিপরীতে ভর্তুকি বা নগদ সহায়তা পেতে রফতানিমূল্য প্রত্যাবাসনের দিন থেকে ১৮০ দিনের মধ্যে আবেদন দাখিলের বিধান রয়েছে। সংশ্লিষ্ট অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকে এ আবেদন করতে হয়। কিন্তু করোনা প্রতিরোধে বিভিন্ন সময়ে জারি করা বিধিনিষেধের কারণে রফতানি কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত বেশির ভাগ সরকারি-বেসরকারি অফিস বন্ধ ছিল। ফলে নির্ধারিত সময়ে নগদ সহায়তা উত্তোলনের আবেদন করতে পারেননি রফতানিকারকরা। এজন্য ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরের নগদ সহায়তা পেতে আবেদনের সময়সীমা বাড়ানোর দাবি জানানো হয়েছে। সময়সীমা ১৮০ থেকে বাড়িয়ে ৩৬০ দিন করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব পাঠিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এটি এখন পর্যালোচনা করে দেখছে অর্থ মন্ত্রণালয়। শিগগিরই এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, ২০২০ সালের অক্টোবরে নগদ সহায়তা পেতে আবেদনপত্র দাখিলের সময়সীমা ৪৫ দিন বাড়ানো হয়। তবে করোনাকালে রফতানিসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত সরকারি-বেসরকারি অফিস বন্ধ থাকায় রফতানি সহায়তা উত্তোলনে প্রয়োজনীয় দলিলাদি নির্দিষ্ট সময়ে দাখিল করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানগুলো। এ অবস্থায় রফতানি ভর্তুকি বা নগদ সহায়তা দেয়ার আবেদনপত্র দাখিলের সময়সীমা ১৮০ দিনের পরিবর্তে ৩৬০ দিন করার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। এ অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতেই অর্থ মন্ত্রণালয়ে এ প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। 

প্রস্তাবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, করোনার কারণে বিদেশী ক্রেতার আর্থিক অসচ্ছলতা ও দেউলিয়াত্বের কারণে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতে অনেক শিপমেন্ট বাতিল হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে রফতানিমূল্য প্রত্যাবাসিত হয়ে থাকলে বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ভর্তুকি উত্তোলনের আবেদন গ্রহণের সময়সীমা বাড়ানো সমীচীন হবে।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, বস্ত্র ও পোশাক খাতের রফতানিকারকরা সম্প্রতি তাদের সমস্যার কথা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে জানান। মন্ত্রণালয়ও মনে করে করোনা মহামারীর এ সময় তাদের একটু সময় দেয়া প্রয়োজন। এ পরিপ্রেক্ষিতেই সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে সময় বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তবে অর্থ মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে এখনো কিছু জানায়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ৩৭টি শ্রেণীর ৪৭ ধরনের পণ্য বিভিন্ন হারে প্রণোদনা পায়। এর মধ্যে কয়েকটি পণ্য ২০ শতাংশ, কিছু পণ্য ১৫ শতাংশ ও ১০ শতাংশ হারে প্রণোদনা পায়। আবার কিছু পণ্য ১ থেকে ৯ শতাংশ হারে প্রণোদনা পায়।

এদিকে তৈরি পোশাক খাতের সক্ষমতা বাড়াতে দুই বছর আগে শুরু হওয়া অতিরিক্ত ১ শতাংশ প্রণোদনার সুবিধা চলতি অর্থবছরও পাচ্ছেন রফতানিকারকরা। ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে এ সুবিধা অব্যাহত রাখা হয়েছে। এছাড়া বর্তমানে তৈরি পোশাক রফতানির চারটি খাতে সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ হারে রফতানি প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে অপ্রচলিত বাজারে ৪ শতাংশ, ক্ষুদ্র রফতানিকারকদের জন্য মূল্য সংযোজনের ৪ শতাংশ ও প্রচলিত বাজারে ১ শতাংশসহ রফতানির ওপর বিভিন্ন নগদ সহায়তা রয়েছে।

চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে রফতানি খাতে প্রণোদনা দেয়ার লক্ষ্যে বরাদ্দ রয়েছে সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা। গত অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৭ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা। আর ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩৭ ধরনের পণ্য রফতানির জন্য নগদ সহায়তা হিসেবে বরাদ্দ ছিল ৬ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, করোনার কারণে জাহাজীকরণসহ বিভিন্ন জায়গায় একটু সময় বেশি লাগছে। রফতানির বিপরীতে নগদ সহায়তা উত্তোলনের আবেদনে অনেক কাগজপত্র প্রয়োজন হয়। এজন্যই আমরা সময় বাড়ানোর আবেদন করেছি।

সময় বাড়ানোর আবেদনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, একটা এলসির আওতায় সব পেমেন্ট না পেলে আমরা আবেদন করতে পারি না। একটা এলসির অধিকাংশ পাওনা পাওয়ার পর যদি একট ছোট্ট পেমেন্ট বাকি থাকে, তাহলেও পুরো এলসির আবেদন আটকে থাকে। করোনার কারণে সবখানেই স্থবিরতা বিরাজ করছে। অনেক দিন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। তাই এক্ষেত্রে একটু বেশি সময় প্রয়োজন।

এদিকে করোনা অতিমারীর কারণে এরই মধ্যে রফতানি খাতে নগদ সহায়তার অর্থ ছাড়ের শর্ত শিথিল করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রফতানিমুখী শিল্পে যাতে তহবিল সংকট না হয়, সেজন্য এ উদ্যোগ নেয়া হয়। এ উদ্যোগের ফলে ২০২০ সালের ১ জুলাই থেকে যেসব পণ্য রফতানি হয়েছে সেগুলোর বিপরীতে শিথিল শর্তে নগদ সহায়তার অর্থ পাওয়ার জন্য আবেদন করা যাবে।

সূত্র জানায়, আগে রফতানি আয়ের বিপরীতে সরকারের দেয়া নগদ সহায়তার অর্থ পেতে আবেদন করার সময় রফতানির বিল অব লেডিং (সংশ্লিষ্ট বন্দর থেকে পণ্য খালাস হওয়ার সনদ) বা এয়ার ওয়ে বিল (বিমানে পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে পরিবহন বিল) জমা দেয়া বাধ্যতামূলক ছিল। সমুদ্র ও বিমানপথে পণ্য রফতানি হলে এসব কাগজপত্র দেয়া সম্ভব। কিন্তু বর্তমানে এসব পথের বাইরে স্থল, নৌ ও রেলপথেও পণ্য রফতানি হচ্ছে। ফলে স্থল বা নৌপথে পণ্য রফতানি হলে এসব কাগজপত্র দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।

এ কারণে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। যেখানে বলা হয়েছে, এখন থেকে স্থল বা নৌপথে পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে পরিবহন ভাড়ার রসিদ জমা দেয়া যাবে। এর বাইরে ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং প্রতিষ্ঠানের ইস্যু করা বিভিন্ন সনদও শর্তসাপেক্ষে গ্রহণ করা হবে। এতে আরো বলা হয়, রফতানির বিষয়ে দুই পক্ষের চুক্তিপত্রের মধ্যে ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র গ্রহণ করার শর্ত থাকতে হবে। প্রতিষ্ঠানের নামে থাকতে হবে হালনাগাদ লাইসেন্স। রফতানি ফরমসহ যে পথে পণ্য রফতানি হয়েছে, সে পথের অন্য সব কাগজপত্র থাকতে হবে। রফতানির পণ্য জাহাজীকরণের বিষয়টি নিশ্চিত হতে হবে। রফতানির আদেশ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সুস্পষ্ট ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে এমন প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকিং চ্যানেলে রফতানির মূল্য দেশে আসার বিষয়টি নিশ্চিত হতে হবে। রফতানি সহায়তার অর্থ পেতে এসব কাগজপত্র দিয়ে পণ্য রফতানি ও এর মূল্য দেশে আসার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই রফতানির সহায়তার অর্থ ছাড় করা হবে বলে প্রজ্ঞাপনে জানায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।