চারশ বছরের ঢাকার গোড়াপত্তন হয় বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে। একটা সময় এ বুড়িগঙ্গা ছিল ঢাকার বাণিজ্য ও যোগাযোগের প্রধান রুট। নব্বইয়ের দশকেও বুড়িগঙ্গার কোনো কোনো অংশের পানি পানযোগ্য ছিল। ক্রমবর্ধমান শিল্পায়নের প্রভাবে বুড়িগঙ্গা এখন কালো পানি আর উৎকট গন্ধের নদীতে রূপ নিয়েছে। বুড়িগঙ্গাকেন্দ্রিক বাণিজ্য ও নৌ যোগাযোগ এখনো ধুঁকে ধুঁকে টিকে থাকলেও আবেদন হারিয়েছে ঢাকাবাসীর পর্যটন আবেদন থেকে।

রাজধানী পোস্তগোলার বাসিন্দা হাসান ইমাম। অন্যবারের মতো এবারো ঈদের দিন বিকালে মিলব্যারাক বুড়িগঙ্গার তীরে ঘুরতে বেরিয়েছেন সপরিবারে। কালো ময়লা পানি আর বিকট দুর্গন্ধে বেশিক্ষণ থাকতে পারেননি নদীর পাড়ে। তিনি বলেন, ‘যখন বুড়িগঙ্গার পানি ভালো ছিল, তখন ঈদের দিন ও আগে-পরে কয়েকদিন এখানেই ঘুরতে আসতাম। বিনোদনের কেন্দ্র ছিল নদীর পাড়। শত শত মানুষ এখানে এসে সময় কাটাত। নদী নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর এখন এখানে মানুষ এসে বেশিক্ষণ বসতে পারে না।

আগারগাঁও, মোহাম্মদপুর, উত্তরা, টঙ্গীর মানুষের জন্য অন্যতম পর্যটন আর্কষণ ছিল তুরাগ তীর। ঈদ ও অন্যান্য ছুটির দিন মানুষ নদীতীরে এসে সময় কাটাত। মাঝিরা ভিড় জমাতেন যাত্রীর আশায়। এ নদীটিও এখন আবেদন হারিয়েছে ঢাকার মানুষের কাছে। দূষণ আর শিল্পবর্জ্যে তুরাগ নদ মৃতপ্রায়। কোথাও কোথাও তো নৌকা চলাচলেরও সুযোগ নেই।’

রাজধানী আগারগাঁওয়ের বাসিন্দা মোহাম্মদ এজাজ। তিনি রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) চেয়ারম্যান। তিন দশকের বেশি সময় কাজ করছেন নদী নিয়ে। ঈদের ছুটিতে ঢাকার মানুষজন নদীপাড়ে ছুটে যেতেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ঢাকার চারপাশটাই নদী দিয়ে ঘেরা। আমাদের এদিকে তুরাগ নদ। পুরান ঢাকার দিকে বুড়িগঙ্গা, ডেমরা-চিটাগাং রোডের দিকে রয়েছে বালু ও শীতলক্ষ্যা নদী। এক দশক আগেও ঢাকার নদীগুলো অনেকটা জীবন্ত ছিল। তুরাগ নদে তো এখনো জেলে সম্প্রদায়ের বসবাস রয়েছে। আমরা ঈদের দিন বিকালে তুরাগপাড়ে ঘুরতে বের হতাম।’

মোহাম্মদ এজাজ বলেন, ‘ধীরে ধীরে নদীর পানি দূষিত হয়ে পড়ায় মানুষ এখন নদীপাড়ে যাচ্ছে না। পাশাপাশি নদীর জমি ক্রমেই বেদখল হচ্ছে। এ কারণেও ঢাকার মানুষ নদী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।’

ডেমরা-যাত্রাবাড়ী, চিটাগং রোড, বাড্ডা-খিলক্ষেত এলাকার মানুষের কাছে বালু নদ ও শীতলক্ষ্যা ছিল বেড়ানোর জায়গা। যদিও কিছু এলাকায় এখনো মানুষ নদীপাড়ে বেড়াতে যায়, কিন্তু এ দুটি নদীও এখন আর নেই আগের অবস্থানে। দূষণ ও ঢাকাবাসীর পয়োবর্জ্যে অন্যান্য নদীর মতো এ দুই নদীও আকর্ষণ হারিয়েছে পর্যটকদের।

নদীর পানি দূষিত হওয়ায় পর্যটন কেন্দ্রিক আবেদন হারানোর বিষয়ে জানতে চাইলে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মোস্তফা কামাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নদীর পানি আবার আগের মতো স্বচ্ছ রূপে ফিরিয়ে আনার জন্য বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে একটি প্রজেক্টের কাজ চলমান রয়েছে। আগে নদী নিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে কাজ হতো। এখন সমন্বিতভাবে কাজ চলছে। এ প্রজেক্টকে বলা হচ্ছে আমব্রেলা প্রজেক্ট। এ প্রজেক্ট বাস্তবায়ন হলে ঢাকার নদীগুলো আবার স্বচ্ছসলিল প্রবহমান নদীর রূপ ফিরে পাবে।’