পরিবেশ-প্রতিবেশ সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ না নিয়েই কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্প এলাকার বিদ্যমান গাছ কাটার নির্দেশ দিয়েছে বন বিভাগ। কক্সবাজার, ধোয়াপালং ও ইনানী রেঞ্জ কর্মকর্তাদের গত ১০ সেপ্টেম্বর এক চিঠির মাধ্যমে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগ এ নির্দেশ দেয়। মেরিন ড্রাইভ সড়ক প্রশস্তের জন্য ৩০ কিলোমিটার অংশে ১০ হাজারের বেশি গাছ কাটা পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তার আগে এসব গাছ গণনা শেষে চিহ্নিতের নির্দেশ দিয়েছে বন বিভাগ।
জানা গেছে, দরিয়ারদিঘী-উখিয়ার সহকারী বন সংরক্ষক বরাবর গত ১০ সেপ্টেম্বর অফিস আদেশ পাঠায় কক্সবাজার বন বিভিাগ। ওই চিঠিতে বলা হয়, আপনার রেঞ্জের আওতাধীন এলাকায় কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়ক প্রশস্তকরণের কাজ চলমান থাকায় সড়কের উভয় পাশে বিদ্যমান গাছগুলোর সংখ্যা নিরূপণপূর্বক তা চিহ্নিতে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হলেও অদ্যাবধি কোনো কার্যক্রম পরিলক্ষিত হয়নি।
চিঠিতে আরো বলা হয়, আগের নির্দেশনা দেয়ার পরও গাছ অপসারণ না করায় দ্বিতীয়বার প্রকল্প পরিচালক বন বিভাগকে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে বন বিভাগ নির্দেশ দিয়ে বলে, কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের নতুন অ্যালাইনমেন্ট অনুসারে আপনার রেঞ্জের আওতাধীন বিদ্যমান গাছের সংখ্যা নিরূপণপূর্বক ওই গাছের মার্কা করে অত্র দপ্তরে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পুনরায় নির্দেশ দেয়া হলো।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক (দরিয়ারদিঘী ও উখিয়া) মো. আনিসুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গাছ অপসারণের জন্য আমরা এরই মধ্যে সেগুলো গণনা ও মার্কিং শুরু করেছি।’
কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ সড়কের ভাঙন রোধে সেটি আরো প্রশস্ত করার জন্য একটি প্রকল্প নিয়েছে সেতু ও সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়। গত বছরের জুনে এটি একনেকে পাস হয়। প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৯২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। সড়কটি প্রশস্ত করা হলে প্রকল্প এলাকায় বহু গাছ কাটা পড়বে এবং পাহাড়ি বনাঞ্চল ধ্বংস হবে বলে জানিয়েছেন মেরিন ড্রাইভের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে গবেষণাসংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এর ফলে হুমকির মুখে পড়বে সামুদ্রিক কাছিম ও লাল কাঁকড়ার আবাস। ব্যাহত হবে এ অঞ্চলের প্রাণবৈচিত্র্য। তাই সড়ক প্রশস্ত করে নয়, বরং ভাঙন রোধে বিজ্ঞানসম্মত অবকাঠামো নির্মাণের আহ্বান তাদের।
জানতে চাইলে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. সারওয়ার আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ওপর মহল যেভাবে নির্দেশনা দিচ্ছে আমরা সেভাবেই কাজ করছি। এ প্রকল্পের আওতায় কম বেশি ১০ হাজার গাছ কাটা পড়তে পারে। এ নিয়ে আমাদের কাজ চলছে।’ গাছ কাটার ফলে পরিবেশগত বিরূপ প্রভাবকে সামনে এনে বন বিভাগ এক্ষেত্রে কোনো আপত্তি করেছে কিনা তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ, আমরা আমাদের প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন মহলকে জানিয়েছি। তাদের নির্দেশনার আলোকেই কাজ করব।’
এদিকে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ সড়কের দুই পাশে কয়েক লাখ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রয়েছে। মেরিন ড্রাইভের তীরঘেঁষেই রয়েছে সমুদ্রসৈকতের লাল কাঁকড়া, কচ্ছপ, ডলফিন, সাগরলতাসহ জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাঁচটি নির্ধারিত স্থান। এছাড়া রয়েছে পাহাড় ও পাহাড়ি বন। সড়ক প্রশস্ত করতে গেলে কক্সবাজারের পরিবেশ-প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সড়ক নির্মাণে কোনোভাবেই পাহাড়ি বন বা পাহাড় কাটা সমর্থনযোগ্য নয় বলে জানান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মনিরুজ্জামান। বণিক বার্তাকে
তিনি বলেন, ‘প্রশস্ত করে মেরিন ড্রাইভ সড়কের ভাঙন ঠেকানো সম্ভব নয়। সেখানে সামুদ্রিক ঢেউয়ের পাশাপাশি পাহাড়ি ঢলও আসে। তাই সড়ক বড় করার মাধ্যমে সেখানে বিপর্যয় আরো বাড়ানো হবে। ৩০ বছর আগেও এ অঞ্চলে ছিল প্রাকৃতিক দ্বীপ। সমুদ্রঘেঁষে পাহাড় থাকার ফলে পাহাড়ের পাদদেশ ক্ষয়ে ক্ষয়ে সেখানে তৈরি হয় পাহাড়ি ক্লিপ। পৃথিবীর যেখানেই সমুদ্রের পাশে পাহাড় আছে সেখানেই এ ধরনের ন্যাচারাল ক্লিপের দেখা মেলে। সমুদ্র ও পাহাড়ের মেলবন্ধনে এটি একটি চমৎকার ইকোসিস্টেম। পাহাড় ও সমুদ্রের মাঝে ইকোসিস্টেমের লিংক রয়েছে। এ লিংক কোস্টাল এরিয়ার ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মেরিন ড্রাইভ করার ফলে ওই লিংকেজ বা সংযোগ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন নতুন করে যদি আবার সড়কটি প্রশস্ত করা হয় তাহলে ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়বে। এতে একদিকে পাহাড় কাটা পড়বে, অন্যদিকে সমুদ্রপাড় ভরাট হবে। কাছিমসহ সামুদ্রিক প্রাণীর আবাস হুমকিতে পড়বে। ব্যাহত হবে সামুদ্রিক কাছিমের প্রজননও।’
মেরিন ড্রাইভ সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রাথমিক পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ সঠিকভাবে করা হয়নি বলে মনে করেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) নির্বাহী প্রধান সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। এ কারণে সড়কটি বারবার ভাঙনের কবলে পড়ছে এবং নতুন করে আবার বানানো হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কক্সবাজারে একটা পাহাড়ের গায়ে আর কোপ দেয়ার কোনো উপায় নেই। এরই মধ্যে এ অঞ্চলের এক-তৃতীয়াংশ পাহাড় ও বন চলে গেছে। নতুন করে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে ফেলে মেরিন ড্রাইভ প্রশস্ত হোক এটা নিশ্চয় পর্যটকরা চায় না। কোনো একক সংস্থা এভাবে বারবার প্রকল্প নেবে, জনগণের টাকায় তা বাস্তবায়ন করবে, সেটি আবার ভাঙবে, আমরা আবার টাকা দেব—এমন খেলা কোনো আইনসিদ্ধ হতে পারে না। তাই এ প্রকল্পের বিস্তারিত জনগণের সামনে তুলে ধরে জনমত যাচাই করে, বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে, বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে, বন বিভাগের মতামত নিয়ে তার পরই চূড়ান্ত পরিকল্পনা করতে হবে।’










