আরেক দফায় বাড়তে যাচ্ছে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয়। পরামর্শক খাতে ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ বলছে, আপাতত পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদন সাপেক্ষে এ ব্যয় বাড়ানো যেতে পারে। পরে প্রকল্পের ডিপিপি সংশোধনের সময় তা সমন্বয় করে নেয়া যাবে। তবে প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির ঘটনাটি এখানেই থেমে থাকবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। রেলওয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ধীরগতিতে বাস্তবায়নের কারণে ভবিষ্যতে প্রকল্পটির নির্মাণ ব্যয় আরো বাড়তে পারে।

প্রকল্পটির মাধ্যমে ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে যশোর পর্যন্ত নতুন রেলপথ নির্মাণ করা হচ্ছে। শুরুতে প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা। তবে মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরুর আগেই এক দফা প্রকল্পটির নির্মাণ ব্যয় নিয়ে যাওয়া হয় ৩৯ হাজার ২৪৬ কোটি টাকায়। এখনো প্রকল্পের কাজ অর্ধেকও সম্পন্ন হয়নি। এরই মধ্যে পরামর্শক খাতে আরেক দফা ব্যয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ খাতে প্রস্তাবিত অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ ৪০৯ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কনস্ট্রাকশন সুপারভিশন কনসালট্যান্টের (সিএসসি) সঙ্গে রেলওয়ের চুক্তি আছে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সংশোধিত মেয়াদ ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত। এ অবস্থায় প্রকল্পের মেয়াদ সচল থাকা পর্যন্ত পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ।

পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আফজাল হোসেন সম্প্রতি পরামর্শক খাতে ৪০৯ কোটি ৫১ লাখ টাকা ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালককে চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে বলা হয়, ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্পটির সুষ্ঠু অগ্রগতির স্বার্থে প্রস্তাবটি সরকারি খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধন পদ্ধতি অনুসরণ করে পরিকল্পনা কমিশন থেকে অনুমোদিত হওয়া প্রয়োজন। চিঠিতে রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে জরুরি ভিত্তিতে প্রস্তাবটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানোর অনুরোধ জানিয়েছেন প্রকল্পের পরিচালক।

প্রকল্পের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরামর্শক খাতের অতিরিক্ত ব্যয় আপাতত প্রকল্পের টাকা থেকেই নির্বাহের প্রস্তাব করা হয়েছে। ভবিষ্যতে যখন প্রকল্পটির ডিপিপি সংশোধন (দ্বিতীয়) করা হবে, তখন এ ব্যয় সমন্বয় করা হবে।

পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের প্রজেক্ট স্টিয়ারিং কমিটির (পিএসসি) সভা সম্প্রতি রেল ভবনে অনুষ্ঠিত হয়। সভায় জানানো হয়, প্রকল্পের জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সিএসসি ও বাংলাদেশ রেলওয়ের মধ্যে চুক্তি হয় ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি। আর প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের জুলাইয়ে। সিএসসির সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ রয়েছে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। যদিও এরই মধ্যে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। বর্ধিত মেয়াদে প্রকল্পের সুষ্ঠু তদারকির জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোও অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

আরো জানানো হয়, কভিডের প্রাদুর্ভাবের পর দেশে এ পর্যন্ত দুই দফায় চলাচল ও সামাজিক বিধিনিষেধ আরোপিত ছিল। এর মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে প্রকল্পের কাজ চলমান থাকলেও অগ্রগতি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ছিল না। তাই নির্মাণকাজের জন্য সম্পাদিত চুক্তিপত্রের মেয়াদ বাড়ানো প্রয়োজন। নির্মাণ চুক্তি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তদারকি অব্যাহত রাখতে সিএসসির সঙ্গে চুক্তিরও মেয়াদ বৃদ্ধি প্রয়োজন।

প্রকল্পের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সিএসসির পক্ষ থেকে প্রথম আঠারো মাসেই সব নকশা জমা দিয়ে দেয়া হবে বলে শুরুতে ধরে নেয়া হয়েছিল। এজন্য মূল চুক্তিতে ডিজাইন রিভিউ টিমের জনবলও ছিল কম। কিন্তু বিভিন্ন পরিবর্তন ও সরকারি সিদ্ধান্তের সঙ্গে সমন্বয় সাধন করতে গিয়ে নকশা পরিবর্তনের কারণে কাজের পরিধি এবং ধরনও বদলেছে। তাই নতুন পদ সৃষ্টিসহ জনবল বাড়ানো প্রয়োজন।

পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের প্রাক্কলিত নির্মাণ ব্যয় ৩৯ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে পরামর্শক খাতে ব্যয় ধরা আছে ৯৪০ কোটি টাকা। তবে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি ও নতুন জনবলের কারণে খাতটিতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ১ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা। প্রস্তাব অনুযায়ী, পরামর্শক খাতে অতিরিক্ত ব্যয় হবে ৪০৯ কোটি টাকা।

পরামর্শক খাতের ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়ে জানতে চাইলে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আফজাল হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, প্রকল্পের মেয়াদ যেহেতু বেড়েছে, তাই পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি বাড়ানোর বিষয়টি জরুরি। এ বিষয়ে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আমাদের সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাব দিয়েছে। সেগুলো আমরা যাচাই-বাছাই করে দেখছি। এখনো কোনো কিছু চূড়ান্ত হয়নি। যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চুক্তি বাড়ানোর বিষয়টি অনুমোদন করা হবে।

প্রকল্পের কাজে মাঝপথে এসে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের বাড়তি জনবল কেন দরকার হচ্ছে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বিদেশী ও দেশী পরামর্শকদের নিয়ে সমন্বয় করে কাজ করার জন্যই বাড়তি জনবলের প্রয়োজন হচ্ছে।