দেশে বেসরকারি খাতে উচ্চশিক্ষার যাত্রা ১৯৯২ সালে। তিন দশকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৮-এ। সংখ্যার এ উল্লম্ফনের সঙ্গে বেসরকারি খাতে উচ্চশিক্ষার গুণগত মানের বিস্তর ফারাক দেখা যাচ্ছে। গবেষণা ও গ্রন্থাগার উন্নয়নের মতো উচ্চশিক্ষার মৌলিক বিষয়গুলো থাকছে একদমই অবহেলিত। ন্যূনতম অবকাঠামো ও শিক্ষক নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে সিংহভাগ বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ধারাবাহিকের আজ প্রথম পর্ব
গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞানের সৃষ্টি ও তা বিতরণ—উচ্চশিক্ষার লক্ষ্য বর্ণনা করতে গিয়ে মোটাদাগে এ দুটি বিষয়কেই চিহ্নিত করে থাকেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ লক্ষ্য থেকে বেশ দূরে। সামনের সারির হাতে গোনা আট-দশটি ছাড়া বাকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা কার্যক্রমের চিত্র খুবই নাজুক। এমনকি গবেষণা খাতে কোনো অর্থ ব্যয় না করা বা বরাদ্দ না রাখা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাও কম নয়। সর্বোপরি গবেষণাকে অবহেলিত রেখে অনেকটা পাঠদাননির্ভর হয়ে পড়েছে দেশের বেসরকারি খাতের উচ্চশিক্ষা।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমের তথ্য সংগ্রহ করে বার্ষিক প্রতিবেদনে তা প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। কমিশন প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য মতে, ২০২০ সালে দেশে অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ১০৪টি। এর মধ্যে শিক্ষা কার্যক্রম চালু ছিল ৯৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ওই শিক্ষাবর্ষে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় থাকা ৯৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৫১টিতেই কোনো ধরনের গবেষণা প্রকল্প চলমান ছিল না। অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানই গবেষণা কার্যক্রমের বাইরে। এছাড়া গবেষণা খাতে একটি টাকাও ব্যয় করেনি ওই শিক্ষাবর্ষে এমন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ১৭।
দেশে বেসরকারি খাতের উচ্চশিক্ষার প্রচলন হয় ১৯৯২ সালে। এর তিন দশক পরে এসেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এমন বেহাল চিত্র হতাশাজনক বলছেন উচ্চশিক্ষা-সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ চন্দ বণিক বার্তাকে বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হয় না—গড়পড়তায় এমন কথা বলা যাবে না। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রমের চিত্র খুবই প্রশংসনীয়। গবেষণার জন্য বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পাচ্ছে অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার হাল সন্তোষজনক নয়। গবেষণা তো দূরের কথা শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আরো অনেক মৌলিক সুবিধা থেকেও বঞ্চিত করছে বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয়।
২০২০ সালে গবেষণা খাতে কোনো অর্থই ব্যয় করেনি—এমন বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় রয়েছে সেন্ট্রাল উইমেন’স ইউনিভার্সিটি; দি পিপল’স ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ; প্রাইমএশিয়া ইউনিভার্সিটি; বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়; ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ; জেডএইচ সিকদার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়; ব্রিটানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়; নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; রণদা প্রসাদ সাহা বিশ্ববিদ্যালয়; দি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব স্কলার্স; রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়; সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি; আনোয়ার খান মডার্ন ইউনিভার্সিটি; জেডএনআরএফ ইউনিভার্সিটি অব ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সেস; বান্দরবান বিশ্ববিদ্যালয়; ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড ইউনিভার্সিটি; ইউনিভার্সিটি অব ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ইউনিভার্সিটি অব স্কিল এনরিচমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি।
এছাড়া অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই গবেষণা বরাদ্দ থাকলেও কোনো ধরনের গবেষণা প্রকল্প পরিচালিত হয়নি। এমন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় রয়েছে ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি। ইউজিসির সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ২০২০ সালে শিক্ষার্থী ছিল ২ হাজার ৬৪৪ জন। আর শিক্ষক ছিলেন ১৫২ জন। এ সংখ্যক শিক্ষক-শিক্ষার্থীর বিপরীতে ওই শিক্ষাবর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়টির গবেষণা ব্যয়ের পরিমাণ ছিল মাত্র ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা। এছাড়া ওই বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো গবেষণা প্রকল্প পরিচালিত হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অধ্যাপক ড. শহীদ আকতার হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, প্রথমত, আমাদের দেশের বেসরকারি খাতের উচ্চশিক্ষা অনেকটাই আন্ডারগ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামনির্ভর। আন্ডারগ্র্যাডে শিক্ষার্থীরা কোর্স নিয়েই ব্যস্ত থাকে। গবেষণার সুযোগ পায় না। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয় মূলত পোস্টগ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামগুলোকে কেন্দ্র করে। যদিও আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মাস্টার্সে শিক্ষার্থী খুবই কম। আর পিএইচডির তো অনুমোদনই নেই। এজন্য যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাপাসিটি রয়েছে তাদের পিএইচডিসহ উচ্চতর প্রোগ্রাম পরিচালনার অনুমোদন দেয়া প্রয়োজন।
তিনি আরো বলেন, দেশে মানসম্মত গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা রয়েছে গুটি কয়েক বিশ্ববিদ্যালয়ের। যেসব বিশ্ববিদ্যালয় মাস শেষে শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে হিমশিম খায়, তাদের জন্য তো গবেষণা বিলাসিতার বিষয়। আবার গবেষণা খাতে অর্থ বরাদ্দ থাকলেও অনেক সময় শিক্ষকদের অনীহার কারণে সেটি হয়ে ওঠে না।
উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গবেষণা কার্যক্রম মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সিমাগো-স্কপাসের সূচক বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। প্রতিষ্ঠানটির ২০২২ সালের র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের ৩৪টি উচ্চশিক্ষালয় জায়গা পেয়েছে। এর মধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা মাত্র ১২টি। যদিও দেশে অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১০৮। সিমাগো ইনস্টিটিউশনস র্যাংকিংয়ে (এসআইআর) জায়গা পাওয়া ১২টি বিশ্ববিদ্যালয় হলো—সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি; ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি; দি ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক; ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস, এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি; নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি; ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি; ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ; আহসানউল্লাহ ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি; ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি, চিটাগং ও আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রম বিষয়ে জানতে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আতিকুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, পাবলিক-প্রাইভেট আলাদা না করে গোটা উচ্চশিক্ষা খাতের দিকে তাকালে দেখা যাবে, আসলে দেশে এখনো মানসম্মত গবেষণার সংস্কৃতি ও পরিবেশ গড়ে ওঠেনি। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানেই গবেষণার ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা অনুপস্থিত। আবার কোথাও কোথাও সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষকদের অনাগ্রহে গবেষণা কার্যক্রম হয়ে উঠছে না। তবে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে নর্থ সাউথ গবেষণা খাতকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। আমাদের আন্তর্জাতিক মানের অনেক ল্যাব রয়েছে। অনেক নোবেল বিজয়ী গবেষক এসে আমাদের ল্যাবের প্রশংসা করেছেন। আমাদের পিএইচডি প্রোগ্রাম পরিচালনার সব সক্ষমতা রয়েছে। সরকার আমাদের পিএইচডি প্রোগ্রাম পরিচালনার অনুমোদন দিলে দেশের গবেষণা খাতে আরো বেশি অবদান রাখতে পারবে নর্থ সাউথ।










