গত ছয় বছরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশে আসা প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের (এফডিআই) অন্তঃপ্রবাহ বেড়েছে ২৪ শতাংশ। একই সময়ে বাংলাদেশের বাইরে যাওয়া বিদেশী বিনিয়োগের বহিঃপ্রবাহ বেড়েছে ১২৪ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতিসংঘের বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থার (আঙ্কটাড) ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট ২০২২-এ এমন চিত্র উঠে এসেছে। বিশ্বব্যাপী চলতি বছরের ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট আজই প্রকাশ হওয়ার কথা রয়েছে।
ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে বিনিয়োগকারী বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোর বাংলাদেশে নিয়ে আসা এবং দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়া অর্থসংক্রান্ত জরিপের ভিত্তিতে এফডিআই প্রবাহের পরিসংখ্যান ও গতিপ্রকৃতির তথ্য প্রকাশ করে থাকে বাংলাদেশ ব্যাংক। এক্ষেত্রে এফডিআইকে নিজস্ব মূলধন (ইকুইটি ক্যাপিটাল), আয়ের পুনর্বিনিয়োগ (রিইনভেস্টেড আর্নিংস) ও আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণ (ইন্ট্রাকোম্পানি লোন)—এ তিন ভাগে ভাগ করে হিসাব করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এসব পরিসংখ্যানই প্রতিবেদন তৈরিতে ব্যবহার করেছে আঙ্কটাড।
২০১৬ সালে বাংলাদেশে এফডিআইয়ের অন্তঃপ্রবাহ ছিল ২৩৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার, যা ২০১৭ সালে কমে দাঁড়ায় ২১৫ কোটি ২০ লাখ ডলারে। ২০১৮ সালে এতে বড় উল্লম্ফন ঘটে, যার পরিমাণ ছিল ৩৬১ কোটি ৩০ লাখ ডলারের। ২০১৯ সালে তা আবার কমে দাঁড়ায় ২৮৭ কোটি ৪০ লাখ ডলারে। এরপর ২০২০ সালে কভিডের প্রাদুর্ভাব শুরুর বছরে তা আরো কমে নেমে আসে ২৫৬ কোটি ৪০ লাখ ডলারে। সর্বশেষ গত বছর দেশে এফডিআই প্রবাহ ছিল ২৮৯ কোটি ৬০ লাখ ডলার। সে হিসেবে ২০১৬ সালের তুলনায় ২০২১ সালে দেশে এফডিআইয়ের অন্তঃপ্রবাহ বেড়েছে ২৪ শতাংশ।
এদিকে ২০১৬ সালে বাংলাদেশের বাইরে যাওয়া এফডিআইয়ের বহিঃপ্রবাহ ছিল ৪ কোটি ১০ লাখ ডলার। পরের বছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪ কোটি ২০ লাখ ডলারে। ২০১৮ সালে এফডিআইয়ের বহিঃপ্রবাহ ছিল ২ কোটি ৩০ লাখ ডলার। ২০১৯ সালে তা আরো দাঁড়ায় ২ কোটি ৮০ লাখ ডলারে। ২০২০ সালে এর পরিমাণ ছিল ১ কোটি ২০ লাখ ডলার। সর্বশেষ গত বছর এফডিআই বহিঃপ্রবাহ দাঁড়িয়েছে ৯ কোটি ২০ লাখ ডলারে। সে হিসেবে ২০১৬ সালের তুলনায় ২০২১ সালে এফডিআইয়ের বহিঃপ্রবাহ বেড়েছে ১২৪ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, নিজ ভূখণ্ডের বাইরে ব্যবসার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে বিদেশে বিনিয়োগ সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ খুব সতর্কভাবে এগোচ্ছে। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ সরকার আইনে সংশোধন এনে শর্তসাপেক্ষে রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠানকে দেশের বাইরে বিনিয়োগ করার সুযোগ সৃষ্টি দেয়। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বাইরে বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এখন পর্যন্ত ২০টি দেশে বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ রয়েছে।
বাংলাদেশে এফডিআই প্রবাহের বিশ্লেষণে আঙ্কটাড বলছে, ২০২১ সালে বাংলাদেশের এফডিআই অন্তঃপ্রবাহ ১৩ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ২৯০ কোটি ডলার, যা কভিডের প্রাদুর্ভাব-পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরেছে। প্রকল্প অর্থায়নে আন্তর্জাতিক চুক্তিও তিন গুণ বেড়ে ৪৭০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রকল্পটি ২ বিলিয়ন ডলারের, যা কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে।
কোন কোন খাতের মাধ্যমে ২০২১ সালে এফডিআই প্রবাহ বেড়েছে, সে চিত্রও উঠে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে। প্রতিষ্ঠানটির খাতভিত্তিক গ্রস এফডিআই পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অন্তঃপ্রবাহ ছিল বস্ত্র ও পোশাক খাতে। এ তালিকায় পরের অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে বিদ্যুৎ, ব্যাংকিং, গ্যাস ও পেট্রোলিয়াম, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই), টেলিকমিউনিকেশন, ট্রেডিং, খাদ্য, নির্মাণ এবং চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য।
গত বছর দেশে এফডিআই অন্তঃপ্রবাহের সবচেয়ে বড় উৎস ছিল যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এফডিআই প্রবাহ এসেছে চীন থেকে। এছাড়া গ্রস এফডিআই অন্তঃপ্রবাহের উৎস হিসেবে উল্লেখযোগ্য অন্যান্য দেশ হলো সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্য, হংকং, নেদারল্যান্ডস, ভারত, নরওয়ে, শ্রীলংকা, জাপান, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও মরিশাস।
বিনিয়োগ আকর্ষণে নিয়োজিত সংস্থার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, করোনার আগেও দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনের জন্য যে পরিমাণ বিদেশী বিনিয়োগ আসা দরকার ছিল, তা আসেনি। আরো অনেক তত্পরতা ও সমন্বয়ের প্রয়োজন, যার এখনো অনেক ঘাটতি রয়ে গিয়েছে। কভিডের প্রেক্ষাপটে এখন আরো প্রস্তুতি নিয়ে পরিপূর্ণ একটি পরিকল্পনার প্রয়োজন আছে। কভিড-১৯-এর কারণে চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে। সে সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগাতে কাজ করে যেতে হবে। কভিডের অভিঘাত কাটিয়ে বিদেশী বিনিয়োগ প্রবাহ বাড়তে শুরু করলেও তা কাঙ্ক্ষিত মাত্রার চেয়ে অনেক কম। তার পরও ইতিবাচক ধারা বজায় রাখার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সিরাজুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, এফডিআই প্রবাহ বৃদ্ধিতে করণীয় সব বিষয়ে গুরুত্বসহকারে কার্যক্রম চলমান আছে। বাংলাদেশের পরবর্তী ধাপের উন্নয়নের জন্য বিদেশী বিনিয়োগের গুরুত্ব অনেক। মোট জিডিপির খুব সামান্য অংশজুড়ে রয়েছে বিদেশী বিনিয়োগ, যা বাংলাদেশের জন্য সুখকর নয়। এক্ষেত্রে সরকারের সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ দেখাতে এগিয়ে আসতে হবে। প্রস্তাবিত বেশকিছু বড় বিনিয়োগ প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা চলছে। এছাড়া বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে প্রচারণামূলক কার্যক্রমও চলছে। আবার দেশের বাইরে বিনিয়োগের সুযোগও করে দিচ্ছে সরকার।










