রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) উত্তরা জোনাল অফিসে ভবনের অনুমোদন নিয়ে গত বুধবার দুই মধ্যস্থতাকারীর মধ্যে বাকবিতণ্ডা ও সংঘর্ষে হিরণ মিয়া (৫০) নামে এক ব্যক্তি নিহত হন। ওই ঘটনার পরদিন উত্তরা জোনাল অফিসের তিন কর্মকর্তা ও একজন কর্মচারীকে বদলি করে রাজউক প্রশাসন। রাজউকের একটি সূত্র জানিয়েছে, হত্যার ঘটনা ধামাচাপা দিতে এ চারজনকে বদলি করা হয়েছে। তবে রাজউকের প্রশাসন শাখার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওই ব্যক্তির মৃত্যুর সঙ্গে এ চারজনের সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ায় সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাদের বদলি করা হয়েছে।
রাজউকের প্রশাসন ও উত্তরা জোনাল অফিস সূত্রে জানা গিয়েছে, রাজউক উত্তরা শাখার কর্মকর্তারা বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। এর মধ্যে বিধিবহির্ভূতভাবে ভবনের নকশা অনুমোদন-সংক্রান্ত অনিয়মই বেশি। এসব কাজের জন্য একাধিক মধ্যস্থতাকারী রয়েছেন রাজউক কর্মকর্তাদের। এমনই একজন মধ্যস্থতাকারী মো. নাহিয়ান। তিনি রাজউক উত্তরা শাখার উপনগর পরিকল্পনাবিদ মো. নূর-ই-খোদার মধ্যস্থতাকারী। ঘটনার দিন রাজউক ভবনে মো. নাহিয়ানের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন আরেক মধ্যস্থতাকারী হিরণ মিয়া।
বাকবিতণ্ডার কারণ সম্পর্কে সূত্র জানায়, নিহত হিরণ আরেক মধ্যস্থতাকারী নাহিয়ানকে একটি ভবনের অনুমোদনের জন্য বিপুল পরিমাণ উেকাচ দেন। কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও ভবনের অনুমোদন করাতে না পারায় হিরণ টাকা ফেরত চান। টাকা না দিয়ে নাহিয়ান তাকে ঘোরাতে থাকেন। টাকা দেয়ার জন্য নাহিয়ানকে চাপ দিলে তিনি হিরণকে রাজউক অফিসে ডাকেন। বুধবার দুপুরে রাজউক অফিসে হিরণ গেলে সেখানে বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে তাকে নাহিয়ান ও নূর-ই-খোদার লোকজন বেধড়ক মারধর করে।
এ প্রসঙ্গে রাজউক উত্তরা জোনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে হিরণের ওপর এলোপাতাড়ি মারধর শুরু হয়। কিছুক্ষণ পর নিস্তেজ হয়ে পড়েন হিরণ। এর আগে হিরণ বারবার পানি খেতে চান এবং প্রাণে না মারার আকুতি জানান। হিরণ নিথর হয়ে পড়লে ট্রিপল নাইনে ফোন করে পুলিশকে আসতে বলা হয়। পুলিশ এসে হিরণকে উত্তরা পূর্ব থানায় নিয়ে যায়।
তবে উত্তরা পূর্ব থানার অফিসার ইনচার্জ মো. জহিরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হিরণ রাজউক ভবনে মারা গিয়েছেন এটা শতভাগ মিথ্যা ঘটনা। রাজউক অফিসে মারামারি হয়েছে এটা সত্য। ট্রিপল নাইনে ফোন করলে আমরা গিয়ে হিরণকে নিয়ে আসি। ওই সময় হিরণ সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলেন। তিনি নামাজ পড়েছেন, হেঁটেছেন। হঠাৎ তার খারাপ লাগলে আমরা হাসপাতালে নিয়ে যাই। তিনি সুস্থ থাকায় হাসপাতাল তাকে রাখতে চায়নি। এরপর হঠাৎ তিনি মারা যান। তিনি স্ট্রোক করেছেন। এটা তার পারিবারিক অসুখ। তার বাবা, অন্যান্য ভাইয়েরও এভাবে অপমৃত্যু হয়।’
রাজউকের কর্মকর্তারা এ ঘটনায় জড়িত কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। আমরা পুরো বিষয়টি ইনভেস্টিগেশন করছি। এখনো সিদ্ধান্তে আসিনি।’
এ ঘটনার পরদিন বৃহস্পতিবার রাজউকের প্রশাসন শাখার পরিচালক মুহাম্মদ কামরুজ্জামানের স্বাক্ষর করা এক অফিস আদেশে উত্তরা জোনের তিন কর্মকর্তা ও একজন কর্মচারীকে উত্তরা জোনাল অফিস থেকে প্রশাসন শাখায় বদলি করা হয়। অফিস আদেশে বলা হয়েছে, ‘পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত নিম্নবর্ণিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তাদের নামের পাশে বর্ণিত কর্মস্থলে সংযুক্ত করা হলো।’ তিনজন কর্মকর্তা হলেন জোন-১-এর পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) একেএম আহসান ইকবাল ভূইয়া, জোন-২-এর (অতিরিক্ত দায়িত্ব জোন-১) উপনগর পরিকল্পনাবিদ মোহাম্মদ নূর-ই-খোদা, জোন-১-এর ইমারত পরিদর্শক সুব্রত তালুকদার এবং এস্টেট ও ভূমি-২-এর দপ্তরের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মো. শফিকুল ইসলাম।
এ বিষয়ে জানতে রাজউকের প্রশাসন শাখার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বললে তারা বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে ওই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এ কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মিলেছে। আমরা তদন্ত কমিটি করেছি। সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে ওই চারজনকে বদলি করা হয়েছে।’ তবে অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, হত্যার ঘটনা ধামাচাপা দিতে বিভিন্ন মহল থেকে তদবির করা হচ্ছে। এরই জেরে চার কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে জোন-২-এর (অতিরিক্ত দায়িত্ব জোন-১) মোহাম্মদ নূর-ই-খোদার সঙ্গে সেলফোনে কথা বললে তিনি বলেন, ‘হিরণ মিয়া থানায় মারা গিয়েছেন। মারামারি হয়েছে সেটা জানি। কিন্তু মারামারি কেন হয়েছে তা জানি না।’
গতকাল দুপুরে জোন-১-এর পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) একেএম আহসান ইকবাল ভূইয়ার কাছে সেলফোনে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি এখন রেস্টে আছি, ঘুমাচ্ছি, পরে কথা বলব।’ পরে তাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি আর ফোন ধরেননি।
বৃহস্পতিবার থেকে সেলফোনে বারবার চেষ্টা করেও রাজউক চেয়ারম্যানকে পাওয়া যায়নি। তবে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিনকে গতকাল সন্ধ্যায় ফোন করলে তিনি বলেন, ‘এমন কোনো ঘটনা তো আমার জানা নেই। জেনে জানাচ্ছি।’
ঘণ্টা দুয়েক পর আবার ফোন করা হলে তিনি বলেন, ‘একটা অফিস চত্বরে এমন ঘটনা যে ঘটছে, সেটা যা-ই হোক না কেন এটা আসলে দুঃখজনক। এটা অবশ্যই কাঙ্ক্ষিত নয়। যতটুকু জানা গিয়েছে, এ রকম একটা ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু পুলিশ এসে ধরে নিয়ে গিয়েছে। পুলিশ ধরে নিয়ে যাওয়ার পরে মারা গিয়েছে। এতটুকু জানতে পেরেছি। রাজউক চেয়ারম্যান আমাকে নিশ্চিত করেছেন, এ ঘটনায় তিনি দুজনকে ক্লোজ করেছেন। একজন ডিরেক্টর (পরিচালক) ইকবাল, অন্যজন ডেপুটি চিফ টাউন প্ল্যানার (উপনগর পরিকল্পনাবিদ) নূর-ই-খোদা। এ দুজনকে প্রশাসন শাখায় যুক্ত করেছে।’
কাজী ওয়াছি উদ্দিন আরো বলেন, ‘এ ঘটনায় রাজউক থেকে তদন্ত কমিটি হয়েছে। পুলিশের তদন্তে বা আমাদের তদন্তে কিছু বের হলে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
ঘটনার তিন-চারদিনেও বিষয়টি জানতে না পারা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমাকে জানানো হয়নি। রাজউক চেয়ারম্যানকেও জানানো হয়নি। চেয়ারম্যান জেনেছেন একদিন পর। চেয়ারম্যানকে আমি বলেছি, তোমার অফিসে এমন সিস্টেম করো যেন যেকোনো ঘটনা ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে তোমাকে ও আমাকে জানানো হয়।’










