অনুমোদন নেই জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার। ভুয়া নথি তৈরি করে নেয়া হয়েছে বেশ কয়েকটি সরকারি সংস্থার অনাপত্তিপত্র। ওইসব নথি দেখিয়ে সমুদ্র চ্যানেল থেকে উত্তোলন করা হচ্ছে বালি। বালি উত্তোলনের কারণে আশপাশের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নৌঘাটের জেটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ নিয়ে ফোরশোরের মালিকানায় থাকা সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ব্যবস্থা নিতে নৌ-পুলিশকে জানালেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।
এ-সংক্রান্ত একাধিক নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বালি উত্তোলনের জন্য ওডব্লিউডব্লিউ ট্রেডিং অ্যান্ড শিপ ব্রেকিং-১ ও মেসার্স শামা ইন্টারন্যাশনাল নামের প্রতিষ্ঠানটি একাধিক সরকারি সংস্থার ভুয়া আদেশ ও অনাপত্তিপত্র তৈরি করেছে। এর মধ্যে শামা ইন্টারন্যাশনাল ২০২২ সালের ১৫ জুলাই বিআইডব্লিউটিএর ড্রেজিং ও হাইড্রোগ্রাফি বিভাগের একটি আদেশ (নং- এমএম ৭/২০২২) ছাপিয়ে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার কাছে পেশ করে। সংস্থাটির প্রধান প্রকৌশলী (ড্রেজিং) রকিবুল ইসলাম তালুকদার ও পরিচালক (হাইড্রোগ্রাফি) বেগম সামসুন নাহারের সই নকল করে নথিটি তৈরি করে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. আবদুল হামিদের সই নকল করে ২০২২ সালের ৩ অক্টোবর পরিবেশ ছাড়পত্রের আদেশ তৈরি করে শামা ইন্টারন্যাশনাল। আদেশের ওই চিঠিতে অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নামও ছিল ভুল।
বিআইডব্লিউটিএ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, সীতাকুণ্ড চ্যানেলের ড্রেজিং কিংবা বালি উত্তোলনে কোনো সংস্থাকেই অনুমতি দেয়া হয়নি। কেউ যদি এ ধরনের চিঠি বা আদেশ প্রচার করে তবে সেগুলো ভুয়া। এ বিষয়ে কেউ অভিযোগ জানালে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন তারা।
পাশাপাশি নৌ-চ্যানেলে হাইড্রোগ্রাফি সমীক্ষা ছাড়া বালি উত্তোলন চট্টগ্রাম বন্দর কেন্দ্র করে চলাচলরত নৌযান ও সংলগ্ন ঘাট-জেটির জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। ২০২২ সালে কুমিরা-সন্দ্বীপ রুটের কুমিরা জেটি ভেঙে যায়। যার কারণে সন্দ্বীপে যাতায়াতকারী প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার মানুষকে কাদা মাড়িয়ে নৌযানে চড়তে হয়েছে। এক্ষেত্রে শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড মালিক সংগঠনের ছাড়পত্র ছাড়া ও একাধিক সরকারি সংস্থার ভুয়া অনুমোদনের কপি ব্যবহার হলেও স্থানীয় প্রশাসন ও নৌ-পুলিশের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি বলে দাবি করছেন তারা।
জানা গেছে, অভিযোগ আসার পর ২০২২ সালের ২০ ডিসেম্বর নৌ-পুলিশের চট্টগ্রাম অঞ্চলের পুলিশ সুপারকে এ বিষয়ে যথাযথ অভিযান পরিচালনার জন্য চিঠি দেয় বিআইডব্লিউটিএ। প্রতিষ্ঠানটির উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) নয়ন শীলের দেয়া ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, সীতাকুণ্ড চ্যানেলের বিভিন্ন স্থান থেকে অবৈধ পন্থায় বালি উত্তোলনের কারণে কুমিরা এলাকায় বিআইডব্লিউটিএর নির্মিত জেটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জেটিসংলগ্ন এলাকা থেকে বালি উত্তোলন করার কারণে জেটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাওয়ায় সন্দ্বীপের সংসদ সদস্য মাহফুজুর রহমান মিতা নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ জানিয়েছেন বলেও দাবি করা হয়। কিন্তু ওই চিঠি প্রাপ্তির পরও নৌ-পুলিশের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলে দাবি করেছে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ।
নৌ-পুলিশের পুলিশ সুপার আ ফ ম নিজাম উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা বিআইডব্লিউটিএর চিঠি পেয়েছি। এ-সংক্রান্ত বিষয়ে একাধিকবার অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। কিন্তু অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো যদি অভিযান-পরবর্তী সময়ে ফের বালি উত্তোলনে নিয়োজিত থাকে তবে আমাদের কিছুই করার থাকে না। তবে শিগগিরই অভিযান পরিচালনা করা হবে।
অভিযোগ রয়েছে, বিএসবিআরএসহ সীতাকুণ্ড এলাকার স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা ও প্রভাবশালীদের সহায়তায় এবং স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় বালি উত্তোলনে জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড মালিকরা।
বিআইডব্লিউটিএর উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) নয়ন শীল বণিক বার্তাকে বলেন, কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়াই ফৌজদারহাট থেকে সীতাকুণ্ড পর্যন্ত একাধিক প্রতিষ্ঠান নৌ-চ্যানেলে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন করছে। আইন অনুযায়ী এ বিষয়ে অনুমোদন দিতে পারে শুধু বিআইডব্লিউটিএ। কিন্তু অভিযুক্ত একাধিক প্রতিষ্ঠান ভুয়া আদেশ তৈরি ও ভিন্ন ভিন্ন সরকারি সংস্থার অনুমোদনের কপি দেখিয়ে নৌ-চ্যানেলকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। অবৈজ্ঞানিক উপায়ে ড্রেজিং বা বালি উত্তোলনের কারণে সন্দ্বীপসহ বিভিন্ন এলাকার নৌযান চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ জেটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বেশ কয়েকটি আধুনিক জেটি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্যরা নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে অভিযোগ দেয়ার পর আমরা নৌ-পুলিশসহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থায় চিঠি দিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানিয়েছি।
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপপরিচালক ফেরদৌস আনোয়ার বণিক বার্তাকে বলেন, প্রধান কার্যালয় থেকে জেলা পর্যায়ের কোনো প্রতিষ্ঠানকে পরিবেশ ছাড়পত্র দেয়া হয় না। তাছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ ধরনের ছাড়পত্রের আদেশে স্বাক্ষর করবেন না। কেউ যদি এ ধরনের আদেশ দেখিয়ে অবৈধ কার্যক্রম চালায় তবে সেটি ভুয়া।










