উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে রেল চলাচল নির্বিঘ্ন করতে যমুনা সেতুর ৩০০ মিটার উজানে রেলসেতু নির্মাণ করে সরকার। চলতি বছরের মার্চে সেতুটি উদ্বোধন করা হয়। এর পর থেকে যমুনা সেতুতে সংযুক্ত রেলপথের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়। এখন সেতুর রেলপথ অপসারণের কাজ শুরু হয়েছে। এতে সেতুর ওপর তৈরি সড়ক আরো প্রশস্ত হবে বলে জানিয়েছে সেতু কর্তৃপক্ষ। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে সেতুর পূর্ব টাঙ্গাইল অংশ থেকে এ কাজ শুরু করা হয়। তা শেষ হতে অন্তত দুই মাস সময় লাগবে বলে জানিয়েছে সেতু বিভাগ।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, যমুনা সেতু থেকে রেলওয়ে তাদের রেললাইন তুলে নিলে আরো সাড়ে তিন মিটার জায়গা বাড়বে। ওই অংশটুকু সেতুর মূল সড়কের সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে। এতে সেতুর উভয় লেনে ১ দশমিক ৭৫ মিটার করে জায়গা বাড়বে। সেতুর সড়ক প্রশস্তকরণের জন্য কারিগরি স্টাডির মাধ্যমে প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। এটি কার্যকর করতে কিছু সময় লাগবে। বর্তমানে সেতুর লেনগুলোর প্রশস্ততা রয়েছে ৬ দশমিক ৩ মিটার। এটি সম্প্রসারণ করা হলে প্রশস্ততা বেড়ে হবে ৮ মিটার। এতে সেতুর ওপরের যানজট ও জনদুর্ভোগ কমবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর এপ্রিলের শুরুর দিকে যমুনা সেতুর পরিত্যক্ত রেলপথটির অপসারণ চেয়ে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও সেতু বিভাগে দুটি চিঠি দেয়া হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে রেলপথ অপসারণের কাজ শুরু হয়। এ কাজ শেষ হলে সমুদয় মালামাল রেল কর্তৃপক্ষের কাছে বুঝিয়ে দেয়া হবে বলে জানিয়েছে সেতু বিভাগ।
ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, যমুনা নদীতে রেল সেতু চালু হওয়ায় পুরনো সেতুর রেলপথ এখন পরিত্যক্ত। এজন্য সেতুর সড়ক প্রশস্ত করতে রেলপথটি অপসারণ করা প্রয়োজন। কারণ সেতুর এক লেন সড়কের মাপ সর্বনিম্ন ৭ দশমিক ৩ মিটার। সেখানে লেন রয়েছে ৬ দশমিক ৩ মিটার। ঈদ মৌসুমে গাড়ির চাপ বাড়লে সেতুতে যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রী ও চালকরা। অথচ সেতুর প্রশস্ত অংশে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে সাড়ে তিন মিটার। এটি অপসারণ করা হলে সেতুর লেন দুটি আরো প্রশস্ত করা সম্ভব হবে।
গতকাল সকালে যমুনা সেতু সাইড অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসানুল কবীর পাভেল জানান, যমুনা সেতুর ৩০০ মিটার উজানে রেল সেতু নির্মিত হওয়ায় রেলপথের প্রয়োজন ফুরিয়েছে। সেতুর প্রশস্ততা বাড়াতে পরিত্যক্ত রেলপথ অপসারণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দেয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের অনুমতিতে রেলপথ অপসারণের কাজ শুরু করেছে সেতু বিভাগ।
সেতু কর্তৃপক্ষ বলছে, ১৯৯৮ সালের ২৩ জুন যমুনা নদীতে সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের মধ্যে ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ যমুনা সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হয়। ওই দিনই আনুষ্ঠানিকভাবে যানবাহন চলাচল শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে যমুনা সেতুতে রেল সংযোগের দাবিতে তৎকালীন যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীন রেল বিভাগ আন্দোলন করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার তাৎক্ষণিকভাবে যমুনা সেতুতে রেললাইন স্থাপনের ঘোষণা দেয়। সড়ক সেতুর উত্তর পাশ দিয়ে লোহার অ্যাঙ্গেল দিয়ে তৈরি করা হয় রেল সেতু। ২০০৪ সালের ১৫ আগস্ট যমুনা সেতুতে আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। তবে দ্রুতগতিতে ট্রেন চলাচলের কারণে ২০০৬ সালে সেতুতে ফাটল দেখা দেয়। পরে ট্রেন চলাচলের গতিসীমা করা হয় ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটার। এতে ট্রেন সেতু পার হতে ২২ মিনিট সময় লাগে। এ কারণে সেতুর দুই প্রান্তে ট্রেনের জট বেঁধে যায়। এসব সমস্যার কথা বিবেচনা করে ২০২০ সালে যমুনা সেতুর ৩০০ মিটার উজানে রেলসেতু নির্মাণের পরিকল্পনা নেয় সরকার। জাইকার অর্থায়নে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় ডুয়াল গেজ ডাবল লাইনের রেলসেতু। গত ১৮ মার্চ থেকে রেলসেতুতে ট্রেন চলাচল শুরু হলে পুরনো যমুনা সেতুর রেললাইন সরিয়ে ফেলার পরিকল্পনা নেয় সেতু বিভাগ।
যমুনা রেলসেতু প্রকল্প পরিচালক আল ফাত্তাহ মো. মাসুদুর রহমান বলেন, ‘সেতু বিভাগ রেললাইন খুলে ফেলার কাজ শুরু করেছে। রেললাইন খুলে ফেলার কাজ শেষ হলে সমুদয় মালামাল রেল কর্তৃপক্ষের কাছে বুঝিয়ে দেয়া হবে। সড়ক সেতু বর্ধিত করার জন্যই রেললাইন সরিয়ে ফেলা হচ্ছে।’










