বাংলাদেশ, কানাডা ও অন্যান্য মাঝারি শক্তির দেশগুলোর সামনে আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে নিজেদের ভূমিকা ও নেতৃত্ব জোরদারের বড় সুযোগ বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত কানাডার হাইকমিশনার অজিত সিং।

সোমবার (৫ অক্টোবর) রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’-এর সমাপনী দিনে বক্তব্যকালে তিনি বলেন, কানাডা, বাংলাদেশ, বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল এবং এর বাইরের দেশগুলোর জন্য এটি শুধু একটি চ্যালেঞ্জ নয়; বরং নিজেদের ভূমিকা ও নেতৃত্ব প্রদর্শন এবং সবার জন্য আরও ভালো ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার বিশাল সুযোগ।

অজিত সিং বলেন, বঙ্গোপসাগর ক্রমেই বৈশ্বিক রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসছে। এ অঞ্চল দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক যোগাযোগপথ, দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি এবং তরুণ জনগোষ্ঠীকে সংযুক্ত করছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রমবর্ধমান প্রভাবের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিজেদের ভূমিকা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা এখন আর কেবল বড় শক্তিগুলোর একচেটিয়া বিষয় নয়।

তিনি বলেন, বহুমেরুকরণকে শুধু বড় শক্তিগুলোর নতুন করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখা উচিত নয়। এর ফলে বাংলাদেশের মতো দেশ এবং কানাডার জন্য অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা, জোট গঠন এবং নিজেদের প্রভাব প্রয়োগের সুযোগও তৈরি হচ্ছে।

কানাডার হাইকমিশনার বলেন, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের অর্থ কৌশলগত বিচ্ছিন্নতা নয়।

তিনি বলেন, আজকের গভীরভাবে আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে একটি দেশের সার্বভৌমত্ব ক্রমেই তার সম্পর্কগুলোর শক্তি ও বৈচিত্র্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে।

নিরাপদ খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ, প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল অবকাঠামো, প্রতিযোগিতামূলক শিল্প, দক্ষ জনশক্তি এবং স্থিতিস্থাপক সরবরাহব্যবস্থা এখন সার্বভৌমত্বের অপরিহার্য উপাদান হয়ে উঠেছে বলেও জানান তিনি ।

কোনো দেশের পক্ষেই এসব সম্পূর্ণভাবে একা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, অতিনির্ভরশীলতার সমাধান সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়; বরং সম্পর্ক ও সক্ষমতার বহুমুখীকরণ।

অজিত সিং বলেন, কৌশলগত মধ্যম অবস্থানে থাকা দেশগুলোকে প্রতিটি বিষয়ে কোনো একটি বড় শক্তির পক্ষ নেওয়া বাধ্যতামূলক—এমন ধারণা ছাড়াই নিজেদের স্বার্থ সুরক্ষার সুযোগ রয়েছে।

তিনি বলেন, যেখানে স্বার্থের মিল রয়েছে সেখানে দেশগুলো সহযোগিতা করতে পারে এবং মতপার্থক্যগুলো উন্মুক্ত ও সরাসরি সংলাপের মাধ্যমে সামাল দেওয়া যেতে পারে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নিজেদের ভূমিকা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বজায় রাখার অর্থ হলো নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ধরে রাখা। আর প্রভাব বিস্তারের অর্থ হলো এমন অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা, যা ওই সিদ্ধান্তগুলোর কার্যকারিতা বাড়ায় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, নেতৃত্বের অর্থ শুধু জাতীয় স্বার্থে সেই প্রভাব কাজে লাগানো নয়; বরং অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়ও তা ব্যবহার করা।

বাংলাদেশ-কানাডা সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে হাইকমিশনার বলেন, পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ে দুই দেশ ঘনিষ্ঠ অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথমদিকের দেশগুলোর অন্যতম কানাডা এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বাংলাদেশের একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় দেশটি সহযোগিতা করেছে।

অজিত সিং বলেন, এরপর দুই দেশের সম্পর্ক অনেক বিস্তৃত হয়েছে এবং জনগণের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও সম্পর্ক এ অংশীদারিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে।

তিনি বলেন, এক লাখেরও বেশি বাংলাদেশি-কানাডীয় কানাডার সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবেশ কঠিন হওয়া সত্ত্বেও দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য কানাডীয় ৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে ২৫ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

কানাডার পটাশ সার বাংলাদেশে সরবরাহের বিষয়ে সাম্প্রতিক সরকার-টু-সরকার ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

অজিত সিং বলেন, ২০১৪ সাল থেকে এ ধরনের ব্যবস্থার আওতায় কানাডা থেকে বাংলাদেশে ৩৫ লাখ মেট্রিক টনের বেশি পটাশ সরবরাহ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, এ সহযোগিতা কীভাবে বাণিজ্য দুই দেশের স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে পারে, তার একটি উদাহরণ। কানাডার সম্পদ বাংলাদেশের কৃষকদের সহায়তা করছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের কৃষি চাহিদা কানাডার উৎপাদকদেরও উপকৃত করছে। বাস্তবে কৌশলগত অংশীদারিত্ব এমনই হওয়া উচিত বলেন তিনি।

কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা, জ্বালানি, জলবায়ু প্রযুক্তি, মহাকাশ ও বিমান চলাচল, শিক্ষা ও দক্ষতা, ডিজিটাল প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং বিনিয়োগকে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা সম্প্রসারণের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেন কানাডার হাইকমিশনার।

তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য স্পষ্ট হওয়া উচিত—সহায়তানির্ভর সম্পর্ক থেকে সরে এসে এমন একটি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা, যেখানে দুই দেশই একে অপরের পরিপূরক সক্ষমতাগুলো কাজে লাগাবে।

বাংলাদেশ-কানাডা সম্পর্ক ক্রমেই দাতা-গ্রহীতা কাঠামোর বাইরে গিয়ে অভিন্ন সমৃদ্ধি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির ভিত্তিতে অংশীদারিত্বের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বাংলাদেশে চলমান সংস্কার কার্যক্রমের প্রসঙ্গে অজিত সিং বলেন, গণতান্ত্রিক, আর্থিক, অর্থনৈতিক, শ্রম ও বিচারিক সংস্কার দেশটির ভবিষ্যৎ উন্নয়নকে শক্তিশালী করতে পারে এবং কানাডার সঙ্গে সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।

তিনি বলেন, বৈশ্বিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কানাডাও তার অর্থনৈতিক সম্পর্কের বহুমুখীকরণ, সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদন সক্ষমতায় বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।

কানাডার ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে রপ্তানি প্রায় ১৬ শতাংশ বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক নীতি ও পররাষ্ট্রনীতির মধ্যকার সীমারেখা ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে আসছে। ফলে বহুমুখীকরণ ও স্থিতিস্থাপকতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

তিনি বলেন, মধ্যম শক্তির দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব ও উন্মুক্ততা কিংবা জাতীয় স্বার্থ ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতার মধ্যে কোনো একটি বেছে নেওয়ার প্রয়োজন নেই।

গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, খাদ্যনিরাপত্তা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বাস্থ্য এবং বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের মতো বিষয়ে দেশগুলো বাস্তবভিত্তিক জোট গঠন করতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

কানাডা, বাংলাদেশ ও বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশের অভিন্ন স্বার্থ হলো কার্যকর নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা বজায় রাখা—এ কথা উল্লেখ করে অজিত সিং বলেন, শুধু আকার ও শক্তির ভিত্তিতে পরিচালিত একটি ব্যবস্থা আমাদের স্বার্থ রক্ষা করে না।

তিনি বলেন, আমাদের স্বার্থ রক্ষা করে এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে সার্বভৌমত্ব গুরুত্বপূর্ণ, আন্তর্জাতিক আইন গুরুত্বপূর্ণ এবং দেশগুলো নিজেদের স্বাধীনতা বিসর্জন না দিয়েই একে অপরের সঙ্গে সহযোগিতা করতে পারে।

কানাডার হাইকমিশনার বলেন, এ ধরনের ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে প্রচলিত বড় শক্তিগুলোর বাইরেও নেতৃত্ব প্রয়োজন; এর মধ্যে কানাডা ও বাংলাদেশের মতো দেশও রয়েছে।

তিনি বলেন, কৌশলগত মধ্যম শক্তির দেশগুলোর উচিত নিজেদের অভ্যন্তরীণ শক্তি ও স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানো, অংশীদারিত্বকে সার্বভৌমত্বের একটি উৎস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার কেবল দর্শক হয়ে না থেকে নিজেদের ভূমিকা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা কাজে লাগানো।

অজিত সিং বলেন, বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে কানাডা শুধু বাণিজ্যের গন্তব্য হিসেবে দেখে না; বরং একটি উন্নত ও আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার অংশীদার হিসেবে দেখে।

তিনি আরো বলেন, কৌশলগত মধ্যম শক্তি হিসেবে আমরা একে অপরের সঙ্গে কতটা সংযোগ স্থাপন করতে পারি, আমাদের শক্তি ততটাই হবে।