সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার সীমান্ত নদী রাংপানি। তীরবর্তী গ্রাম আসামপাড়ার বাসিন্দাদের একমাত্র পানির উৎস এ নদী। নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও সেখান থেকে অবৈধভাবে বালি-পাথর আহরণ করছে ‘বাংলাবাজার বালু পাথর ব্যবসায়ী সমিতি’
নামে একটি সংগঠন। স্থানীয়দের অভিযোগ, এর ফলে নদীর পাড়ে ভাঙন শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে বিলীন হয়েছে অনেক ফসলি জমি। বারবার জানানোর পরও ব্যবস্থা নিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ। এছাড়া ইজারা ছাড়াই বালি উত্তোলন করায় বড় অংকের রাজস্ববঞ্চিত হচ্ছে সরকার।
পরিবেশ ধ্বংস ও ব্যাপক প্রাণহানির কারণে ২০১৬ সালে সিলেটের কোয়ারি থেকে পাথর উত্তোলন নিষিদ্ধ করে খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। স্থানীয় পাথর ব্যবসায়ীরা অবশ্য বলছেন, কোয়ারিগুলো বন্ধ থাকায় এ এলাকার কয়েক লাখ লোক বেকার হয়ে পড়েছে। তাই আবারো পাথর তোলার অনুমতি দেয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন তারা। যদিও পাথর উত্তোলন বন্ধ নেই। অবৈধভাবেই নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে সে কাজ করে যাচ্ছে প্রভাবশালী চক্র।
সরজমিনে দেখা গেছে, রাংপানির ৪ নম্বর বাংলাবাজার ব্রিজসংলগ্ন এলাকা থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার পর্যন্ত নদীতে বালি-পাথর আহরণে ব্যস্ত সহস্রাধিক শ্রমিক। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে তাদের এ কাজ। পরে বিক্রির জন্য পাথর ও বালি তারা বারকী নৌকায় করে আসামপাড়া, ৪ নম্বর বাংলাবাজার, আদর্শগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিতভাবে বালি-পাথর উত্তোলনের ফলে সেখানকার ফসলি জমি ধীরে ধীরে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
আসামপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল লতিফ জানান, নদীতীরবর্তী লোকজনের একমাত্র পানির উৎস রাংপানি। সীমান্ত এ নদীতে আসামপাড়া এলাকার প্রায় দুই সহস্রাধিক বাসিন্দা গোসলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজ সারে। তিনি অভিযোগ করেন, ‘পুরুষদের পাশাপাশি আমাদের নারীদেরও গোসল সারতে হয় এ নদীর পানি দিয়েই, কিন্তু শ্রমিকরা এ সময় মেয়েদের উত্ত্যক্ত করে। সবচেয়ে ভংয়কর বিষয় হচ্ছে ধীরে ধীরে নদী ভাঙন শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে অনেক জমি বিলীন হয়ে গেছে। বার বার অভিযোগ করার পরও কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিচ্ছে না।’
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রহিম বলেন, ‘অবৈধভাবে যে বালি-পাথর উত্তোলন হচ্ছে, উপজেলা প্রশাসনের সবাই জানে। কিন্তু কেউ বাধা দেয় না। আমরা প্রতিবাদ করে উল্টো হুমকি-ধামকির শিকার হচ্ছি।’
রুহুল আমিন নামে আরেকজন বলেন, ‘সম্পূর্ণ অবৈধভাবে ইজারা ছাড়াই রাংপানি নদী থেকে বালি-পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। আর এর সঙ্গে যারা জড়িত তারা সবাই ৪ নম্বর বাংলাবাজার বালি পাথর ব্যবসায়ী সমিতির সদস্য। তাই তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সবাই ভয় পায়। তাছাড়া অবৈধপন্থায় বালি-পাথর উত্তোলনের ফলে আমাদের ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পাশাপাশি সরকারও প্রচুর টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাবাজার বালু পাথর ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. রফিক আহমদ বলেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের কাছ থেকে ইজারা নিয়েই নদী থেকে বালু-পাথর উত্তোলন করছে শ্রমিকরা। তবে গ্রামবাসী তাদের সমস্যার বিষয়টি আমাদের জানালে শ্রমিকদের সতর্ক করে দেয়া হয়েছে।’
নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বালি-পাথর উত্তোলন করা তো অবৈধ—এ দৃষ্টি আকর্ষণ করলে রফিক আহমদ বলেন, ‘ইউপি চেয়ারম্যান তার নিজের লোক দিয়ে ট্যাক্স আদায় করছেন। যদি অবৈধ হয় তাহলে তিনি কীভাবে এ ট্যাক্স নিচ্ছেন?’
জৈন্তাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফখরুল ইসলাম অবশ্য রাংপানি নদী ইজারা দেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ নদীকে (রাংপানি) ইউনিয়ন পরিষদের ইজারা দেয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। তবে ৪নং বাংলাবাজার এলাকায় বালি-পাথর পরিবহন করার কারণে ইউনিয়ন পরিষদ বৈধভাবে ভাসমান ট্যাক্স আদায় করছে।’
নদীতীরবর্তী ফসলি জমি বিলীন হয়ে যাওয়ার বিষয়ে তিনি গ্রামবাসীকে আইনি আশ্রয় নেয়ার পরামর্শ দেন।
জৈন্তাপুরের সহকারী কমিশনার (এসিল্যান্ড) রিপামনি দেবী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমার জানা মতে রাংপানি নদীসহ ওই অংশের কোনো নদীতেই ইজারা নেই। এর পরও বালি-পাথর উত্তোলনের সঙ্গে কারা জড়িত এ বিষয়ে খোঁজ নেয়া হচ্ছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।’










