ব্যবধান মাত্র দুই মাসের। এর মধ্যেই সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধন ও কার্যক্রম সম্প্রসারণের অনুমতি পেয়ে যায় যশোরের আল করীম ইসলামী সমাজ উন্নয়ন সংস্থা। এটি মূলত আল করীম ফাউন্ডেশনের অধীনে পরিচালিত একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। ধর্মীয় অনুভূতি কাজে লাগিয়ে স্বল্প সময়েই ৩০ হাজারের বেশি কর্মী সংগ্রহ করে সংস্থাটি। এর মধ্যে অধিকাংশই ইমাম, মুয়াজ্জিন ও বিভিন্ন মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। সরকারি নিবন্ধনের সনদ দেখিয়ে দেশের দক্ষিণ অঞ্চলের পাঁচ জেলার কর্মীদের কাছ থেকে শতকোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে সংস্থাটি। আত্মসাতের অর্থে যশোর ও ঢাকায় বেশ কয়েকটি বাড়ি-ফ্ল্যাট কেনা হয়েছে সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা সাজ্জাদ হোসেন ও তার স্ত্রী-সন্তানের নামে। এসব তথ্য উঠে এসেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তে।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, সুদমুক্ত স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ঘোষণা দিয়ে ২০০৪ সালে যশোর জেলায় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধন নেয় আল করীম ইসলামী সমাজ উন্নয়ন সংস্থা। পার্শ্ববর্তী জেলা বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা ও কুষ্টিয়ায় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ওই বছরেরই জুলাইয়ে আবেদন করে সংস্থাটি। পরে সমাজসেবা অধিদপ্তরের যশোর জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালকের সুপারিশের ভিত্তিতে তাদের মোট পাঁচটি জেলায় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য শর্তসাপেক্ষে অনুমতি দেয়া হয়। সেই অনুমতির ভিত্তিতে যশোরের পরে সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, খুলনা ও কুষ্টিয়া জেলায় কার্যালয় স্থাপন করে তারা। স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও মোয়াজ্জিনদের মাধ্যমে কর্মী সংগ্রহ শুরু করে তারা। এসব কর্মীর কাছ থেকে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি জামানত হিসেবে শতকোটি টাকা সংগ্রহ করে। জামানতের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর টাকা সংগ্রহ করতে গিয়ে কর্মীরা প্রতারিত হওয়ার বিষয়টি বুঝতে পারেন।
হালাল ও বৈধভাবে লভ্যাংশ পাওয়ার জন্য আল করীম ফাউন্ডেশনে ১ কোটি ১১ লাখ ৭ হাজার ৫০০ টাকা জামানত রাখেন কুষ্টিয়ার হাফেজ মাওলানা আব্দুস সামাদ। মেয়াদ পূরণ হওয়ার পর জামানতের টাকা তুলতে গিয়ে প্রতারিত হওয়ার বিষয়টি তিনি বুঝতে পারেন। তিনি জানান, ২০১৩ সালের ৩১ জানুয়ারি কুষ্টিয়ায় শাখা কার্যালয় চালু করে আল করীম ফাউন্ডেশন। বিনিয়োগ করার আগে আল করীম ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানতে তাদের কার্যালয়ে উপস্থিত হন আব্দুস সামাদ। সে সময় তাকে জানানো হয়, আল করীম ফাউন্ডেশন সরকারি বিধিবিধান মেনে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনুমতি নিয়েই রেজিস্ট্রেশনপূর্বক ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু জামানতের অর্থ তুলতে গেলে তিনি প্রতারিত হওয়ার বিষয়টি বুঝতে পারেন মাওলানা আব্দুস সামাদ।
তার মতোই সরকারি নিবন্ধন ও খ্যাতনামা হাফেজের বক্তৃতা শুনে অনুপ্রাণিত হন ঝিনাইদহের হাফেজ মাওলানা এমদাদ। জামানতের টাকা ফেরত না পেয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তুলে মামলা করেন। ওই মামলার তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে পিবিআই। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সর্বশ্রেণীর মানুষকে সুদ ও শোষণমুক্ত ইসলামী সেবা প্রদানের লক্ষ্যে সাজ্জাদ হোসাইনসহ ১৩ জন মিলে আল করীম ফাউন্ডেশন নামের একটি সমিতি গঠন করেন। সংস্থার উন্নয়নের স্বার্থে সমাজের দ্বীনদার, হক্কানি, ওলামায়ে কেরাম, শিক্ষাবিদ, চিকিৎসাবিদ, পরিবেশবিদ তথা সুধীমহল নিয়ে আল করীম ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়েছে জানিয়ে সংস্থাটি জামানত সংগ্রহ শুরু করে। এভাবে তারা পাঁচ জেলায় কর্মী সংগ্রহের পর তাদের জামানতের অর্থ আত্মসাৎ করেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আত্মসাতের টাকায় যশোরের বারান্দী, বকচর, চুরিপট্টি, তালবাড়িয়া, খোলাডাঙ্গা ও দোহাকোলা মৌজায় নিজ নামে জমি কিনেছেন সাজ্জাদ হোসেন। তার স্ত্রী সহিদা বেগমের নামে যশোরের বারান্দী, কোদালিয়া, দোহাকোলায় জমি কেনা হয়েছে। এছাড়া তার নামে রাজধানীর মিরপুরে একটি ফ্ল্যাটও কেনা হয়েছে। সাজ্জাদ হোসেনের তৃতীয় ছেলে বোখারী মোর্শেদের নামে যশোর বারান্দী মৌজায় ৫ দশমিক ৩৮ শতক জমি কেনা হয়েছে। সাজ্জাদ হোসেনের দুই ছেলে স্ত্রীসহ অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমিয়েছেন। অন্যদের নামেও রয়েছে আন্তর্জাতিক পাসপোর্ট।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআইয়ের ঝিনাইদহ জেলার পুলিশ পরিদর্শক মো. আমির আব্বাস বণিক বার্তাকে বলেন, পূর্বপরিকল্পিতভাবে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধন নেয় আল করীম ফাউন্ডেশন। পরে তারা এসব দলিল দেখিয়ে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস অর্জন করে। এভাবে কয়েক হাজার কর্মীর কাছ থেকে জামানতের শতকোটি টাকা আত্মসাৎ করে আল করীম ফাউন্ডেশন।










