সারা দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সরবরাহ করে বেসরকারি কোম্পানিগুলো। চাহিদার ৯৮ শতাংশ এলপি গ্যাস সরবরাহ দিচ্ছে এ খাতের অন্তত ২৬টি কোম্পানি। তবে ডলার সংকটে পণ্য আমদানির জন্য চাহিদা অনুযায়ী ঋণপত্র (এলসি) খুলতে না পারায় এলপিজি অপারেটররা বেশ বিপাকে পড়েছেন। সবচেয়ে বেশি সমস্যা পোহাতে হচ্ছে ছোট কোম্পানিগুলোকে।
দেশে গত বছরের মে মাস থেকেই ডলারের সংকট তীব্র হতে শুরু করেছে। রফতানি আয় ও রেমিট্যান্স কমে যাওয়ায় একদিকে যেমন ডলারের বিনিময় মূল্য বেড়েছে, অন্যদিকে ব্যাংকগুলোয় তৈরি হয়েছে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট। এর মধ্যে আবার আগের খোলা বা বিলম্বিত এলসির দায় মেটাতে হচ্ছে ব্যাংকগুলোকে। নতুন ঋণপত্র খুলতে তাই নানা জটিলতায় পড়তে হচ্ছে এলপিজি ব্যবসায়ীদের। এটি দীর্ঘায়িত হওয়ায় অনেক কোম্পানি আর্থিক ক্ষতিতে পড়েছে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে জরুরি এ পণ্যটির আমদানি বাধা না কাটলে আগামীতে এলপি গ্যাসের তীব্র সংকট তৈরি হতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তারা।
এমন অবস্থায় এলপিজি আমদানিতে ঋণপত্র খোলা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বরাবর চিঠি দিয়েছে এ খাতের সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব)। গত ১০ নভেম্বর কেন্দ্রীয় ব্যাংকে দেয়া ওই চিঠিতে লোয়াব মূলত বিনামার্জিনে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ঋণপত্র খুলতে পারে, সে বিষয়ে অনুরোধ জানিয়েছে। তবে দুই মাস পেরিয়ে গেলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো জবাব না পাওয়ায় পুনরায় চিঠি দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন লোয়াব নেতারা।
এলপিজি অপারেটরদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এলসি নিয়ে গত বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জটিলতা শুরু হয়। এরপর কয়েক মাস তা কমলেও গত অক্টোবরের পর আবারো তীব্র হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতার আশ্বাস দেয়া হলেও ডলার সংকটে ব্যাংকগুলো থেকে সে অনুযায়ী সহায়তা মিলছে না বলে দাবি খাতসংশ্লিষ্টদের।
এনার্জিপ্যাকের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান জি-গ্যাসের হেড অব বিজনেস আবু সাঈদ রাজা এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এলপিজি আমদানি করতে গিয়ে এলসি সেটেলমেন্টে ডলার সংক্রান্ত জটিলতা বেশি হচ্ছে। ফলে এলসি দায় মেটাতে গিয়ে বড় আকারে ক্যাপিটাল হারাচ্ছে কোম্পানি। সার্বিকভাবেই এর প্রভাব পড়ায় ব্যবসা সংকুচিত হচ্ছে।’ তাই ব্যাংকগুলো আরো নমনীয় হলে এবং এলসি জটিলতা কমিয়ে আনলে অপারেটররা কম ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলে মনে করেন তিনি।
দেশের বাজারে এলপি গ্যাসের বার্ষিক চাহিদা ১৪ লাখ টনের মতো, যার ৯৮ শতাংশই আমদানিনির্ভর। প্রায় ৫০ লাখ বাসাবাড়িতে পণ্যটির গ্রাহক রয়েছে। একই সঙ্গে বেশির ভাগ অপারেটরই ব্যবসা পরিচালনা করছেন স্থানীয় ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নিয়ে। ফলে পণ্য আমদানির জটিলতায় স্থানীয় বাজারে ব্যবসায় লোকসান বাড়লে তাতে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে ঝুঁকি তৈরি হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অন্তত পাঁচটি এলপিজি কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দেশের বাজারে এ খাতের ছোট কোম্পানি রয়েছে অন্তত ১৫টির মতো। এগুলোর মধ্যে আবার মাসে আড়াই থেকে তিন হাজার টন এলপিজি আমদানি করা অপারেটরের সংখ্যাই বেশি। আর এ পরিমাণ পণ্য আনার জন্য ঋণপত্র খুলতে যে অর্থের প্রয়োজন তা একটি ব্যাংকের মাধ্যমে সম্ভব হচ্ছে না। সেক্ষেত্রে অন্তত দুটি ব্যাংকের সহায়তা লাগছে। এছাড়া এলপিজি আমদানিতে এলসি খোলার জন্য কোম্পানিগুলো যে ধরনের শর্ত মেনে চলে, সেটিও এখন নানা কারণে মানতে পারছে না। তাই কাগজপত্রের জটিলতা কাটিয়ে পণ্য খালাস করে বাজারে আনতে সাত থেকে ১০ দিনের মতো সময় লেগে যাচ্ছে। এতে বাজারে পণ্য সরবরাহে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে যে দাম দিয়ে ডলার কিনছেন, টাকার অবমূল্যায়নের কারণে এলসি সেটেলমেন্টেও বড় ধরনের আর্থিক ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
দেশের বাজারে এলপি গ্যাসের মার্কেট শেয়ার সবচেয়ে বেশি বসুন্ধরা এলপি গ্যাসের। ঋণপত্র খুলতে জটিলতা হওয়ায় মার্কেটে পণ্য সরবরাহে কী ধরনের প্রভাব পড়ছে তা জানতে চাওয়া হয় প্রতিষ্ঠানটির চিফ অপারেটিং অফিসার (ব্র্যান্ড অ্যান্ড মার্কেটিং) এমএম জসিম উদ্দিনের কাছে। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘সময়মতো এলসি খুলতে না পেরে এ খাতের অধিকাংশ কোম্পানি কম-বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ জটিলতায় ৩০-৪০ শতাংশ ব্যবসা কমে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কিন্তু এলপিজির কাঁচামালের সংকট নেই। দামও আগের চেয়ে সাশ্রয়ী কিন্তু ঋণপত্র জটিলতায় পণ্য আমদানি করা যাচ্ছে না।’
জানতে চাইলে ওরিয়ন গ্যাস লিমিটেডের চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) প্রকৌশলী অনুপ কুমার সেন বণিক বার্তাকে একই কথা জানান। তিনি বলেন, ‘এলসি জটিলতায় ব্যাংকগুলো ডলার সংকটকে সামনে আনছে। তারা সহযোগিতাও করছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর ব্যালান্স শিট ওভার ডিউ হওয়ায় জটিলতা বাড়ছে। এ ধরনের ঝামেলা মেটাতে এক সপ্তাহের বেশি সময় লেগে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে পণ্য শিপমেন্ট সময়মতো করা যাচ্ছে না। সরবরাহ চেইনে সংকট তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে এলপিজি ব্যবসা মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। ব্যাংকঋণ পরিশোধেও তার প্রভাব রয়েছে।’
দেশের বাজারে এলপি গ্যাসের ৩২ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা রয়েছে বলে জানিয়েছেন অপারেটররা। বছরে ২৬টি (স্যাটেলাইটসহ) অপারেটরের মাধ্যমে এ ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে। স্থানীয় জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে তুলনামূলক এলপিজি সাশ্রয়ী হওয়ায় শিল্পে ও ব্যক্তিগত গাড়িতেও এর ব্যবহার বাড়ছে। ফলে বাজার প্রসারে বিদ্যমান এ সংকট দীর্ঘায়িত হলে ছোট কোম্পানিগুলো টিকে থাকা নিয়ে চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে বলে মনে করেন এ খাতের ব্যবসায়ীরা।
ওমেরা পেট্রোলিয়ামের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তানজীম চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এলপিজি আমদানিতে এলসি খোলা নিয়ে এক ধরনের জটিলতা তো রয়েছেই। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সব ধরনের আমদানি পণ্যের ক্ষেত্রেই এখন এ সংকট। মার্কেটে এটা নিয়ে এক ধরনের অস্থিরতা আছে। এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সাপ্লাই চেইনে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’ তিনি আরো বলেন, ‘ব্যাংকগুলো অবশ্য সহযোগিতা করছে। তবে আমদানি ঠিক রাখতে আরো বেশি সহযোগিতা প্রয়োজন। যেহেতু এলপিজি একটি প্রয়োজনীয় পণ্য।’










