দেশে গাড়ি শিল্পের পুরোটাই ছিল একসময় আমদানিনির্ভর। ক্ষুদ্র যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে বডি (চ্যাসিস) সবই আসত প্রতিবেশী ভারত থেকে। শিল্পায়নের সঙ্গে সেই অবস্থার পরিবর্তন এসেছে। যশোরেই এখন প্রস্তুত হচ্ছে গাড়ির বডি ও যন্ত্রাংশ। এতে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে, তেমনি বেড়েছে কর্মসংস্থান। তবে কয়েক দিন ধরে চলা টানা লোডশেডিংয়ে সে কাজে ভাটা পড়েছে। যশোরের প্রায় ৩০০ কারখানায় উৎপাদন হচ্ছে সক্ষমতার চার ভাগের কেবল এক ভাগ। অর্থাৎ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় উৎপাদন কমেছে প্রায় ৭৫ শতাংশ। ঠিকমতো অর্ডার নিতে পারছেন না উদ্যোক্তারা। অনেকে আবার নিজস্ব ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করে কারখানা চালু রাখলেও বেড়ে যাচ্ছে ব্যয়। সব মিলিয়ে বেশ ভুগছে উদীয়মান গাড়ি শিল্পটি।
যশোরের অটোমোবাইলস শিল্পের সুনাম রয়েছে দেশজুড়েই। এখানকার অর্ধশিক্ষিত ‘ইঞ্জিনিয়াররা’ তাদের মাথা কাটিয়ে টিন, কাঠ আর হরেক রকমের নাট-বল্টু দিয়ে তৈরি করেন বিভিন্ন নামিদামি ব্র্যান্ডের গাড়ির বডি। আধুনিক মেশিন নয়, তাদের হাতিয়ার কেবল হাতুড়ি-ছেনি ও কিছু ক্ষুদ্র যন্ত্রপাতি। একদিকে কর্মদক্ষতা অন্যদিকে অল্প টাকায় ভালো সেবা পাওয়ায় সারা দেশের বাস-ট্রাক মালিকরা নতুন ও পুরনো গাড়ির বডি ও পার্টস তৈরি করতে ছুটে আসেন ওয়ার্কশপগুলোয়। তবে করোনার ছোবলে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন এ খাতের মালিক-শ্রমিকরা। সেই সংকট কাটলেও কাটেনি তাদের ব্যবসায় মন্দা ভাব। এর মধ্যে আবার নতুন করে যোগ হয়েছে বিদ্যুৎ বিভ্রাট। চাহিদা থাকলেও পণ্য উৎপাদন করতে না পারায় পরিবহন মালিকদের ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে।
পুরনো শহর যশোরের বকচর, হুশতলা-মুড়লী মোড়সহ বিভিন্ন এলাকায় আট শতাধিক অটোমোবাইলস ওয়ার্কশপ রয়েছে। সেগুলোয় পাঁচ হাজারেরও বেশি শ্রমিক কাজ করেন। ওয়ার্কশপগুলোয় নতুন বাস-ট্রাকের বডি তৈরি, পুরনো বডি সংস্কার, রঙ, ওয়্যারিং ও ইঞ্জিন মেরামত করে প্রতি মাসে আয় হয় কমপক্ষে ১০ কোটি টাকা। তবে দেশব্যাপী রুটিন লোডশেডিংয়ে বিপাকে পড়েছে গোটা উৎপাদন খাত। জেনারেটরের ব্যয় বহন করার সক্ষমতা না থাকায় ১৯ জুলাই বিদ্যুৎ রেশনিং কার্যকরের পর ১০ দিনের ব্যবধানেই উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে অনেক কারখানা। শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগে থেকেই করোনার কারণে বাজার মন্দা। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধও বেশ ভোগায়। এর মধ্যে চলমান বিদ্যুৎ সরবরাহ সংকট তাদের আর্থিকভাবে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
বকচরের আল-একলাস হোল্ডিং ওয়ার্কশপের মালিক নুরুজ্জামান শেখ বলেন, যশোরের ওয়ার্কশপগুলোয় কোরিয়ান, জাপানি, ইন্ডিয়ান গাড়ির আদলে বাস-ট্রাকের বডি ও কেবিন বানানো হয়। পুরনো জরাজীর্ণ গাড়ির চ্যাসিসে নতুন করে সংযোজন বডি কমপক্ষে ৩০-৪০ বছর পর্যন্ত টেকসই হয়। কিন্তু বর্তমানে লোডশেডিংয়ের কারণে শ্রমিকরা কাজ করতে পারছেন না। সময়মতো ডেলিভারি দেয়া যাচ্ছে না।
যশোর অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি আশরাফুল আলম বলেন, দেশের অন্য যেকোনো জায়গার তুলনায় আমাদের এখানে কাজের মান ভালো এবং খরচও কম। তাই খুলনা, বাগেরহাট, বরিশাল, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, পাবনা, মাগুরা, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, নাটোর, রংপুর, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা, সিরাজগঞ্জ; এমনকি ঢাকা-চট্টগ্রাম থেকেও গাড়ি মালিকরা বডি তৈরি ও পার্টস কিনতে যশোরে আসেন। বর্তমানে অর্থনৈতিক মন্দার কারণে তেমন ব্যবসা নেই। আবার লোডশেডিংয়ের কারণে পণ্য উৎপাদন করা যাচ্ছে না। এতে আর্থিকভাবে ক্ষতির শিকার হচ্ছি।
উদ্যোক্তারা জানান, যশোরে শতাধিক ওয়ার্কশপে গাড়ির পার্টস, স্প্রিং ও বডি উৎপাদন হয়; যা সবই ছিল আমদানিনির্ভর। এসব পার্টস ব্যবহার করছেন দেশের প্রতিষ্ঠিত পরিবহন ও স্থানীয় রুটের গাড়ির ব্যবসায়ীরাও। একই সঙ্গে পাথর ও ইটভাঙা মেশিনও তৈরি করা হচ্ছে এখানে। পাথরভাঙা মেশিন রফতানি হচ্ছে ভারতে, যার বাজার হাজার কোটি টাকা বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। যশোরের রিপন মেশিনারিজের স্বত্বাধিকারী আশরাফুল ইসলাম বাবু বলেন, বর্তমানে আমার প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন হচ্ছে ইট ও পাথরভাঙা মেশিন, স্পলার, প্রেসার পুলি, লাইনার স্লট প্লেট, পানির পাম্প, স্যালো ইঞ্জিনের মেশিনসহ বিভিন্ন ধরনের মেশিনারিজ। দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি মাসে তাদের ২৫টি পাথরভাঙা মেশিন ভারতেও রফতানি হচ্ছে। কিন্তু টানা লোডশেডিংয়ের কারণে সেটিকে কাজে লাগাতে পারছি না।
পার্টস উৎপাদনকারীদের মধ্যে অন্যতম যশোরের এনায়েত ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মো. আক্তার হোসেন বলেন, বিসিক শিল্পনগরীতে ২০১১ সালে আমরা এক বিঘা জমির ওপর কারখানা গড়ে তুলি। আমাদের এখানে কাজ করেন ৫০ জন শ্রমিক। কারখানায় গাড়ির শতাধিক পার্টস উৎপাদন করা হয়। এর মধ্যে অন্যতম গাড়ির ব্রেকড্রাম, প্রেসারপ্লেট, গিয়ারবক্স, ব্রেকডিস্ক, ইঞ্জিন হাউজিং, হ্যাঙ্গার, গিয়ার বক্সের বডি। এসব পার্টস সর্বনিম্ন ১ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। বিশেষ করে সব ধরনের গাড়ির ড্রাম যাচ্ছে সারা দেশেই। স্বনামধন্য পরিবহন ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে স্থানীয় রুটের গাড়ি মালিকরাও এসব পার্টস ব্যবহার করছেন। তবে লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন নেমে গিয়েছে অর্ধেকের নিচে। বিদ্যুৎ থাকছে না ৪-৫ ঘণ্টা। সকাল ৬টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত শ্রমিকরা আগে পাঁচ টন লোহা গলাতেন। এখন তা এক-দুই টন হয়। লোহা, পাত গলানোর মধ্যে যদি বিদ্যুৎ চলে যায় সেটি আবারো গলাতে হয়। ব্যয় বেড়ে গেলেও উৎপাদন কমে যাওয়ায় আর ব্যবসা চালিয়ে নিতে পারছি না।
শহরতলির উপশহর এলাকায় এসকে মেটাল ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলেন তরুণ উদ্যোক্তা কামরুল হাসান সোহেল। সেখানে প্রতি মাসে গড়ে উৎপাদন হয় পিকআপের আড়াই-তিন হাজার পিস স্প্রিং। কামরুল হাসান সোহেল বলেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা পেলে স্প্রিং পাতির বাজার আরো বড় করতে পারতাম। কিন্তু এখন চলছে লোডশেডিং। এ কারণে পণ্য উৎপাদন করতে পারছি না চাহিদামতো। ঈগল পরিবহনের স্বত্বাধিকারী পবিত্র কাপুড়িয়া বলেন, যশোরের শ্রমিকরা তৈরি করছেন গাড়ির পার্টস ও বডি, যা মানসম্মত। আমরাও অনেক গাড়ির বডি-পার্টস সেখান থেকে নিই।
যশোর বিসিকে ভাই ভাই ইঞ্জিনিয়ারিং উৎপাদন করছে টিউবওয়েল, বিচালি কাটা মেশিন, বড় গাড়ির ড্রাম ও অটোবাইকের পার্টস। প্রতিষ্ঠানটির মালিক ইলিয়াস হোসেন জানান, তারা চট্টগ্রাম থেকে ভাঙা জাহাজ কাঁচামাল হিসেবে এনে তা গলিয়ে পণ্য উৎপাদন করেন। যশোর-নড়াইল রোডের অগ্রণী ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্বত্বাধিকারী শমসের আলী জানান, তাদের কারখানায় সরিষার তেল ভাঙানো মেশিন, বোতলজাতের জন্য ফিল্টার উৎপাদন হয়। তাদের পণ্য যাচ্ছে ৪০টি জেলায়, যা দেশের বাজারে অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে একে তো দেশে অর্থনৈতিক মন্দা ভাব, তার ওপর চলছে লোডশেডিং। এতে চাহিদামতো পণ্য উৎপাদন হচ্ছে না।
বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প মালিক সমিতি যশোর জেলা শাখার সদস্য সিরাজ খান মিন্টু জানান, জেলায় ৩০০টি হালকা ও ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে ২৫টি ভারী শিল্পপণ্য উত্পন্ন করছে। এসব শিল্প পণ্যের মধ্যে বড় গাড়ির পার্টস, পাথর, খোয়া ভাঙার মেশিন, কৃষি মেশিনারিজের পার্টস, পাওয়ার টিলার মেশিন, রাইস মিলের মেশিন, বড় গাড়ির যন্ত্রাংশ উল্লেখযোগ্য। এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বছরে হাজার কোটি টাকার পণ্য উৎপাদন হয়। কিন্তু লোডশেডিংয়ের কারণে তা ব্যাহত হচ্ছে। কেউ ঠিকমতো পণ্য উৎপাদন করতে পারছেন না।
যশোর চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি মিজানুর রহমান খান বলেন, আগে গাড়ির সব ধরনের যন্ত্রাংশ আসত দেশের বাইরে থেকে। সেখানে আমাদের দেশও এখন কিছু যন্ত্রাংশ উৎপাদন করছে। বিশেষ করে যশোরের ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পপ্রতিষ্ঠান অনেক আগে থেকে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রেখে চলেছে। এখানকার প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত যন্ত্রাংশ ভালো মানের। তবে লোডশেডিংয়ের কারণে যদি উৎপাদন কমে যায় তাহলে সেটি ভালো খবর নয়। সরকারের কাছে এজন্য শিল্প খাতকে চলমান বিদ্যুৎ বিভ্রাটের আওতার বাইরে রাখার দাবি জানাই।










