রাজধানীতে পরিকল্পিত নগরায়ণের উদ্দেশ্যে ঢাকা ও আশপাশের এলাকা ঘিরে ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) প্রণয়ন করছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। এ পরিকল্পনায় রয়েছে আবাসিক-বাণিজ্যিক, বিনোদন ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার ব্যবস্থা। তবে ড্যাপের আওতাধীন কামরাঙ্গীরচর এলাকায় একটি বাণিজ্যিক হাব গড়ে তোলার মাস্টারপ্ল্যান হাতে নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। যেখানে পরিকল্পিত নগরায়ণের লক্ষ্য নিয়ে ড্যাপ প্রণয়ন করা হচ্ছে, সেখানে বাণিজ্যিক হাব নির্মাণ সে লক্ষ্য বাস্তবায়নকে বাধাগ্রস্ত করবে বলে আশঙ্কা করছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। অন্যদিকে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সেবা সংস্থা হিসেবে এ ধরনের বাণিজ্যিক হাব গঠনের কাজ করতে পারে না ডিএসসিসি। যদিও করপোরেশনের দাবি, আইন মেনেই সব পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

ঢাকার আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকার সীমা নির্ধারণ, অবকাঠামো উন্নয়নের বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে গঠিত হয় রাজউক। এ সংস্থার পরিকল্পনা অনুযায়ী নাগরিক সেবা প্রদানের বিষয়টি বাস্তবায়নের দায়িত্ব ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের। ড্যাপে ডিএসসিসির কামরাঙ্গীরচর এলাকাটিকে আবাসিক প্রধান রেখে মিশ্র হিসেবে ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছে। যদিও সেখানে বাণিজ্যিক হাব করার ঘোষণা দিয়েছেন ডিএসসিসির মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস। এরই মধ্যে ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে সামগ্রিক পরিকল্পনার কাজও শুরু হয়ে গিয়েছে। নগরবিদরা বলছেন, ড্যাপ নির্ধারিত স্থানে বাণিজ্যিক হাবের পরিকল্পনা সিটি করপোরেশনের কাজ নয়। সিটি করপোরেশন আইন অনুযায়ী কোনো ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম করা কিংবা কোনো এলাকাকে বাণিজ্যিক হাব ঘোষণার এখতিয়ারও ডিএসসিসির নেই। তবে ডিএসসিসির দাবি, আইন মেনেই এ পরিকল্পনার কাজ শুরু হয়েছে।

ড্যাপ অনুযায়ী, কামরাঙ্গীরচর এলাকার মধ্যে পড়েছে ডিএসসিসির ৫৫, ৫৬ ও ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড। এলাকাটি বাণিজ্যিক ও আবাসিক দুইভাবেই ব্যবহার করা যাবে। তবে আবাসিক এলাকাকে প্রাধান্য দেয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এলাকাটি বাণিজ্যিক হিসেবে ব্যবহার করতে হলে রাস্তাগুলো ৮০ ফুটের বেশি হতে হবে। আবাসিকের ক্ষেত্রে ৬০ ফুট হওয়ার কথা বলা আছে।

ড্যাপে আরো বলা আছে, কামরাঙ্গীরচরের তিন ওয়ার্ডে যথাক্রমে ৬৫৪, ৩৫০ ও ২৪০ একর ভূমি রয়েছে। এর ৫০ শতাংশ বসবাসের জন্য আর বাকিটুকু রাস্তাঘাট ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ করার জন্য ব্যবহার করা যাবে। প্রতি একরে ২০০ জন এবং প্রতি কাঠায় গড়ে দুজন মানুষ বসবাস করতে পারবে।

ডিএসসিসির নগর পরিকল্পনা বিভাগ সূত্রে জানা গিয়েছে, জনভারে নুয়ে পড়া ঢাকাকে বাসযোগ্য শহর হিসেবে গড়ে তুলতে মেয়র তাপস ৩০ বছর মেয়াদি ডিটেইল্ড এরিয়া মাস্টারপ্ল্যান করছেন। আগামী ২০৫০ সালে উন্নত বাংলাদেশের রাজধানী হিসেবে ঢাকাকে গড়ে তোলার জন্যই এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, কামরাঙ্গীরচর এলাকায় একটি আন্তর্জাতিক মানের বাণিজ্যিক হাব গড়ে তোলা হবে। প্রাথমিক ঘোষণা অনুযায়ী সেখানে ৫০ তলাবিশিষ্ট একটি ভবন নির্মাণ হবে। মূলত এ ভবনটিকে দেশী-বিদেশী প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহারের লক্ষ্য নিয়েই এগোচ্ছে ডিএসসিসি।

কামরাঙ্গীরচরসহ ঢাকা দক্ষিণের পুরো এরিয়া নিয়ে মাস্টারপ্ল্যানের কার্যক্রম শুরু হয়ে গিয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক ও ডিএসসিসির প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. সিরাজুল। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, নগর উন্নয়নে রাজউকসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মাস্টারপ্ল্যানকে সামনে রেখে সমন্বিত পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘ এ তিন মেয়াদে কার্যক্রম চলবে। সিটি করপোরেশনের পরামর্শক ও গবেষকরা কাজ করছেন। চলতি বছরের শেষের দিকে একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা হাতে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। 

তবে ডিএসসিসির বাণিজ্যিক হাবের বিষয়টি আইনসংগত নয় বলে মনে করেন নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, সিটি করপোরেশন আইনে স্পষ্ট বলা আছে যে সিটি করপোরেশন একটি সেবা প্রদানকারী সংস্থা। কোনো ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা সিটি করপোরেশনের কাজ নয়। একইভাবে কামরাঙ্গীরচর বাণিজ্যিক না আবাসিক এলাকা হবে সে বিষয়ে ড্যাপে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। এর বাইরে কোনো পরিকল্পনা প্রণয়নের অধিকার সিটি করপোরেশনের নেই।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে ইকবাল হাবিব বলেন, রাজধানীর কোথায় বাণিজ্যিক এলাকা হবে আর কোথায় আবাসিক এলাকা হবে এটা নির্ধারণ করে দেবে রাজউক। রাজউকের কাজই এসব পরিকল্পনা করা। ধরা যাক, ড্যাপে বলা আছে পুরান ঢাকা বাণিজ্যিক এলাকা হবে। এখানে এই এই স্থাপনা হবে, এ রকম জলাধার থাকবে ইত্যাদি। সিটি করপোরেশনের কাজ হবে ড্যাপের পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করা। এ লক্ষ্যে পুরান ঢাকার সব ধরনের নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা, রাস্তা প্রশস্ত করা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখা ইত্যাদি। কিন্তু এখানে ড্যাপের পরিকল্পনার বাইরে গিয়ে কামরাঙ্গীরচরকে বাণিজ্যিক হাব তৈরির ঘোষণা দিয়েছে সিটি করপোরেশন। যেটি বিধিসম্মত নয়। এর মাধ্যমে ড্যাপের যে লক্ষ্য তা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

সিটি করপোরেশন বাণিজ্যিক হাব নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়ার ফলে রাজউকের ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে বলে মনে করেন নগরবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, রাজউকের যদি আপত্তি না থাকে তাহলে সিটি করপোরেশনের কোনো কাজ প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বলা যাবে না। কিন্তু সিটি করপোরেশন যদি রাজউকের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বাদ দিয়ে নিজেই পরিকল্পনা প্রণয়ন করে, তাহলে এর মাধ্যমে রাজউকেরই ক্ষমতা হ্রাস পায় বলে আমি মনে করি।

তিনি আরো বলেন, এভাবে যদি উত্তর-দক্ষিণ বা নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন ঢাকা ও আশপাশের এলাকা ঘিরে নতুন নতুন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়ন শুরু করতে থাকে তাহলে শিগগিরই ঢাকার পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠবে। এরই মধ্যে আমরা দেখেছি, বিভিন্ন সংস্থা বিচ্ছিন্নভাবে নানা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে। সেগুলো একপর্যায়ে সমস্যাও সৃষ্টি করেছে। এ অবস্থায় ড্যাপের পরিকল্পনা বাদ দিয়ে সিটি করপোরেশন নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মাঠে নামলে পরিস্থিতি আরো জটিল হবে।

তবে এ বিষয়ে ভিন্নমত দিয়েছেন রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান মোহাম্মাদ এজাজ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, সিটি করপোরেশন ও রাজউকের ক্ষমতা আছে নাকি নেই, তার চেয়ে বড় কথা হলো নদীঘেঁষা কামরাঙ্গীরচরে এ ধরনের পরিকল্পনা বেশ চ্যালেঞ্জিং। বিশেষ করে সেখানে বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীর বাস। এত মানুষকে স্থানান্তর একটি ব্যয়সাধ্য ব্যাপার। সিটি করপোরেশন এত টাকা কোথায় পাবে। পুরো চরটি অধিগ্রহণ করে পরিকল্পনা করা হলে বর্তমানের হাজারীবাগ খাল পর্যন্ত পুরো এলাকা এ পরিকল্পনার মধ্যে আনতে হবে। আর স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে প্রচলিত নিয়মে অধিগ্রহণের বিল দিলে তাদের প্রকৃত ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে না। এটা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। স্বাধীনতার পর কোথাও এত বিশালসংখ্যক জনগণকে স্থানান্তর করে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। এখানে যে খাল ও নদীর চ্যানেল আছে সেগুলো উদ্ধার করা আগে জরুরি। ডিএসসিসির উচিত এখনই এ কাজে হাত দেয়া।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফরিদ আহাম্মদ বণিক বার্তাকে বলেন, পৃথিবীর প্রতিটি উন্নত শহরেই বাণিজ্যিক হাব রয়েছে। ঢাকার মতিঝিল এখন পুরনো জৌলুস হারিয়ে ফেলেছে। আবার চকবাজার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। সে বিবেচনায় কামরাঙ্গীরচরকে বাছাই করা হয়েছে। এখানে কততলা ভবন নির্মাণ করা হবে সেটা পরের বিষয়। মূল কথা হলো নগরীর ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক অফিস-আদালতের জন্য কামরাঙ্গীরচর ঘিরে আমরা পরিকল্পনা শুরু করেছি। ড্যাপের সঙ্গে আমাদের পরিকল্পনার কোনো বিরোধ নেই, ভবিষ্যতেও হবে না।

একই কথা বলেছেন, ড্যাপের প্রকল্প পরিচালক মো. আশরাফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ড্যাপের পরিকল্পনার বাইরে যাওয়ার সুযোগ সিটি করপোরেশনের নেই। এখন পর্যন্ত সিটি করপোরেশনের মহাপরিকল্পনা ড্যাপের সঙ্গে সাংঘর্ষিকও নয়।