চাঁদপুর মূলত নদী উপকূলীয় শহর। এর দুই অংশের মাঝ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে ডাকাতিয়া নদী। পশ্চিম অংশে মেঘনা ও পদ্মার মিলনস্থল। উজানের ঢলে বেড়েছে ডাকাতিয়া ও মেঘনার পানি। প্রচণ্ড স্রোতে দুটি নদীরই তীরবর্তী স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে সদর উপজেলার তরপুরচণ্ডী ইউনিয়নের আনন্দবাজার জেলেপল্লী, ফসলি জমি, বসতঘর, বেশকিছু স্থাপনা বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে শহর রক্ষা বাঁধসহ শতাধিক স্থাপনা।
নদীর তীরবর্তী অঞ্চলের বাসিন্দারা বলছেন, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে দুটি নদীর তীরে ভাঙন দেখা দেয়। তবে ভাঙন রোধে তেমন কাজ হয়নি। বাঁধের জিও ব্যাগগুলো ডেবে যাচ্ছে। ভাঙনের মুখে রয়েছে বহু ঘরবাড়ি। তারা নিজ উদ্যোগে বালির বস্তা ফেলছেন। ভাঙন আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটছে তাদের।
চাঁদপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি সুভাষ চন্দ্র রায় বলেন, ‘আমাদের মনে হচ্ছে এবার হয়তো শেষ রক্ষা হবে না। কারণ বড়স্টেশন মোলহেডের যে নড়বড়ে অবস্থা, সেটি তলিয়ে গেলে ব্যবসা কেন্দ্রসহ পুরান বাজারও চোখের পলকে বিলীন হয়ে যাবে। পুরান বাজারের অন্তত ৪০-৫০টি শিল্পসহ দুই শতাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। আর্থিকভাবে অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতিসহ হাজার হাজার পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাবে। এ বিষয়ে এখনই স্থায়ী ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।’
চাঁদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, শহরের নতুন বাজার অংশে বড়স্টেশন মাদ্রাসা রোড থেকে মোলহেডের পুরান লঞ্চঘাট পর্যন্ত এলাকা সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতিদিন মেঘনা পদ্মা ও ডাকাতিয়াসহ তিন নদীর ঘূর্ণি স্রোতে ব্লক বাঁধ ও পাথর নদীর তলদেশে তলিয়ে যাচ্ছে। একই অবস্থা পুরান বাজার অংশের উত্তর মাথায় ডাকাতিয়ার তীর থেকে হরিসভা পর্যন্ত।
পাউবো কর্মকর্তারা বলছেন, ২০১৯ সালে পাউবো থেকে ৪৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হয়। তবে প্রকল্পটি আজও অনুমোদন হয়নি। এর মধ্যে শহরের দুই অংশে নদীর পাড় আরো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এর কারণ ও করণীয় নিয়ে জরিপ করেছে বিশেষজ্ঞ দল। তারা শহর রক্ষায় নতুন করে ৩ হাজার কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্প জমা দেন। কিন্তু ২০১৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত কোনো প্রকল্পই পাস হয়নি। এমনকি রক্ষণাবেক্ষণ বা মেরামতের জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়নি। তবে মাঝেমধ্যে পাউবো কিছু থোক বরাদ্দ দিয়ে থাকে। সেখান থেকে এসব ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে কিছু বালির বস্তা ফেলে সাময়িক ভাঙন প্রতিরোধ করে যাচ্ছেন তারা।
এ ব্যাপারে চাঁদপুর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী এসএম রেফাত জামিল বলেন, ‘আমরা বড়স্টেশন মোলহেডসহ শহর রক্ষা ও তীর রক্ষায় ১৯৭২ সাল থেকে ১৬৪ কোটি ৩০ লাখ ৯০ হাজার টাকা ব্যয় করেছি। এর মধ্যে ২০০৮ সাল থেকে ব্যয় হয়েছে ২৪ কোটি ৯০ হাজার টাকা। এসব স্থাপনা ছাড়াও রেলস্টেশনসংলগ্ন ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে বিআইডব্লিউটিসির স্টিমার ঘাট, ইলিশ অবতরণ কেন্দ্রসহ বেশকিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শত শত ঘরবাড়ি এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এছাড়া পুরান বাজারের দক্ষিণাংশে মেঘনার পাড়েই লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়নে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জায়গা নির্ধারণ করে কাজ শুরু করা হয়। কিন্তু নদীভাঙনের বিষয়টি সংশ্লিষ্টরা মাথায় রাখছেন না।’
অন্যদিকে ডাকাতিয়া নদীর তীরেও ভাঙন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে সদর উপজেলার মৈশাদী ইউনিয়নের মৈশাদী গ্রামে ভাঙন বেশি দেখা দিয়েছে। এছাড়া শহরসংলগ্ন উত্তর গুনরাজদী এলাকাও ভাঙনের মুখে রয়েছে।
নদীপাড়ের বাসিন্দারা বলছেন, প্রতি বছর নদী একটু একটু করে জমি ভেঙে নিয়ে যায়। স্থানীয় চেয়ারম্যান মেম্বারসহ সবাই শুধু আশ্বাস দিয়ে যান। কিন্তু ভাঙন রোধে কাজ হয় না। নদী থেকে প্রায় ১০০ মিটার দূরত্বে রয়েছে রেলস্টেশন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজারসহ অসংখ্য ঘরবাড়ি। নদীভাঙন রোধ না হলে হুমকির মুখে পড়বে এসব প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা।
মৈশাদী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম পাটওয়ারী বলেন, ‘ডাকাতিয়া নদীর ভাঙনের বিষয়টি বহুবার কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। শহরসংলগ্ন উত্তর গুনরাজদী এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। এ স্থান দিয়ে শহরে বের হওয়ার জন্য একটি সড়ক রয়েছে। সড়কের পাশে বৈদ্যুতিক খুঁটি রয়েছে। যেকোনো সময় এগুলো বিলীন হয়ে যেতে পারে।’
এদিকে জেলা প্রশাসক মো. মোহসিন উদ্দিন সদর উপজেলার আনন্দ বাজার, কাশেম বাজারের নদীভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, ‘ভাঙন রোধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব না হলেও শুষ্ক মৌসুমে স্থায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’










