রেল যোগাযোগের জন্য ব্রিটিশ আমলে কুড়িগ্রামের দুধকুমার নদের ওপর নির্মাণ করা হয় রেল সেতু। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ৩৬৬ মিটার দীর্ঘ সেতুটি আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে তা মেরামত করে পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী করা হয়। তবে ২০০১ সালেই এর নির্ধারিত আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যায়। এর পরও বছরের পর বছর ধরে সেটি দিয়ে যান চলাচল অব্যাহত রয়েছে। মূলত ২০১২ সালে সোনাহাট স্থলবন্দর চালু হওয়ার পর থেকে এ সেতু দিয়ে পণ্যবাহী ভারী যানবাহন চলাচল বহুগুণে বেড়ে যায়। যানবাহনের বাড়তি চাপের কারণে লোহার এ সেতুতে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা।

রোববার সকালেও সেতুর একটি পাটাতন ভেঙে পড়ে। এ সময় পণ্যবাহী একটি ট্রাক আটকে প্রায় ২৫ ঘণ্টা ধরে সেতুতে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ ছিল। গতকাল সকাল ৯টার দিকে পাটাতনটি মেরামতের পর পুনরায় যান চলাচল শুরু হয়।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সোনাহাট স্থলবন্দরের সঙ্গে দেশের একমাত্র সংযোগ সড়ক সোনাহাট রেল সেতু। বিকল্প আর কোনো রাস্তাও নেই। সেতু দিয়ে প্রতিদিন আমদানি করা পণ্যবাহী প্রায় ২০০-২৫০ ট্রাকসহ এক হাজারের বেশি ভারী ও হালকা যানবাহন চলাচল করে। গত ছয় মাসে ঝুঁকিপূর্ণ সেতুর পাটাতন ভেঙে ট্রাক আটকে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে অন্তত ১৭ বার। প্রতিবারই যান চলাচল বন্ধ থেকেছে ৬-৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত। জরাজীর্ণ সেতুটি শুধু বন্দরমুখী যানবাহন নয়, উপজেলার সীমান্তবর্তী ইউনিয়ন বঙ্গসোনাহাট, বলদিয়া, চর ভুরুঙ্গামারী, তিলাইসহ নাগেশ্বরী উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের মানুষের চলাচলের একমাত্র পথ এটি। ফলে এমন দুর্ঘটনায় দুর্ভোগে পড়ে এসব এলাকার মানুষ। সেতুটির ওপর একসঙ্গে দুই পাশ থেকে গাড়ি চলতে পারে না। এক পাশ দিয়ে গাড়ি চললে অন্য পাশের যানবাহন ও পথচারীদের ১০-১৫ মিনিট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এমনকি একটি ট্রাক আটকে গেলে পুরো এলাকা ঘণ্টার পর ঘণ্টা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

লালমনিরহাট বিভাগীয় রেলওয়ে পরিবহন কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ১৯৪৭ সালের আগে সোনাহাট এলাকায় ব্রিটিশরা রেল সেতুটি নির্মাণ করেন। পরে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে এটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। স্থানীয়দের ব্যবহারের জন্য সেতুটি একটি ফুটওভার ব্রিজ হিসেবে ব্যবহার হতে থাকে। পরে সড়ক ও জনপথ বিভাগ এর ওপর ডেক বসিয়ে যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়। তবে ২০০১ সালেই এর আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেছে।

অবশ্য বন্দর-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সড়কপথের উন্নয়ন না করেই ২০১২ সালে সোনাহাট স্থলবন্দর উদ্বোধন করা হয়। এ অবস্থায় বিকল্প না থাকায় দুধকুমার নদের ওপর নির্মিত রেল সেতু দিয়েই বন্দরে পণ্য পরিবহনের সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। বন্দরটি পুরোপুরি চালু হওয়ায় পুরনো সেতুটির ওপর বাড়তে থাকে পণ্যবোঝাই যানবাহনের চাপ।

সোনাহাট স্থলবন্দর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য আকমল হোসেন বলেন, ‘অনেক চালক ঝুঁকিপূর্ণ সেতু পার হতে চান না। এতে আমদানীকৃত পণ্য পরিবহনে সমস্যায় পড়ছি আমরা। নতুন সেতুর কাজ বিলম্বিত হওয়ায় ব্যবসা ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।’

সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বন্দরে পণ্য পরিবহনের জন্য ২০১৯ সালের দিকে কুড়িগ্রাম-সোনাহাট সড়ক উন্নয়ন ও পুরনো রেল সেতুর দক্ষিণে নতুন কংক্রিটের সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। সড়ক উন্নয়নের কাজ শেষ হলেও সেতুর কাজ বাকি রয়েছে। চার দফা সময় বাড়ানো হলেও শেষ হয়নি নতুন সেতুর নির্মাণকাজ। এ অবস্থায় জরাজীর্ণ সেতুটি জোড়াতালি দিয়ে যানবাহন চলাচল অব্যাহত রেখেছে সড়ক বিভাগ।

এ ব্যাপারে কুড়িগ্রাম সওজ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নজরুল ইসলাম জানান, দুধকুমার নদের ওপর ৬৪৫ মিটার দীর্ঘ একটি কংক্রিট সেতু নির্মাণের কাজ চলছে, যার ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪১ কোটি টাকা। ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা, নকশা পরিবর্তনসহ অন্যান্য কারণে সেতুটির নির্মাণকাজ বিলম্বিত হচ্ছে। তবে সব সমস্যা কাটিয়ে এ বছরের শেষ দিকে নতুন সেতু নির্মাণ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এটা হলে আগামী জুনের মধ্যে সেতুটি উদ্বোধন করা হবে। সে পর্যন্ত রেল সেতুর পাটাতন নিয়মিত মেরামতের মাধ্যমে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা হবে।