মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবে যাওয়ার ক্ষেত্রে দূতাবাসে নিবন্ধিত কিছু হাসপাতালে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে হয়। সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার কর্তৃপক্ষই বিদেশগামী যাত্রীর এ স্বাস্থ্য সনদ গালফ হেলথ কাউন্সিলের (জিএইচসি) ওয়েবসাইটে আপলোড করে দেয়। সম্প্রতি এক্ষেত্রে বড় ধরনের জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়েছে। স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করেই জিএইচসি ওয়েবসাইটে জাল স্বাস্থ্য সনদ আপলোড করেছে নিবন্ধিত একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার। একটি দুটি নয়, গত দুই মাসে ৭২৯টি জাল সনদ পাঠিয়েছে তারা।
জিএইচসির ওয়েবসাইটে জাল সনদ আপলোডের ঘটনাটি ঘটেছে ক্রিস্টাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে। এটি রাজধানীর গুলশান ১ নম্বরে অবস্থিত। জালিয়াতির প্রমাণ পেয়ে ডায়াগনস্টিক সেন্টারটির দুই কর্মীর বিরুদ্ধে মামলাও করেছে কর্তৃপক্ষ। এমন জালিয়াতির ঘটনায় ভোগান্তিতে পড়েছেন সৌদি আরবে গমনেচ্ছু শ্রমিকরা। প্রশ্ন উঠেছে নামসর্বস্ব এসব হাসপাতালের নিবন্ধন প্রক্রিয়া নিয়েও।
জানা গেছে, জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়ার পর গত নভেম্বরে শুরু থেকেই কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিত রয়েছেন ক্রিস্টাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারের আইটি বিভাগের নির্বাহী সামসুল আরেফীন এবং মানবসম্পদ ও আইটি বিভাগের প্রধান মো. ফাহিম আহমেদ। জিএইচসির ওয়েবসাইটে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়াই জাল সনদ আপলোডের প্রমাণ পাওয়ায় এরই মধ্যে এ দুজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম মালিক মাহবুব জামাল। ২৪ ডিসেম্বর গুলশান থানায় মামলাটি করা হয়।
মাহবুব জামালের ভাষ্যমতে, অসুস্থ থাকায় গত দুই মাস তিনি ক্রিস্টাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে পারেননি। এ সুযোগে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সামসুল আরেফীন ও মো. ফাহিম আহমেদ পলক যোগসাজশ করে প্রতিষ্ঠানের লোকাল সফটওয়্যারের মাধ্যমে জাল স্বাস্থ্য সনদ জিএইচসির ওয়েবসাইটে আপলোড করেন। অবৈধ এ কাজ করে তারা সৌদি গমনেচ্ছু শ্রমিকদের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
মামলার এজাহারে তিনি উল্লেখ করেছেন, ১৭ ডিসেম্বর তার প্রতিষ্ঠান ক্রিস্টাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারে মামুন নামে এক ব্যক্তি এসে জানান, গত ২৬ নভেম্বর তিনি সেখান থেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়েছেন। তবে তাকে যে স্বাস্থ্য পরীক্ষার সনদ দেয়া হয়েছিল, সেটি তিনি হারিয়ে ফেলেছেন। এজন্য নতুন করে আরেকটি স্বাস্থ্য সনদ ইস্যু করার অনুরোধ জানান। এ সময় তিনি স্বাস্থ্য সনদের একটি ফটোকপিও জমা দেন।
সৌদি গমনেচ্ছু মামুনের আবেদনের ভিত্তিতে রেজিস্টার বুক যাচাই করে দেখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু দেখা যায় সেখানে তার নাম নেই। অর্থাত্ তার কোনো স্বাস্থ্য পরীক্ষাই করানো হয়নি। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি সন্দেহ হলে ক্রিস্টাল ডায়াগনস্টিকের অন্যতম মালিক মাহবুব জামাল হাসপাতালের লোকাল সফটওয়্যার (এর মাধ্যমে রিপোর্ট আপলোড করা যায় না, শুধু চেক করা যায়) দিয়ে জিএইচসির ওয়েবসাইটে প্রবেশ করেন। তিনি দেখতে পান, তার প্রতিষ্ঠান থেকেই কোনো ধরনের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়াই জিএইচসির ওয়েবসাইটে মামুন নামের ওই সৌদি গমনেচ্ছু ব্যক্তির স্বাস্থ্য সনদ আপলোড করা হয়েছে।
ঘটনাটি নিয়ে চলমান অস্থিরতার মধ্যে একে একে আরো কয়েকজন আসেন তাদের স্বাস্থ্য সনদ পুনরায় ইস্যু করার জন্য। তাদের মধ্যে দুজন হলেন নজরুল ইসলাম ও সাইফুল্লাহ। তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার বিষয়টিও রেজিস্টারে উল্লেখ নেই। তারা দুজনই স্বাস্থ্য সনদের ফটোকপি দেন। তাদের ক্ষেত্রেও কোনো ধরনের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়াই সনদ আপলোড করা হয়েছে জিএইচসির ওয়েবসাইটে। এ তিনজনের কারো স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা না হলেও জিএইচসির ওয়েবসাইটে আপলোড করা এবং তাদের দেয়া মূল স্বাস্থ্য সনদে ক্রিস্টাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারের জেনারেল ফিজিশিয়ান ডা. কাজী আফসানা মিমুর স্বাক্ষর রয়েছে। জাল স্বাস্থ্য সনদে স্বাক্ষর থাকার বিষয়টি জেনারেল ফিজিশিয়ান ডা. কাজী আফসানা মিমুর কাছে লিখিতভাবে জানতে চাওয়া হলে জবাবে ওই চিকিত্সক জানান, এগুলো তার করা স্বাক্ষর নয়, সবগুলোই জাল।
অংশীদার ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ক্রিস্টাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অন্যতম মালিক মাহবুব জামাল জানান, জিএইচসির ওয়েবসাইটে জাল সনদ আপলোডের বিষয়টি নিয়ে তিনি প্রচণ্ড উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন। পরে তার প্রতিষ্ঠানের স্বাস্থ্য পরীক্ষার রেজিস্টারের সঙ্গে জিএইচসিতে আপলোড হওয়া স্বাস্থ্য পরীক্ষার সনদ মিলিয়ে দেখেন। সেখানে গত নভেম্বরে ২৭৪টি এবং ডিসেম্বরের ২২ তারিখ পর্যন্ত ৪৫৫টি, সর্বমোট গত দুই মাসে ৭২৯টি জাল স্বাস্থ্য সনদ জিএইচসির ওয়েবসাইটে আপলোড করা হয়েছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে গুলশান থানার ওসি মো. আবুল হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, জিএইচসির ওয়েবসাইটে জাল স্বাস্থ্য সনদ আপলোডের ঘটনায় ক্রিস্টাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানের মালিক একটি মামলা করেছেন। মূলত তিনি বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ থাকায় হাসপাতালে আসতে পারেননি। এ সুযোগে সেখানে কর্মরত কিছু অসাধু কর্মকর্তা এ জাল সনদ আপলোড করে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। তাদের গ্রেফতারের জন্য অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।
এদিকে এমন হাসপাতালকে জিএইচসির নিবন্ধন দেয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, কেবল সরকারি অনুমোদনের ভিত্তিতে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য নামসর্বস্ব হাসপাতালগুলোকে নিবন্ধন দেয়া ঠিক হয়নি জিএইচসির। বিশেষ করে করোনা সংক্রমণের মধ্যে এমন সিদ্ধান্ত যেকোনো দেশের জন্যই হুমকি হতে পারে। তাই অবশ্যই মান বিবেচনায় নিয়ে প্রথম সারির হাসপাতালগুলোকে জিএইচসির নিবন্ধন দেয়া প্রয়োজন।










