দেশের গ্যাস চাহিদার বড় একটি অংশের সরবরাহ আসে সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের (এসজিএফএল) আওতাধীন কূপগুলো থেকে। উৎপাদন আরো বাড়াতে নেয়া হয়েছে জোরালো পদক্ষেপ। ফিল্ডের কিছু কূপে লবণাক্ত পানি ওঠায় উল্টো উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে গ্যাস উৎপাদন। এ পরিস্থিতিতে সিলেটের হরিপুর ও বিয়ানীবাজারের চারটি কূপের ওয়ার্কওভার বা পুনঃখনন করে উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি।
জানা গেছে, এফজিএফএলের মোট চারটি গ্যাসফিল্ড উৎপাদনে রয়েছে। সেগুলো হলো সিলেটের হরিপুর, কৈলাশটিলা, রশিদপুর ও বিয়ানীবাজার। এসব ফিল্ডের আওতায় মোট ১৩টি গ্যাসকূপ উৎপাদনে রয়েছে। পেট্রোবাংলার তথ্যানুযায়ী, এসজিএফএলের দৈনিক গ্যাস উৎপাদন ৯৮ মিলিয়ন ঘনফুট।
এসজিএফএলের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অতিরিক্ত লোনা পানি আসায় সংস্থাটির বিয়ানীবাজার গ্যাস ফিল্ডের ২ নম্বর কূপটি বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে আবারো সেটি উৎপাদনে নিয়ে আসতে ওয়ার্কওভারের উদ্যোগ নিয়েছে এসজিএফএল। এর আগেও হরিপুর গ্যাস ফিল্ডের আওতাধীন সিলেট-২ কূপে পানির প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় গ্যাস উত্তোলন বন্ধ রাখা হয়।
গ্যাস ফিল্ডে পানির বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে এসজিএফএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন একটি কূপ উৎপাদনে থাকলে সেখানে পানি চলে আসতে পারে। এটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বিয়ানীবাজার গ্যাস ফিল্ডটি অনেক পুরনো। বহু বছর ধরে উৎপাদনে ছিল। সেখানকার ২ নম্বর কূপে লোনা পানি আসছে। সেটির ওয়ার্কওভার করা হবে।’
সিলেট গ্যাস ফিল্ডের উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বর্তমান উৎপাদনের সঙ্গে চলতি বছরের মধ্যে আরো ১৬৪ মিলিয়ন ঘনফুট (দৈনিক) গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে, এ লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এসজিএফএলের সাতটি কূপের ওয়ার্কওভার ও সাতটি খনন করা হবে।’
এসজিএফএলের তথ্যানুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে কোম্পানিটির মোট চারটি গ্যাস ফিল্ড থেকে ৩৩ হাজার ৭৪৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হয়েছে। আগের অর্থবছরে যেখানে ছিল ৩২ হাজার ৩৬৪ মিলিয়ন ঘনফুট। সম্প্রতি লবণাক্ত পানির কারণে কোম্পানিটির গ্যাস উত্তোলন বিগত অর্থবছরগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।
নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, এসজিএফএলের আওতায় বিপুল পরিমাণ গ্যাসের মজুদ রয়েছে, কিন্তু দীর্ঘদিন নতুন কূপ খনন না হওয়া, পুরনোগুলোর সংস্কার ও পুনঃখনন না করায় কোম্পানির গ্যাস উত্তোলন বাড়েনি। বেশ কয়েকটি গ্যাস ফিল্ডের আওতায় নতুন করে কূপ খননের উদ্যোগ নেয়া হলেও কাজের শুরুতেই সেখানে পানির প্রবাহ দেখা গেছে। ফলে নতুন করে কূপ খনন ও সংস্কারসংক্রান্ত প্রকল্প নিয়ে বেশ বেগ পেতে হয় সংস্থাটিকে।
গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে সিলেট গ্যাস ফিল্ডস বর্তমানে চারটি কূপের ওয়ার্কওভার করছে। এর মধ্যে কৈলাশটিলা-২, রশিদপুর-২, রশিদপুর-৫ ও সিলেট-৭। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ২৮৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা। গত বছরের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া এসব প্রকল্প চলতি বছরের ডিসেম্বর নাগাদ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। সংস্থাটির দেয়া তথ্যানুযায়ী, কূপগুলোর ওয়ার্কওভার সম্পন্ন হলে এসজিএফএলের গ্যাস উৎপাদন দৈনিক ৩৩ মিলিয়ন ঘনফুট বাড়বে বলে জানা গেছে।
জ্বালানিসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্যাসকূপ উৎপাদনে থাকলে সেখানে পানি আসবে এটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আবার খনিতে গ্যাস নিঃশেষ হয়ে এলেও এটি হতে পারে। তবে ওয়ার্কওভারের মাধ্যমে পানি বন্ধ করে পুনরায় গ্যাসের উৎপাদন স্বাভাবিক পর্যায়ে আনার সুযোগ রয়েছে। গ্যাস কূপে এটি সাধারণ প্রক্রিয়া।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক বদরূল ইমাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গ্যাসকূপে পানি আসার প্রধানত দুটি কারণ। প্রথমত, ক্ষেত্রের আয়ুষ্কাল ফুরিয়ে এলে অর্থাৎ সেখানে আর গ্যাস না থাকলে পানি আসতে পারে। দ্বিতীয়ত, সঠিক উপায়ে কূপ থেকে গ্যাস উৎপাদন না করা হলে পানি আসার সম্ভাবনা রয়েছে।’
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের কারিগরি সংস্থা হাইড্রোকার্বন ইউনিটের তথ্যানুযায়ী, দেশে যে কয়টি গ্যাস ফিল্ডে এখনো গ্যাসের বড় মজুদ তার দুটি এসজিএফএলের আওতায়। এর একটি রশিদপুর, অন্যটি কৈলাশটিলা। গত বছরের জুন পর্যন্ত রশিদপুরের সম্ভাব্য গ্যাসের মজুদ ছিল ২ হাজার ৪৩১ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ) এবং কৈলাশটিলায় ২ হাজার ৮৪ বিসিএফ। মজুদের বিপরীতে রশিদপুর থেকে গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে দৈনিক ৪৭ মিলিয়ন ঘনফুট আর কৈলাশটিলা থেকে প্রায় ৩১ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো।
গ্যাস উত্তোলন না বাড়ায় এসজিএফএলের কারিগরি দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার অভাব রয়েছে বলে মনে করেন জ্বালানিসংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় এসব গ্যাস ফিল্ড নিয়ে জ্বালানি বিভাগেরও তেমন তৎপরতা দেখা যায়নি। বছরের পর বছর কূপগুলো উত্তোলনে থাকলেও সংস্কার নেয়া হয়নি বলে মনে করেন তারা।
এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘স্থানীয় কোম্পানিগুলোর আওতায় গ্যাস ফিল্ডগুলোর উৎপাদন না বাড়ার পেছনে গ্যাসের রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় কারিগরি সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতার ঘাটতি ছিল, এখনো রয়েছে। যে কারণে অনেক ফিল্ডের বৃহৎ মজুদ থাকা সত্ত্বেও গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো যায়নি। এক্ষেত্রে দেশীয় ফিল্ডগুলোয় যারা কাজ করে তাদের সে ধরনের সুযোগ রয়েছে কিনা সেটিও দেখতে হবে। একই সঙ্গে গ্যাসকূপ খননে যে ধরনের অভিজ্ঞতা ও খনন-পরবর্তী জটিলতা তৈরি হলে তার সমাধান কী হতে পারে, সে ধরনের সমীক্ষা দেখা যায় না এখানে।’
দেশে দৈনিক প্রায় ৪ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ হচ্ছে কেবল ২ হাজার ৫৬৬ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে শিল্প, আবাসিক ও সিএনজি খাতে তীব্র গ্যাস সংকট চলছে। সমস্যা সমাধানে তাই স্থানীয়ভাবে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ২০২৫ সালের মধ্যে খনন করা হবে ৪৬টি গ্যাসকূপ, এর মধ্যে এসজিএফএলের অনেক কূপও রয়েছে।










