শীতের শুরুতেই যশোরে দেখা দিয়েছে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহসহ শীতজনিত রোগের প্রকোপ। যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ২৪ শয্যার বিপরীতে ভর্তি রয়েছে ৫৫টি শিশু। গতকাল বহির্বিভাগেই চিকিৎসা নিয়েছে আরো তিন শতাধিক শিশু। এছাড়া শিশু হাসপাতালের ৫০ শয্যার প্রতিটিতেই রোগী ভর্তি রয়েছে। একই দিন হাসপাতালের বহির্বিভাগে সেবা নিয়েছে তিন শতাধিক শিশু। হঠাৎ করে রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় অনেকে মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছে। এতে হাসপাতাল দুটির চিকিৎসাসেবা অনেকটা ব্যাহত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, শীতের এ সময়টায় ঠাণ্ডাজনিত সমস্যাগুলোই বেশি দেখা যায়। যেমন কাশি, অ্যাজমার প্রকোপ বেড়ে যাওয়া, সাময়িক জ্বর, কোল্ড অ্যালার্জি হয়ে থাকে। এ সময় বাতাসে ধুলোবালি বেশি থাকায় অনেকের অ্যালার্জি বা শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা দেখা যায়। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্ক মানুষের কাশি, কোল্ড অ্যালার্জির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। ঠিক সময় শনাক্ত করা না গেলে সেটা অনেক সময় নিউমোনিয়ায়ও রূপ নিতে পারে। হঠাৎ করে ঠাণ্ডার কারণে শিশুদের, অনেক সময় বড়দেরও ডায়রিয়া হতে দেখা যায়। বিশেষ করে যখন বেশি ঠাণ্ডা পড়ে, তখন বয়স্কদেরও পাতলা পায়খানা হতে পারে। তবে জনবল ও অবকাঠামো সংকট থাকলেও চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রয়েছে।
ঠাণ্ডা ও শ্বাসকষ্টে ভুগছে যশোর শহরের বারান্দিপাড়ার নজরুল ইসলামের দুই বছর বয়সী ছেলে রূপম। তাকে নিয়ে গতকাল যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছে।
শিশুটির বাবা জানান, চার-পাঁচদিন ধরে শ্বাসকষ্টে ভুগছে ছেলেটি। ডাক্তার দেখানো হয়েছে। তবে সুস্থ হচ্ছে না। গতকাল সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এখানে অনেক ভিড়। কোনো বেড খালি নেই।
গতকাল যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা গেছে, ২৪ শয্যার বিপরীতে সেখানে চিকিৎসা নিচ্ছে ৫৫টি শিশু। এদিন বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছে আরো তিন শতাধিক শিশু।
একই সময় যশোর শিশু হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, ৫০ শয্যার প্রতিটিতেই রোগী ভর্তি রয়েছে। তবে হাসপাতালটিতে সিট বাদে কাউকে ভর্তি করা হয় না। গতকাল হাসপাতালের বহির্বিভাগে সেবা নিয়েছে তিন শতাধিক শিশুর।
যশোর জেনারেল হাসপাতালের বহির্বিভাগে ছেলের চিকিৎসা নিতে আসা বাঘারপাড়া উপজেলার ধলগ্রামের জসিম উদ্দিন বলেন, ‘ছেলেটি এক সপ্তাহ ধরে জ্বরে আক্রান্ত। চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ খাওয়াচ্ছি, কিন্তু সুস্থ হচ্ছে না। রাতে জ্বর আসছে। সরকারি হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বসবে শুনে এসেছি। এখানে রোগীর ভিড় অনেক। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলাম।’
সদর উপজেলার ফতেপুর এলাকার শাহিদা খাতুন বলেন, ‘আমার তিন বছর বয়সী ছেলের ঠাণ্ডা লেগেছে। দুদিন ধরে খুব কষ্ট পাচ্ছে। অল্প টাকায় ভালো ডাক্তার দেখানোর জন্য এখানে এসেছি।’
ঝিকরগাছার ছুটিপুর এলাকার বাসিন্দা আকলিমা খাতুন বলেন, ‘সর্দি, কাশিতে দুই মাস বয়সী নাতনি খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েছে। প্রথমে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে ভর্তি করেছিলাম। সেখানে সুস্থ না হওয়ায় চারদিন আগে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করেছি। এখন নাতনি অনেকটা সুস্থ।’
যশোর সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের সিনিয়র স্টাফ নার্স সালমা খাতুন বলেন, ‘জনবলের তুলনায় রোগীর চাপ বেশি। সেবা দিতে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। রোগী বেশি হওয়ায় মেঝেতে রেখেও চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।’
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন সাফায়েত বলেন, ‘শীত বাড়ছে। সেই সঙ্গে ঠাণ্ডাজনিত রোগীও বাড়ছে। শিশু ওয়ার্ডে ২৪ শয্যার বিপরীতে তিন-চার গুণ বেশি রোগীকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। জনবল ও অবকাঠামো সংকট থাকলেও সেবা অব্যাহত রয়েছে।’
যশোর শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন চার মাস বয়সী এক শিশুর বাবা নজরুল ইসলাম মুকুল বলেন, ‘জন্মের সময় শিশুটির ওজন কম ছিল। তাকে অনেক দিন এনআইসিইউতে রাখতে হয়েছিল। চারদিন হলো ঠাণ্ডাজনিত সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করেছি। এখানকার পরিবেশ ও চিকিৎসা ভালো। শিশু সুস্থতার দিকেই যাচ্ছে।’
যশোর শিশু হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. সৈয়দ নূর-ই-হামীম বলেন, ‘শীতে ঠাণ্ডা, কাশি, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগী বাড়ছে। দুদিন হলো ঠাণ্ডাজনিত রোগে আক্রান্তের হার বেড়েছে। হাসপাতালের ৫০ শয্যার একটিও খালি নেই। বহির্বিভাগেও বেড়েছে রোগীর সংখ্যা।’










