রাজধানীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা মিরপুর। এখানকার বিভিন্ন সেকশনে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের জমি বেদখল হয়েছে ১০ হাজার ৮৮৯ বিঘা, সরকারি হিসাবে যার বর্তমান বাজারমূল্য ৫৪ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা। বছরের পর বছর এসব জমি বেদখল থাকলেও উদ্ধারে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি প্রতিষ্ঠানটি। এমনকি বেদখল জমি সম্পর্কিত কোনো তথ্যও গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কাছে নেই।

জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের প্লট-ফ্ল্যাট বরাদ্দ-ব্যয় ও সংশ্লিষ্ট হিসাবসংক্রান্ত ২০১৯-২০ অর্থবছরের কমপ্লায়েন্স অডিট প্রতিবেদনে এ নিয়ে আপত্তি তুলে কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল বাংলাদেশ (সিএজি) জানিয়েছে, মিরপুরের বিভিন্ন সেকশনে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের মোট জমি ৩ হাজার ৬১৫ দশমিক ৬৫ একর (প্রায় ২ লাখ ১৮ হাজার ৭৪৭ কাঠা বা ১০ হাজার ৯৫৭ বিঘা)। এর মধ্যে শুধু ৪৭৪টি আবাসিক প্লটের (৯৭৬ কাঠা) তালিকা বা হিসাব দিতে পেরেছে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। বাকি প্রায় ২ লাখ ১৭ হাজার ৭৭১ কাঠা (১০ হাজার ৮৮৯ বিঘা) জমির কোনো ধরনের বরাদ্দ, বণ্টন, বিক্রির তথ্য পাওয়া যায়নি। এমনকি এগুলো কর্তৃপক্ষের দখলে থাকারও কোনো প্রমাণ পায়নি সিএজি।

একটি সংস্থার জন্য ভূমি ব্যবস্থাপনা খুবই দরকার। তারা যদি এটা করতে বা অবৈধ দখল উচ্ছেদ করতে না পারে তাহলে আমাদের দায়িত্ব দিক। আমরা চ্যালেঞ্জ নিয়ে বলছি, বেদখল এক ইঞ্চি জমিও উদ্ধার করে জনগণের কল্যাণে ব্যবহার করব।

—মো. আতিকুল ইসলাম
মেয়র, ডিএনসিসি

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিষ্ঠান জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। এ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিভিন্ন অনিয়ম ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠান না হওয়ার কারণেই জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের বিপুল সম্পত্তি বেদখল হয়েছে। বেদখল হওয়া সম্পত্তি উদ্ধারে নতুন করে কাজ করেছে মন্ত্রণালয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেয়ার পর জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে নিয়ে কিছু কাজ শুরু করেছিলাম। মোটামুটিভাবে কিছু ভালো কর্মকর্তা এনে এটাকে কীভাবে জনগণের অফিস হিসেবে তৈরি করা যায়, জনগণের সম্পত্তি কীভাবে উদ্ধার করা যায়, সে চেষ্টা শুরু হয়েছিল। কাজ অনেক দূর এগিয়েও ছিল। এর মধ্যে চেয়ারম্যান সচিব হয়ে যান। আমার ধারণা, চলতি জানুয়ারিতেই নতুন চেয়ারম্যানসহ প্রয়োজনীয় লোকবল চলে আসবে। তার পরই আমরা ব্যাপক অ্যাকশন নেব।’

সম্পত্তি বেদখল থাকার পেছনে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের গাফিলতির বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘আসলে কোনো জায়গায় কাজ করতে গেলে সে জায়গার লোকজনকে ভালো, জনবান্ধব, সৎ, দেশপ্রেমিক হতে হয়। তাদের কাজ করার একটা কমিটমেন্টও লাগবে। সে রকম লোকের আসলে অভাব। আবার লোকবলেরও অভাব আছে। এ দুটো ঘাটতি পূরণ করে আমরা বিদ্যমান সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠব। একটা কথা আছে না, “সর্বাঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দেব কোথা”—এমন অবস্থা। এমন প্রতিষ্ঠানকে একটা অবস্থানে নিয়ে আসা সময়ের ব্যাপার।

সিএজির তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা ডিভিশন-১ মিরপুরের আওতায় মিরপুর সেকশন-১, ২, ৩, ৫, ৬, ৭, ৮, ৯, ১১, ১২ ও রূপনগর সম্প্রসারণ দ্বিতীয় পর্ব এবং বাস্তুহারা কোর হাউজে মোট ১০ হাজার ৯৫৭ বিঘা জমি রয়েছে। এ জমিতে ৪ হাজার ৬১৯টি আবাসিক প্লট, ২২৬টি বাণিজ্যিক প্লট, ১২৬টি প্রাতিষ্ঠানিক প্লট, ৩১৮টি শিল্প প্লট, ২ হাজার ৪৮০টি পুনর্বাসন প্লট, ৬ হাজার ৮৪০টি নির্মিত আধাপাকা টিনশেড বাড়ি, ১৪১টি অনির্মিত আধাপাকা টিনশেড বাড়ি ও ৬ হাজার ৮৫৬টি নিউক্লিয়াস (একক) বাড়ি রয়েছে। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০০০-এর ধারা ৭(চ) অনুযায়ী কর্তৃপক্ষের মালিকানাধীন জমি রক্ষণাবেক্ষণ এবং ওই জমিতে বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট, ফ্ল্যাট, ইমরাত নির্মাণ প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব। একই আইনের ধারা ৭(ছ) অনুযায়ী নির্মিত বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট, ফ্ল্যাট ও ইমারত বিক্রি, ইজারা বা অন্যভাবে বিলিবণ্টন করাও প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কিন্তু এসব জমির মধ্যে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কাছে শুধু ৯৭৬ কাঠা জমিতে গড়ে ওঠা ৪৭৪টি আবাসিক প্লটের তালিকা পাওয়া গেছে। বাকি জমির কোনো হিসাব বা তথ্য দিতে পারেনি গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ।

বেদখল জমির আর্থিক মূল্য হিসাব করা হয়েছে ৫৪ হাজার ৪৪২ কোটি ৭০ লাখ ৬২ হাজার ৫০০ টাকা। নিরীক্ষকরা এ হিসাব করেছেন মিরপুর এলাকার সর্বনিম্ন জমির দাম ধরে। সে হিসাবে প্রতি কাঠার দাম ধরা হয়েছে ২৫ লাখ টাকা। বাস্তবে মিরপুরের জমির দাম কত জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর দেওয়ান আব্দুল মান্নান বণিক বার্তাকে জানান, মিরপুরে বর্তমান জমির বাজারমূল্য প্রতি কাঠা ৪০ লাখ টাকার বেশি। এক হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাটের দাম ৫০-৬০ লাখ টাকা।

জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের বেদখল জমির বিষয়ে জানতে চাইলে এ কাউন্সিলর বলেন, ‘আমার এলাকায় সংস্থাটির প্রায় ৪০ একর জমি রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ একরে একটি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান করা হয়েছে। ১০ একরে একটি বস্তি রয়েছে। বাকি পুরো জমিই অব্যবহূত ফেলে রাখা হয়েছে।’

বেদখল জমি উদ্ধারে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ মাঝেমধ্যে উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) মো. শাহজাহান আলী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমি ২ জানুয়ারি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্বে এসেছি। সার্বিক বিষয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না।’ 

মোটামুটিভাবে কিছু ভালো কর্মকর্তা এনে এটাকে কীভাবে জনগণের অফিস হিসেবে তৈরি করা যায়, জনগণের সম্পত্তি কীভাবে উদ্ধার করা যায় যে চেষ্টা শুরু হয়েছিল। চলতি জানুয়ারিতেই চেয়ারম্যানসহ প্রয়োজনীয় লোকবল চলে আসবে। তার পরই আমরা ব্যাপক অ্যাকশন নেব

—কাজী ওয়াছি উদ্দিন
সচিব, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়

আইন অনুযায়ী জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ অবৈধ জমি ইনভেন্টরি করার কথা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির কাছে এ-সম্পর্কিত হালনাগাদ কোনো তথ্য পাননি নিরীক্ষকরা। ২০২০ সালের ১৭ ডিসেম্বর অডিট ইন্সপেকশন রিপোর্ট জারি এবং ২০২১ সালের ১৮ মার্চ তাগিদপত্র পাঠানোর পরও প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। মূলত কিছু লোককে অপ্রাপ্য সুবিধা দেয়ার জন্য এবং কর্মরত কর্মকর্তাদের অবহেলার কারণেই সরকারি এ বিপুল সম্পত্তি বেদখল হয়ে গেছে বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনের মন্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

মিরপুরে সরকারি সম্পত্তি বেদখলের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সম্প্রতি মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনের প্যারিস রোডের মাঠটিকে কিছু অসাধু কর্মকর্তা প্লট হিসেবে বরাদ্দ দিয়ে দেয়। অথচ সব ম্যাপে এটিকে মাঠ দেখানো হয়েছে। আমি এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে মাঠটি উদ্ধার করেছি। আমরা জমি পাচ্ছি না মাঠ ও পার্ক করার জন্য। অন্যদিকে এত বিপুল পরিমাণ জমি বেদখল হয়ে আছে। এজন্য অবশ্যই জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষকে জবাব দিতে হবে। অচিরেই সরকারি সম্পত্তি বেদখল থেকে উদ্ধার করতে হবে। একটি সংস্থার জন্য ভূমি ব্যবস্থাপনা খুবই দরকার। তারা যদি এটা করতে বা অবৈধ দখল উচ্ছেদ করতে না পারে তাহলে আমাদের দায়িত্ব দিক। আমরা চ্যালেঞ্জ নিয়ে বলছি, বেদখল এক ইঞ্চি জমিও উদ্ধার করে জনগণের কল্যাণে ব্যবহার করব।’