গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার চর দুর্লভখা গ্রামের দরিদ্র কৃষক মো. আব্দুস সামাদের ছেলে জাকির হোসেন। দীর্ঘদিন পোশাক কারখানায় চাকরি করেছেন। সে অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে কয়েকজন বন্ধু মিলে শুরু করেছিলেন পোশাক তৈরির ব্যবসা। সদর উপজেলার মির্জাপুরের ভীমবাজারে গড়ে তোলেন ছোট একটি কারখানা। এ কারখানা ঘিরে স্বপ্ন ছিল একদিন বড় ব্যবসায়ী হবেন।

১৯ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সারা দেশের মতো গাজীপুরও ছিল উত্তাল। দুপুরে কারখানার জন্য কোনাবাড়ি থেকে জরুরি কিছু মালপত্র কেনেন জাকির হোসেন। এমন সময় একজন বায়ারের ফোন আসে। তার সঙ্গেই দেখা করতে উত্তরায় যাচ্ছিলেন। আব্দুল্লাহপুরে গিয়ে অন্য গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলেন। সংঘর্ষের খবর জানতে পেরে মা মোমেনা বেগম ফোন করে সতর্ক করছিলেন জাকিরকে। হঠাৎ করেই পুলিশ ও ছাত্র-জনতার ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুলি ছোড়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পর পর দুটি গুলি এসে পিঠে ও পেটে লাগলে মাটিতে পড়ে যান জাকির হোসেন। সেখান থেকে হাসপাতালে নেয়া হলে ১৪ ঘণ্টা পর মারা যান তরুণ এ উদ্যোক্তা।

সন্তানকে হারিয়ে বাবা-মা এখন দিশেহারা। আব্দুর রহমান (৬) ও বায়জিদ (২) নামে দুটি ছেলে রয়েছে জাকিরের। স্বামীকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ স্ত্রী জান্নাতুন নাঈম। হত্যার বিচারও দাবি করেছেন।

জাকির হোসেনের মা মোমেনা বেগম বলেন, ‘১৯ জুলাই সকাল থেকেই মনটা খুব খারাপ লাগছিল। চারদিকে নানা ধরনের গুজব আর গণ্ডগোলের খবর শুনছিলাম। গাজীপুরে পুলিশের সঙ্গে ছাত্রদের সংঘর্ষ ও আতঙ্কের খবর বলছিল কেউ কেউ। এজন্য জাকিরকে ফোন করেছিলাম। তাকে সাবধানে থাকার জন্য বলছিলাম, কিন্তু সে আমার সঙ্গে কথা বলতে বলতেই গুলিবিদ্ধ হয়। মুহূর্তের মধ্যে ফোনে কথা বলা বন্ধ হয়ে যায়। একজন মা হিসেবে সে মুহূর্তের কথা মনে হলে আমি আর ঠিক থাকতে পারি না।’

জাকিরের স্ত্রী জান্নাতুন নাঈম বলেন, ‘জাকির ১৯ জুলাই সকালের খাবার খেয়ে বাসা থেকে বের হয় অফিসের কথা বলে। সারা দিন অফিসে থাকবে বলে জানিয়েছিল। সারা দিন আর তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ হয়নি। বিকাল ৫টার দিকে তার অফিসের কয়েকজন বাসায় আসেন। তাদের কাছেই প্রথম জানতে পেরেছি জাকির গুলিবিদ্ধ হয়েছে। পরে উত্তরার হাসপাতালে ছুটে গেলেও স্বামীকে আর বাঁচাতে পারিনি। জাকিরের স্বপ্ন ছিল নতুন এ কারখানা ঘিরে।’