দেশে শতবর্ষী বিদ্যাপীঠগুলোর একটি সরকারি আনন্দ মোহন কলেজ। প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৮০ সালে শিক্ষাবিদ ও সমাজ সংস্কারক আনন্দ মোহন বসুর হাত ধরে ময়মনসিংহ ইনস্টিটিউশন হিসেবে যাত্রা শুরু করে। ১৯০৮ সালে কলেজ হিসেবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি যাত্রা করলেও শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয় ১৯০৯ সালে। ১৬ একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত এ বিদ্যাপীঠে ২১টি বিভাগে শিক্ষার্থী রয়েছেন ৩৬ হাজার। তবে এর মধ্যে আবাসন সুবিধা পাচ্ছেন দুই হাজার শিক্ষার্থী। বাকি ৯৪ শতাংশ শিক্ষার্থী আবাসন সুবিধাবঞ্চিত। দুটি নতুন হল নির্মাণাধীন থাকলেও কবে নাগাদ চালু হবে সেটিও নিশ্চিত করতে পারেনি কলেজ কর্তৃপক্ষ।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, আবাসিক হলগুলোয় অনেক সমস্যা রয়েছে। এসব বিষয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলেও কোনো ফায়দা হয় না।

অবশ্য কলেজ কর্তৃপক্ষ বলছে, শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট নিরসনে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। দুটি আবাসিক হলের নির্মাণকাজ চলছে। ছেলেদের জন্যও নতুন হল নির্মাণের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বলেছি।

কলেজ সূত্রে জানা গেছে, ১৯১৪ সালে কলেজটি প্রথম গ্রেডে উন্নীত হওয়ার পর থেকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। ১৯৬৪ সালে কলেজটিকে জাতীয়করণ করা হয়। ১৯৭১ সালের পর কলেজের ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ একাডেমিক কার্যক্রমে নতুন গতি সঞ্চার হয়। শিক্ষকের পদসংখ্যা বৃদ্ধি, নতুন বিভাগ প্রতিষ্ঠা, ছাত্রাবাস, ছাত্রীনিবাস ও একাডেমিক ভবন নির্মিত হয়। ১৯০৮ সালে প্রতিষ্ঠাকালে যেখানে শিক্ষার্থী ছিল ১৭৮ জন এবং শিক্ষক ছিলেন ৯ জন, সেখানে বর্তমানে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৩৬ হাজারের বেশি। ছাত্রদের জন্য তিনটি ছাত্রাবাস এবং ছাত্রীদের জন্য দুটি ছাত্রীনিবাস রয়েছে। উনিশ শতকের অসংখ্য দুর্লভ বইসহ অর্ধ লক্ষাধিক পুস্তকসমৃদ্ধ কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিও রয়েছে।

কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ প্রফেসর সাকির হোসেন বলেন, ‘নতুন দুটি হলের নির্মাণকাজ চলছে। হল নির্মাণ হলে আরো কিছু শিক্ষার্থী আবাসিক সুবিধা পাবে। আমরা চেষ্টা করছি শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার মানোন্নয়নে ও তাদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর জন্য।’

১৯০৮ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত আনন্দ মোহন কলেজ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ছিল। ১৯৪৭ সালে এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়। নব্বইয়ের দশকে কলেজটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়। চারটি অনুষদের অধীনে রয়েছে ২১টি বিভাগ। এর মধ্যে কলা অনুষদের অধীনে রয়েছে বাংলা, ইংরেজি, দর্শন, ইতিহাস, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃত বিভাগ। সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে রয়েছে অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, সমাজকল্যাণ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান। বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে রয়েছে পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, গণিত, উদ্ভিদবিদ্যা, প্রাণিবিদ্যা এবং ভূগোল ও পরিবেশ। ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের অধীনে রয়েছে হিসাববিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা, মার্কেটিং ও ব্যাংকিং অ্যান্ড ফিন্যান্স। তবে সংস্কৃতি বিভাগে শিক্ষার্থী না থাকায় এটি বন্ধ রয়েছে। এছাড়া উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা, মানবিক তিনটি বিষয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়।

নগরীর কলেজ রোড, হামিদউদ্দিন রোড ও গুলকিবাড়ি এলাকায় মেসে বসবাস করেন কয়েক হাজার শিক্ষার্থী। তারা জানান, সন্ধ্যার পর মেসের গেট বন্ধ থাকায় অনেক সময় জরুরি প্রয়োজনেও বের হওয়া যায় না। এ কারণে অনেকেই মাঝেমধ্যে সন্ধ্যার আগে প্রাইভেট পড়া বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ অসমাপ্ত রেখে মেসে ফিরে আসেন। মেসে থাকতে হলে অনেক অনিয়ম মেনে নিতে হয়। বাড়ির মালিকরা ল্যাপটপ ও ফ্যান ব্যবহারের কারণে অতিরিক্ত মাশুল নেন।

কলেজের শিক্ষকরা জানান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ভুক্ত কলেজ পারফরম্যান্স র‌্যাংকিংয়ে একাধিকবার ময়মনসিংহ অঞ্চলে সেরা ও দেশসেরা হয়েছে আনন্দ মোহন কলেজ। ৬৩তম আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশ দলের হয়ে ব্রোঞ্জ পদক পান আনন্দ মোহন কলেজের শিক্ষার্থী তাহজিব হোসেন খান। জাতীয় টেলিভিশন বিতর্ক প্রতিযোগিতা-২০২২ এ কলেজ টিমের বিতার্কিক রাউন্ড পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ বক্তা নির্বাচিত হয় আনন্দ মোহন কলেজের শিক্ষার্থী। তবে আবাসিক হলগুলোয় আসন সংকট শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগে ফেলে দেয়। হলগুলোয় একেকটি কক্ষে চারজন করে থাকার নিয়ম থাকলেও বেশির ভাগ কক্ষে ছয় থেকে সাতজন শিক্ষার্থী থাকে। এতে তাদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে।

কাজী নজরুল ইসলাম হল, জসীমউদ্দীন হল, সুকান্ত হল ও শহীদ জননী জাহানারা ইমাম হলের কয়েকজন আবাসিক শিক্ষার্থী বলেন, একটি কক্ষে চারজন করে থাকার নিয়ম থাকলেও বেশির ভাগ কক্ষে ছয় থেকে সাতজন শিক্ষার্থী থাকেন। হলগুলোয়ও অনেক সমস্যা রয়েছে।